মট করে কিশোরের পায়ের নিচে একটা শুকনো ডাল ভাঙল। পাই করে ঘুরে দাঁড়াল কাকতাড়ুয়া। হার্টবিট বেড়ে গেল কিশোরের, গলা শুকিয়ে কাঠ।
মুসা! রবিন! জলদি এসো! কাকতাড়ুয়াটা এখানে! গলা লম্বা করে চিৎকার করতে লাগল কিশোর।
ওর কথা শেষ হবার আগেই ছুটতে শুরু করল ভৌতিক মৃর্তিটা। পিছু নিল কিশোর। কাকতাড়ুয়ার পায়ের শব্দ ক্রমে ক্ষীণ হয়ে এল। অনেক দূরে চলে গেছে। তবে একটু পরেই আবার বাড়তে লাগল শব্দটা।
ওটা আমাকে লক্ষ্য করেই ছুটে আসছে, ভাবল কিশোর। এবার নির্ঘাত হামলা চালাবে। তবে আমিও ওকে ছাড়ছি না। জাপটে ধরব।
পায়ের শব্দ লক্ষ্য করে ছুটতে লাগল কিশোর। মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে চাঁদ। অন্ধকার হয়ে গেছে যব খেত। এমন সময় কে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর গায়ে। শক্ত হাতে জাপটে ধরল। কিশোরও ছাড়ল না। হামলাকারীকে সে-ও জাপটে ধরল প্রাণপণে। জড়াজড়ি করে দুজনেই পড়ে গেল মাটিতে। রীতিমত কুস্তি শুরু হয়ে গেল।
লড়াইয়ের একটা পর্যায়ে দুজনেই কুস্তির প্যাঁচ থেকে নিজেদেরকে ছাড়িয়ে নিল। হিংস্র আক্রোশে আবার পরস্পরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছে, তখুনি চাঁদ বেরিয়ে এল মেঘের আড়াল থেকে। এবং সেই সঙ্গে রবিনও এসে দাঁড়াল ওখানে। হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল একটা মুহূর্ত। পরক্ষণে চিৎকার করে উঠল, আরে কি করছ তোমরা? পাগল হয়ে গেছ নাকি? নিজেরা নিজেরাই মারামারি!
তোমাকে আমি কাকতাড়ুয়া ভেবেছিলাম! ঢোক গিলল মুসা।
আমিও তো তোমাকে কাকতাড়ুয়া ভেবেছি! হাঁপাচ্ছে কিশোর।
হাসতে শুরু করল রবিন।
হাসিটা সংক্রামিত হলো অন্য দুজনের মাঝেও।
তবে কাকতাড়ুয়াটাকে দেখেছি আমি, হাসি থামলে বলল মুসা। পালিয়েছে। ওটার চেহারা আর দেখব বলে মনে হচ্ছে না।
তবু আরেকবার খুঁজে দেখতে অসুবিধে কি? কিশোর বলল।
আপত্তি করল না কেউ। এবার একসঙ্গে থেকে খোঁজ চালাল ওরা। কিন্তু ব্যর্থ হলো অভিযান। কাকতাড়ুয়ার টিকিটিরও দেখা মিলল না। আবার আগের জায়গায়, কাঠের খুঁটির কাছে ফিরে এল তিনজনে।
অদ্ভুত ব্যাপার! কাকতাড়ুয়াটা আগের মতই খুটির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আবার কি বলবে ওটা? আপনমনে বিড়বিড় করল মুসা।
ওকে জিজ্ঞেস করো তো আমাদের পিছু নিয়েছে কেন? রবিনকে উদ্দেশ্য করে বলল কিশোর।
জিজ্ঞেস করল রবিন। জবাব মিলল না। কাকতাড়ুয়া নিশূপ।
ঠোঁট কামড়াল কিশোর। খামারবাড়িতে ফিরে যাব। ওখানে বসে সিদ্ধান্ত নেব এরপর কি করব।
যব খেতের শেষ মাথায় চলে এসেছে ওরা, গোটা আকাশ জুড়ে লকলকিয়ে উঠল বিদ্যুৎ। তীব্র আলোয় সাদা হয়ে গেল পুরো এলাকা।
পরক্ষণে বিকট শব্দে বাজ পড়ল। আঘাত হেনেছে পুরানো খামারবাড়িটিতে। বিস্ফোরিত হলো ছাদ। দাউ দাউ জ্বলে উঠল আগুন। লেলিহান শিখা এক লাফে উঠে গেল আকাশে।
দৃশ্যটা আতঙ্কিত করে তুলল গোয়েন্দাদেরকে। তবু বাড়ি লক্ষ্য করে ছুটল ওরা। বাড়ির কাছে এসে দেখল ওটা জ্বলন্ত চুম্নিতে পরিণত হয়েছে। ধসে পড়েছে ছাদ, কড়ি-বর্গা দাউ দাউ করে জ্বলছে, জ্বলন্ত তক্তা দুড়ম-দাড়ম শব্দে ছিটকে পড়ছে মাটিতে।
আগাছায় ভরা ড্রাইভওয়েতে থমকে দাঁড়াল ওরা। আগুনের ভীষণ তেজ। কাছে যাওয়া যায় না।
আমাদের কিছু করার নেই, বিড়বিড় করল মুসা। বাড়িটা গেছে।
ভাগ্যিস বাজ পড়ার সময় বাড়ির ভেতরে ছিলাম না। শিউরে উঠল কিশোর! কাকতাড়ুয়ার পিছু না নিলে এতক্ষণে পুড়ে কাবাব হয়ে যেতাম।
বাড়িটার শেষ পরিণতি তাহলে এভাবেই ঘটল, কে যেন এলে উঠল পেছন থেকে।
চট করে ঘুরল ওরা। একজন লোক। একটা পিকআপের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখছে। বাড়ি ধসে পড়ার শব্দে গাড়ির আওয়াজ শুনতে পায়নি ওরা।
পিকআপ থেকে বেরিয়ে এল আগন্তুক। ওদের সামনে এসে দাঁড়াল।
আমি হ্যারি হ্যারিসন, নিজের পরিচয় দিল সে। পাশের খামারবাড়িটা আমার। ফায়ার ডিপার্টমেন্টকে ফোন করেই দৌড় দিয়েছি। এখুনি চলে আসবে। কিন্তু তোমরা কারা?
নিজেদের পরিচয় দিল তিন গোয়েন্দা। জানাল ওদের গাড়িটা নষ্ট হয়ে পড়ে আছে রাস্তার ধারে।
ও বাড়িতে ঢুকেছিলাম ফোন করার আশায়। গ্যারেজে গাড়িটা নেয়ার জন্যে সাহায্য দরকার, কিশোর বলল। কিন্তু বাড়িতে ঢুকে কাউকে দেখলাম না।
কাঁধ ঝাঁকাল কম্পটন। কোত্থেকে দেখবে? বিশ বছরে কেউ এসেছে নাকি ও বাড়িতে। খালি পড়ে ছিল। ভাড়াও দিতে পারছিলাম না। বহুকাল আগেই কে জানি গুজব ছড়িয়ে দিয়েছে, ভূত বাস করে বাড়িটাতে। জায়গাটা আমার। ভাড়া দিতে না পেরে শেষে বিক্রি করে দেয়ার কথা ভাবছিলাম গত কয়েক দিন ধরে। কিন্তু হলো না। বাড়িটা তো গেল। একটা পয়সাও আর পাওয়া যাবে না ওটা থেকে। জমিটাই যা ভরসা এখন। তবে এক হিসেবে ভালই হয়েছে। বাড়িটার জন্যে জমিটাও বিক্রি করতে পারছিলাম না।
যে প্রশ্নটা এতক্ষণ ধরে খেচাচ্ছিল কিশোরকে, এবার জিজ্ঞেসই করে ফেলল সে, আপনি নিজেও কি ঢোকেননি এ বাড়িতে?
তা ঢুকেছি। গত কালই তো কিচেনে ঢুকেছিলাম একটা কাজে। কেন?
রান্নাঘরে পায়ের ছাপ দেখেছি।
লিভিং রূমে খড়ও পড়ে থাকতে দেখলাম, মুসা যোগ করল।
আমি মাঠ থেকে গিয়ে সরাসরি বাড়িতে ঢুকেছি, জানাল হ্যারি হ্যারিসন। জুতোয় খড়-টড় লেগে ছিল বোধহয়।
যব খেতটার মালিকও নিশ্চয় আপনি? জিজ্ঞেস করল কিশোর।
