জিনার কাঁধে একটা হাত রাখল মুসা। হাসল অভয় দিয়ে।
ঘাবড়াও মাত, জিনা। কিশোর আছে আমাদের সঙ্গে। এর চেয়েও বড় বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছি আমরা এর আগে। পাইনি?
হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকাল ও। ফ্যাকাসে চেহারায় রঙ ফিরে আসছে জিনার। মুসার দৃঢ় কণ্ঠে আত্মবিশ্বাস। ভয় দূর হয়ে গেল ওর অনেকখানি, আস্থা ফিরে পেল নিজের উপর। বলল, থ্যাঙ্কিউ, মুসা।
কীভাবে যেন পরিস্থিতির গুরুত্ব টের পেয়ে গেছে কিকো। চুপচাপ স্তব্ধ হয়ে বসে আছে মুসার কাঁধে, তাকাচ্ছে এর-ওর মুখের দিকে। এমনকী সখা সখিও গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে ডেকের উপর পাশাপাশি বসে চুপচাপ একদৃষ্টে দেখছে ওদেরকে।
কী করা যায় এখন? যদিও রবিন উচ্চারণ করল কথাটা, এ-প্রশ্ন ওদের সবারই। এখনই স্থির করতে হবে ওদের কর্মপন্থা।
ক্যাবিনের রিফ্রিজারেটার থেকে গোটাকয়েক ক্যাডবেরি চকোলেটের বার বের করে ফেলেছে মুসা। সবার হাতে একটা করে ধরিয়ে দিয়ে বলল, আমাদের প্রথম কাজ আজই এখান থেকে খাবারের টিনগুলো সরিয়ে নিয়ে গিয়ে কোথাও লুকিয়ে রাখা। বলেই কামড় দিল চকোলেটে। এক টুকরো ক্যাডবেরি কিকোকেও দিল ও।
কোথায় লুকাবে? জিজ্ঞেস করল, জিনা। গোটা দ্বীপে কোথাও লুকাবার কোনও জায়গা আছে?
আছে, হাসল মুসা। অসংখ্য বাসা আছে পাফিনের, ওদের গর্তে লুকিয়ে রাখব আমরা ক্যানগুলো।
আর দ্বিতীয় কাজ? ফিরে এসে প্রশ্ন করল কিশোর।
দ্বিতীয় কাজ পাহাড়ের মাথায় আগুন জ্বেলে ধোয়ার সিগনাল দেয়া।
কাকে সিগনাল দেয়া? শত্রুপক্ষকে? ভুরু কুঁচকে উঠল জিনার। আর কে আছে এই বিরান এলাকায় যে তোমার সিগনাল দেখে সাহায্য করতে আসবে?
হ্যাঁ, ধরা পড়বার ভয় আছে, বলল কিশোর। তবে সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনাও আছে। আমাদের খুঁজতে লোক আসবে এদিকে। আঙ্কেল কোনও মেসেজ পাঠাতে পেরে থাকলে তো আসবেই, না পারলেও আসবে।
এই কয়েকশো দ্বীপের মধ্যে ওরা কোথায় খুঁজে পাবে আমাদের?
যেখানে ধোয়া দেখা যাবে সেইখানে, বলে চওড়া হাসি দিল মুসা। যদি শত্রু এসে হাজির হয়, লুকাবার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু করার নেই আমাদের।
কোথায় লুকাবে?
এবার উত্তর দিল কিশোর। ওরা এদিকে এলে ওদিকে, আর ওদিকে গেলে এদিকে।
খাবারের টিনগুলো বয়ে নিয়ে যাওয়ার কী দরকার? এখানে থাকলে…
স্রেফ চুরি হয়ে যাবে, বলল মুসা। কাল রাতে তাড়াহুড়োয় হয়তো দেখতে পায়নি। তবে দুই-একদিনের মধ্যেই আসবে আবার। তখন একটা টিনও রেখে যাবে না।
তা ছাড়া ওই টিনগুলো ওদের চেয়ে আমাদের অনেক বেশি দরকার, বলল রবিন। কেউ এসে উদ্ধার না করা পর্যন্ত টিকতে হবে তো আমাদের। কতদিন পর কেউ আসবে তা কে জানে!
তা হলে কাজ ভাগ করে নেয়া যাক, বলল কিশোর। মুসা আর আমি খাবারের টিন সরাব। জিনা আর রবিন সাগরের তীর থেকে ভেসে আসা কাঠের টুকরো কুড়িয়ে পাহাড়ে উঠে আগুন জ্বালার ব্যবস্থা করবে। ঠিক আছে?
কিছু আধ-ভেজা শৈবালও তুলে নিয়ো, পরামর্শ দিল মুসা। তা হলে ধোয়া হবে বেশি। জিনা আর রবিন রওনা হতে যাচ্ছিল, ওদের থামাল মুসা। আরে, যাও কই! আসল কথাটাই তো ভুলে বসে আছ। কাজ করতে হলে শক্তি লাগবে না? নাস্তা করেছ আজ?
খাওয়ার কথা ভোলে না মুসা। সবাই খেয়াল করল, সত্যিই তো, খাওয়ার কথা মনে ছিল না কারও। ওখানেই ডেকে বসে বিস্কিট, ভেড়ার মাংসের সিক কাবাব, পেয়ারার জেলি, ক্রাফটের পনির আর নেসলের কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে নাস্তা সেরে নিল ওরা। তারপর প্রথমবারের মত চারটে ব্যাগে যত ক্যান আঁটে ভরে নিয়ে আস্তানার উদ্দেশে রওনা হলো চারজন। তাঁবুতে পৌঁছেই ভাগ হয়ে যাবে ওরা দুই দলে। দুজন হবে টোকাই, অপর দুজন কুলি।
পাহাড়ের চড়াই-উতরাই বাইতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠল ওরা সবাই। ঘেমে একেবারে নেয়ে উঠল। কখন হাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে খেয়াল করেনি। অসহ্য গুমোট গরম। আকাশের দিকে চেয়ে দেখল কিশোর, ঝাপসা মেঘের আস্তরণের ওপাশে জ্বলছে সূর্য। চারপাশে কেমন যেন লালচে একটা ভাব।
একেকবারে তিনজনের বোঝা টানছে কিশোর ও মুসা, তাঁবুর পাশে ঢেলে রেখেই ছুটছে আবার, কিন্তু তারপরেও বোট সাফ করে সব টিন আনতে আনতে দুপুর হয়ে গেল। প্রতিবার ওদের সঙ্গে থাকল, কিকো। সখা-সখি তাঁবুতে পৌঁছেই ছুট দেয় সাগরের দিকে। ওখানে একটা-দুটো ডুব দিয়ে গোটা কয়েক মাছ গিলে নিয়ে উড়ে গিয়ে কিশোরের অপেক্ষায় বসে থাকে বোটে।
ওদিকে রবিন ও জিনা সাগরতীরে জোয়ার-রেখার উপর থেকে ভেসে আসা কাঠের টুকরো কুড়িয়ে দুই ব্যাগ ভর্তি করে নিয়ে গেল সমতল-মাথার এক পাহাড়ের চূড়ায়। প্রথম দিকে পাখিরা কলস্বরে আপত্তি জানালেও আগুন ও ধোয়া দেখে সরে গেল ওখান থেকে। জিনা আগুনটা ভালোমত জ্বালতে না জ্বালতেই আর এক ব্যাগ শুকিয়ে আসা শ্যাওলা নিয়ে হাজির হলো রবিন। মুসার কথাই ঠিক, শুকনো কাঠের আগুনে আধ-ভেজা শ্যাওলা পড়তেই দশগুণ বেড়ে গেল ধোয়া। এর পর থেকে ব্যাগ ভরে কখনও শুকনো কাঠ, কখনও আধ-ভেজা শ্যাওলা নিয়ে এল রবিন, আর সেসব ব্যবহার করে প্রচুর ধোয়া তৈরির দায়িত্ব নিল জিনা।
ঘন ধোয়ার স্তম্ভ সোজা আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে দেখে একগাল হাসল। মুসা। বলল, কারও না কারও চোখে পড়বেই, কী বলো, কিশোর?
মাথা ঝাঁকাল কিশোর। শত্রুপক্ষের চোখে আগে না পড়লেই বাঁচা যায়। কোনও বোট এদিকে আসছে দেখলেই লুকাতে হবে আমাদের…অবশ্য যদি লুকাবার জায়গা পাওয়া যায়।
