কাকতাড়ুয়া!
জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। মুখে বিকৃত হাসি।
এখনও কি স্বপ্ন দেখছি? ঢোক গিলল কিশোর। নাকি সত্যিই ঘটছে এ সব
কর্কশ সুরে ফিসফিস করল ভয়ঙ্কর মূর্তিটা। এক্ষুণি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাও। শেষবারের মত সাবধান করছি।
জানালা থেকে মুখ সরাল কাকতাড়ুয়া। অদৃশ্য হয়ে গেল।
লাফ দিয়ে উঠে বসল কিশোর। দৌড়ে চলে এল দরজায়। জং ধরা ছিটকানি খুলতে সময় লাগল। এক ছুটে বারান্দায় বেরিয়ে এল। চারপাশে তাকাতে লাগল।
দরজা খোলার শব্দে ঘুম ভেঙে গেছে মুসা আর রবিনেরও। ওরাও চলে এসেছে। চোখ ডলতে ডলতে জিজ্ঞেস করল মুসা, কি হয়েছে?
ঘটনাটা খুলে বলল কিশোর। কাকতাড়ুয়াটা হঠাৎ কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল বুঝলাম না।
ওই তো! হাত তুলে দেখাল মুসা।
যব খেতের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ওটা। ঝলমলে চাঁদের আলোয় কাকতাড়ুয়ার কুৎসিত চেহারাটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
এসো আমার সঙ্গে! চিৎকার করে বলল ওদেরকে কাকতাড়ুয়া। তারপর মাঠের দিকে ছুটতে লাগল।
ওর পিছু নেব, বলল কিশোর। ওকে ধরতে হবে। নইলে এ সব রহস্যময় কাণ্ডকারখানার কোন সদুত্তর মিলবে না।
ঠিক! রবিন বলল।
মুসাও তার সঙ্গে একমত।
যেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে কাকতাড়ুয়া সেদিক লক্ষ্য করে দৌড় দিল ওরা। রাতের আকাশে কালো মেঘের আনাগোনা আরও বেড়েছে। ঝড় হবে মনে হচ্ছে। গাছের চূড়ায় হাওয়ার মাতম।
যব খেতে ঢুকে পড়ল ওরা। কাকতাড়ুয়া হেলান দিয়ে ছিল যে কাঠের খুঁটির সাথে, সেখানে এসে দেখল খুঁটি খালি। নেই ওটা।
হতাশ ভঙ্গিতে কাধ ঝাঁকাল কিশোর। কাকতাড়ুয়া কোথায় গেছে তাই জানি না। কোথায় খুজব ওকে?
ভূতের মতই হুটহাট করে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, মুসা বলল। নিশ্চয় ভূত।
ভূত হোক আর যাই হোক ওকে খুঁজে বার করতেই হবে। এক কাজ করি-তিনজন তিনদিকে যাই। কারও চোখে কিছু পড়লেই চিৎকার করে জানাব। অন্য দুজন ছুটে যাব তখন তার দিকে। কি বলো?
ঠিক আছে, সায় দিল মুসা আর রবিন।
ডান দিকে মোড় নিল কিশোর, যব খেতের আরও গভীরে ঢুকে পড়ল।
সাবধানে হাঁটছে মুসা আর রবিন। দুহাতে গাছ ঠেলে সরাতে সরাতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে চারপাশে।
দূরে কোথাও কড়াৎ শব্দে বাজ পড়ল, আকাশে পলকের জন্যে ঝলসে উঠল রূপালী বিদ্যুৎ। চাঁদের আলো মেঘের আড়াল থেকে সামান্যই মুখ দেখানোর সুযোগ পাচ্ছে। ছায়া ছায়া অন্ধকার এখন যব খেতে। মুসার কাছে সব কেমন অপার্থিব, ভূতুড়ে লাগছে। শিরশির করে উঠল গা। ভূতদের জনন্য আদর্শ একটি রাত, মনে মনে ভাবল ও।
শক্তিশালী বাতাস এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল মেঘ, হঠাৎ ঝলমলে জ্যোৎস্নায় ভরে গেল যব খেত।
একটা যব গাছের গায়ে এক টুকরো কাপড় আটকে আছে। বাতাসে ফড়ফড় করে উড়ছে। ওদিকে দৃষ্টি আটকে গেল মুসার। টুকরোটা হাতে নিয়ে বুঝতে পারল এটা কাকতাড়ুয়ার সেই শতছিন্ন কালো কোটের অংশ।
কাকতাড়ুয়া ঐদিকে এসেছে বুঝতে পারল সে। হয়তো খেতের মধ্যে কোথাও ঘাপটি মেরে আছে। লাফ মেরে ঘাড়ে পড়বে। কথাটা ভাবতেই বুক ঢিবঢিব শুরু হয়ে গেল তার। তবে থামল না সে। এগিয়ে চলল। বারবার ডানে বামে তাকাচ্ছে। হাত দুটো সামনে বাড়ানো। সম্ভাব্য হামলার জন্যে প্রস্তুত। তবে ভূত-প্রেতের বিরুদ্ধে কুংফু-কারাতে কতটুকু কাজে লাগবে ভেবে সন্দিহান মুসা।
বেশ খানিকটা পথ হাঁটার পরেও কিছু ঘটল না দেখে মুসা ধারণা করল কাকতাড়ুয়াটা বোধহয় এ তল্লাটে নেই। ঠিক তখনই ওর সামনে খচমচ করে একটা শব্দ হলো। শস্যের ডগা দুলছে। কিছু একটা এগিয়ে আসছে ওর দিকে। তাকে দেখতে পাচ্ছে না মুসা।
পাঁজরের গায়ে দমাদম পিটতে শুরু করল হৃৎপিণ্ড, বেড়ে গেছে হার্টবিট। দাঁড়িয়ে পড়ল মুসা। অপেক্ষা করছে। কাকতাড়ুয়াকে দেখামাত্র চিৎকার করে জানান দেবে কিশোর আর রবিনকে।
খচমচ শব্দটা ক্রমে কাছিয়ে এল। মুখ হাঁ করল মুসা, চিৎকার দিতে যাবে এই সময় যব গাছের ফাঁক দিয়ে একটা লাফিয়ে পড়ল ওর সামনে। পেছন পেছন একটা শিয়াল। শিয়ালটা ধাওয়া করেছে খরগোশকে। দুটো প্রাণীই ঝড়ের বেগে ছুটে গেল মুসার সামনে দিয়ে।
পেশীতে ঢিল পড়ল আবার ওর। খচমচ শব্দটা আবারও হচ্ছে। আবার ফিরে আসছে জানোয়ার দুটো। প্রথমে খরগোশটাকে দেখা গেল। এক দৌড়ে একটা গর্তের মধ্যে ঢুকে পড়ল ওটা। পরমুহূর্তেই হাজির হলো শিয়ালটা। তবে দেরি করে ফেলেছে সামান্য। শিকার হারিয়েছে বুঝতে পেরে হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো ওটা। শিয়ালের ভঙ্গিতে জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঘুরে রওনা হয়ে গেল উল্টো দিকে।
অকারণ ভয় পেয়েছে ভেবে মনে মনে হাসল মুসা। তারপর আবার কাকতাড়ুয়ার খোঁজে যাত্রা শুরু করল।
ওদিকে যব খেতের মাঝ দিয়ে নিঃশব্দে এগোচ্ছে কিশোর। প্রতিটি পা ফেলছে সাবধানে। গর্তেটর্তে যাতে পড়ে না যায় সে-ব্যাপারে সতর্ক। এক জায়গার জমিন কাদায়। ওখানে পায়ের ছাপ চোখে পড়ল। ছাপগুলো চলে গেছে একটা ঝোঁপের দিকে। সেদিকটায় যব গাছগুলো আরও ঘন।
নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল কিশোরের। এ কাকতাড়ুয়ার পায়ের ছাপ হয়েই যায় না। ছাপগুলো যেখানে শেষ হয়েছে, সে-জায়গায় পা টিপে টিপে চলে এল সে। হঠাৎ যব গাছের পেছনে একটা আকৃতি দেখতে পেল। উপুড় করা বালতির মত টুপি পরা মূর্তি। কাকতাড়ুয়া!
