নিশ্চয়ই করেছে, তা নইলে এখানে কেন? বলল দ্বিতীয়জন। ঘ্যাশর ঘ্যাশর করে লাল দাড়ি চুলকাল। বেধে ফেলো ওকে নিয়ে গিয়ে কথা বলাতে হবে।
হাত-পা বেঁধে ছোট একটা ডিঙ্গি নৌকায় তোলা হলো ডিক কার্টারের জ্ঞানহীন দেহ। বেশ কিছুটা দূরে খোলা সাগরে বড়সড় একটা মোটর-বোট আলো নিভিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে নোঙর ফেলে। ডিঙ্গির দড়িদড়া খুলে, হাতে বৈঠা তুলে নিতে গিয়েও থমকাল প্রথমজন।
এর সঙ্গে আরও কেউ আছে বলে মনে হয়? জিজ্ঞেস করল সে দাড়িওয়ালাকে। বোটে তো একা একেই পেলাম।
না, আর কেউ নেই, জবাব দিল দ্বিতীয়জন। গতকালও একাই ছিল, আর কাউকে দেখা যায়নি বোটে। থাকলে আমরা দেখতে পেতাম। ব্যাটা কাল রাত করে ফিরে ভেবেছে কাকপক্ষিও টের পায়নি কোথায় গেল। এদিকে আমরা যে সারাক্ষণ নাইটগ্লাস দিয়ে ওকে চোখে চোখে রেখেছিলাম, তা তো আর জানে না।
আমারও মনে হয় না আর কেউ আছে এর সঙ্গে, বলল প্রথম লোকটা। কিন্তু তার পরেও, বোটটা ভেঙেচুরে ডুবিয়ে দিলে হোত না?
ঠিক আছে, বলল লাল দাড়ি। কেবল ট্রান্সমিটার আর ইঞ্জিনটা। তা হলেই যথেষ্ট।
সীগালে উঠে একটা হাতুড়ি খুঁজে নিল লম্বা লোকটা। দুই ঘায়েই চুরমার হয়ে গেল ট্রান্সমিটার, ইঞ্জিনটা সম্পূর্ণ অকেজো করতে লাগল আট-দশ ঘা। ফিরে এসে হাতে বৈঠা তুলে নিল লোকটা। দুজন মিলে ডিক কার্টারের অচেতন দেহটা নিয়ে গিয়ে তুলল ওদের মোটর-বোটে। নোঙর তুলে নিয়ে রওনা হয়ে গেল বোটটা সোজা পশ্চিম দিকে। গোটা কয়েক রাত-জাগা সামুদ্রিক পাখি ছাড়া কেউ সাক্ষী রইল না এই ঘটনার।
*
পরদিন সকালে সবার আগে ঘুম ভাঙল মুসার, মায়ের ডাকে।
ওঠ, মুসা, কত ঘুমাস? স্কুলে যাবি না?
ধড়মড় করে উঠে বসে মুসা দেখল ওর মাথার কাছে রাখা ব্যাগের উপর থেকে ডাকছে ওকে কিকো। হাত বাড়িয়ে ওর ঝুঁটি চুলকে আদর করল মুসা। খুশি হয়ে কাঁধে এসে বসল কিকো।
এবার ঘাড় ফিরিয়ে মুসা দেখল কখন তাঁবুতে ঢুকে পড়েছে সখা-সখি। অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে বসে আছে ওরা দুজন কিশোরের মুখের দিকে চেয়ে।
অরররররর! নরম গলায় ডাকল সখা।
চোখ মেলল কিশোর। সখা-সখিকে মুখের সামনে বসে থাকতে দেখে মুসার দিকে ফিরে হাসল ও। লাজুক হাসি। তারপর বলল, হ্যালো, মুসা। আঙ্কেলকে দেখছি না যে? আগেই উঠে পড়েছেন?
তাই তো মনে হয়, বলল মুসা। মনে হয় গোসল করতে গেছে। চলো, আমরাও যাই। অ্যাই, রবিন! অ্যাই, জিনা! ওঠ, কত ঘুমাস, ইস্কুল যাবি না?
হাসল জিনা। বলল, হ্যাঁ, এবার পড়তে বসো…
ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে কিকো বলল, পাঁচের পাতা খোলো সবাই। বলো…
কিকোর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ওরা সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, বিএটি ব্যাট, সিএটি ক্যাট!
গুড বয়! গুড বয়! প্রশংসা করল কিকো, সেই সঙ্গে যোগ করল, বদমাস কোথাকার! রুমাল কোথায় তোমার?
সবাই তোয়ালে কাঁধে ফেলে ছুটল সাগরের দিকে। হেঁটে ওদের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে উড়ে চলল সখা-সখি। সাগর-তীরে আঙ্কেলকে না দেখে অবাক হলো ওরা।
এই সাত-সকালে গেল কোথায় আঙ্কেল? বলল জিনা। পরমুহূর্তে চমকে উঠল, হায়, খোদা! বোট গেল কই?
তাই তো! বোটটা গায়েব হয়ে গেছে! হাঁ করে চেয়ে রইল ওরা বোটটা যেখানে নোঙর করা ছিল সেই দিকে।
মনে হয় ট্রান্সমিশনের সুবিধা হবে মনে করে আমাদের সেই গোপন চ্যানেলে নিয়ে গেছে আঙ্কেল মোটর-বোট, বলল রবিন।
চলো, তা হলে গিয়ে দেখা যাক, বলল মুসা। আন্দাজের ওপর নির্ভর না করে আসলে কী হয়েছে জানা দরকার।
পাফিন কলোনি পেরিয়ে পাহাড়ে উঠল ওরা, তারপর সরু গিরিপথ পেরিয়ে পৌঁছল গোপন জেটির ধারে। দেখা গেল, ঢেউয়ের তালে তালে নিশ্চিন্তে দুলছে বোটটা ওখানে। ডেকের উপর না দেখে ওরা ধরেই নিল ক্যাবিনে রয়েছেন আঙ্কেল।
পাহাড়ের কার্নিশ থেকে খুব সহজেই ডেকে চলে এল ওরা। ক্যাবিনের খোলা দরজার সামনে এসে অবাক হলো ওরা-আঙ্কেল নেই ক্যাবিনে। তা হলে গেল কোথায়?
আশপাশেই কোথাও হয়তো গেছেন, এসে যাবেন এখুনি, বলল রবিন।
ঘুরে দাঁড়াতে গিয়েও থমকে গেল কিশোর। মুসার বাহুতে চাপ দিতে সে-ও ঘুরল। কী ব্যাপার, কিশোর?
চেয়ে দেখো! আঙুল তুলে রেডিওটা দেখাল কিশোর।
দেখল মুসা। ফিসফিস করে বলল, খোদা! কে করল! কেন? ক্যাবিনের ভিতরে ঢুকেই মেঝেতে রক্ত দেখতে পেল ও। তারপর চোখ পড়ল ইঞ্জিনের উপর। গুঙিয়ে উঠল মুসা।
ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেছে সবার। দৌড়ে চলে এল মুসার পাশে। কিছু বলতে হলো না, একনজর দেখেই বুঝে নিল সবাই কী হয়েছে। হাতুড়িটা পড়ে আছে। একপাশে। ভেঙেচুরে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে ইঞ্জিনটা।
আঙ্কেল কোথায়? সরাসরি কিশোরকে প্রশ্ন করল জিনা। যেন সব প্রশ্নের উত্তর আছে ওর কাছে।
ধরে নিয়ে গেছে, বলল কিশোর। কাল রাতে কেউ এসেছিল এখানে। একটু ভেবে বলল, ওরা জানে না, আমরাও আছি আঙ্কেলের সঙ্গে, তাই আমাদের খোঁজ করেনি। যাই হোক, আমরা আটকা পড়ে গেছি এই দ্বীপে। একটাও মেসেজ পাঠাতে পারব না আমরা কোথাও। এই বোটের ইঞ্জিন বা রেডিও কারও কোনও কাজে আসবে না আর।
হ্যাচ তুলে দেখতে গেল কিশোর বোটের তলাটা আস্ত আছে কি না।
ছয়
চোখে অবিশ্বাস নিয়ে চেয়ে আছে ওরা ভাঙা ইঞ্জিনটার দিকে। মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছে বুঝি। জিনাকে দেখে মনে হলো কেঁদে ফেলবে এখুনি।
