সব খাবার আনা হয়ে গেলে পঞ্চাশটা গর্তে ঢুকিয়ে দিল ওরা দেড়-দুশো টিন। বাকিগুলো তাঁবুর পিছনের গুহায় রাখা হলো সাজিয়ে। তারপর রবিন ও জিনাকে সাহায্য করতে গেল ওরা পাহাড়চূড়ায়।
চোখ গরম করে তাকাচ্ছ কেন, জিনা? জিজ্ঞেস করল মুসা। আমরা আবার কী করলাম?
হাসল জিনা। জিজ্ঞেস করল, লাল হয়ে গেছে?
একদম। একেবারে ব্যোম ভোলানাথ! ওকে চুলোর সামনে থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত করল, দেখি, সরো। আমাকে একটু সুযোগ দাও তোমাদের ওপর চোখ গরম করবার। তোমরা লাকড়ি আনো। রাতেও কিছুক্ষণ আগুন। জ্বালতে হলে প্রচুর কাঠ দরকার।
কাঠের অভাব নেই। এসব সাগরের স্রোতে ভেসে আসা কাঠ। জোয়ার নেমে গেলে রয়ে যায় তীরে। ভরা কটালে আরও উপরে উঠে রোদে শুকিয়ে ঝনঝনে হয়ে রয়েছে সব।
হয়েছে এবার, একগাদা কাঠ জমে যেতে বলল কিশোর। চলো, গোটা কয়েক ডুব দিয়ে এসে খেয়ে নেয়া যাক। তারপর বিশ্রাম। সন্ধের পর আবার জ্বালব আগুন।
দুই টিন স্যামন আর এক টিন টিউনা, সেদ্ধ গাজর আর রসে ডুবানো নাশপতি খোলা হলো। সেই সঙ্গে থাকল প্রচুর পরিমাণে মাখন দেওয়া বিস্কিট আর জেলে-বউয়ের ঘরে-তৈরি পনির। খেয়ে-দেয়ে ঢেকুর তুলবার মত শব্দ করে সবাইকে হাসাল কিকো। কিশোরের দুপাশে বসে সামান্য খেয়ে ভদ্রতা রক্ষা করল সখা-সখি। তারপর উড়ে চলে গেল সাগরে। জ্যান্ত মাছ ছাড়া চলে না ওদের।
সাত
বিকেল পাঁচটা থেকেই বাতাসের বেগ বাড়ল। ঢেউয়ের উচ্চতা ও আক্রোশও বাড়ছে সেই সঙ্গে পাহাড়ের গায়ে বাড়ি খেয়ে শব্দ তুলছে ঝপাস-ঝপাস। সামুদ্রিক পাখিগুলো বাসা ছেড়ে উঠে পড়েছে আকাশে। গলা ফাটিয়ে কলরব করছে। মহা ফুর্তি। একবারও পাখা না ঝাঁপটে শুধু ডানা মেলে বাতাসে গা ভাসিয়ে চলে যাচ্ছে এক-দুমাইল। মুসার কাঁধে বসে চুপচাপ বিরক্ত দৃষ্টিতে দেখছে ওদের কিকো। গাল বা গিলিমটের মত গ্লাইড করতে পারে না ও। বেশি বাতাস পছন্দও করে না। বাতাস আরও বাড়ল। তাঁবুর ফ্ল্যাপদুটো পাখির ডানার মত ঝাঁপটাচ্ছে বাতাসে, উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায় আকাশে, একটু পরপরই টান দিয়ে উপড়ে তুলতে চাইছে খুঁটিগুলোকে।
পশ্চিম দিগন্ত থেকে উঠে আসা রাগী চেহারার কালো মেঘের আড়ালে চলে গেছে সূর্য। বাতাসের বেগ বাড়ছে। বোঝা যাচ্ছে বাড়বে আরও। তাঁবুর খুঁটিতে হেলান দিয়ে মেঘের খেলা দেখছে মুসা। ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, এল তা হলে! গত কদিন ধরে আসব আসব করছিল যে তুফান।
রাতে বাড়বে আরও, যেন আবহাওয়ার পূর্বাভাষ প্রচার করছে, এমনি ভাবে বলল রবিন। তাঁবুটা উড়িয়ে না নিয়ে যায়! লক্ষণ তো তেমন একটা সুবিধের লাগছে না।
এই কথাটা রেডিওতে প্রচার না করে যদি পেপারে ছাপতে, তা হলে বাচতাম, বলল মুসা।
কী করে বাঁচতে?
পেপারে ছাপলে আজ আর ঝড়ই উঠত না, জানাল মুসা। আবহাওয়া অফিস যা বলে, হয় ঠিক তার উল্টোটা। কেন জান?
কেন? জিজ্ঞেস করল জিনা।
খোদার ওপর খোদকারি পছন্দ করেন না খোদা। রোজ সকালে উঠেই পেপারটা নিয়ে বসেন। যদি দেখেন লিখেছে প্রচণ্ড ঝড়-তুফান হবে, বজ্র-বিদ্যুৎ সহ মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ ইত্যাদি… সঙ্গে সঙ্গে মেজাজ খিঁচড়ে যায় তার, দাঁত কিড়মিড় করে বলেন; দাঁড়া দেখাচ্ছি! দেখি কী করে ঝড় ওঠে!
এতক্ষণে বুঝলাম, বলল কিশোর, কেন এ-কয়দিন আসি-আসি করেও আসতে পারেনি তুফানটা। পেপারওয়ালারাই তা হলে এতদিন ঠেকিয়ে রেখেছিল! এই বলে বাইরে গিয়ে তাঁবু টাঙানোর খুঁটিগুলো আবার একবার পরীক্ষা করে দেখে এল। নাহ, যথেষ্ট শক্তই মনে হচ্ছে। যতবড় ঝড়ই আসুক মুসার গাড়া খুঁটি তুলতে পারবে না।
যে-যার টর্চ হাতের কাছে রাখো, ঘোষণার ভঙ্গিতে বলল রবিন। যখন তখন দরকার হতে পারে।
দেখতে দেখতে রাত আটটা বেজে গেল। ঘণ্টাখানেক আগেই চারদিক আঁধার হয়ে আসায় সখা-সখি বিদায় নিয়ে নিজেদের গর্তে গিয়ে ঢুকেছে। সাড়ে আটটার দিকে হালকা কিছু খেয়ে নিয়ে সকাল-সকাল বিছানায় গেল তিন গোয়েন্দা ও জিনা। চোখ বুজে শুনছে হু-হুঁ হাওয়ার মাতম, আর পাথুরে পাড়ে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের ভয় জাগানো ঝপাস-ঝপাস শব্দ।
ঘুমাতে যাও, পাজি ছেলে, ঘুমাতে যাও! কিকোর গলা নকল করে বলল রবিন।
সঙ্গে সঙ্গে ধমকে উঠল মুসার মাথার কাছ থেকে কিকো, চোপরাও! বোকার মত কথা বোলো না! যাও, হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসো!
হেসে উঠল সবাই।
পরমুহূর্তে চমকে উঠে বসল ওরা মেঘের বিকট গর্জনে। মনে হলো। হাজারটা কামান গর্জে উঠেছে একসঙ্গে। হঠাৎ করেই কয়েকগুণ বেড়ে গেল বাতাসের বেগ। ভয় পেয়ে মুসার কাঁধে এসে বসল কিকো। ওর ঝুঁটিতে হাত বুলিয়ে অভয় দিল মুসা।
আরে! ভিজে গেলাম তো! বলে উঠল কিশোর। বৃষ্টি ঢুকছে কোথা দিয়ে?
ঝিলিক দিল বিদ্যুৎ। মুহূর্তের জন্য জলজ্যান্ত ভেজা পাহাড় আর তরঙ্গবিক্ষুব্ধ সাগরটা দেখতে পেল ওরা দিনের মত স্পষ্ট, তারপরই ছবিটা মিলিয়ে গিয়ে অন্ধকার হয়ে গেল সব আবার। কড়াৎ করে বাজ পড়ল এইবার।
ফড়াৎ-ফড়ৎ ডানা ঝাঁপটাচ্ছে তাঁবুর ফ্ল্যাপদুটো।
গেল বুঝি তাঁবুটা! বলল জিনা।
না, দ্বিমত প্রকাশ করল কিশোর। খুঁটিগুলো খুবই শক্ত করে লাগিয়েছি। মুসা আর আমি! এত সহজে…
বলতে না বলতেই জোর বাতাসে ফুলে ফেঁপে উঠল তাঁবুটা, চটাস করে চপেটাঘাতের মত ফ্ল্যাপের বাড়ি লাগল মুসার গালে, তারপর হুশ করে উড়ে চলে গেল তাঁবু, পাগলা হাওয়ার সঙ্গে উধাও হয়ে গেল রাতের অন্ধকারে।
