সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে ওরা, চোখে পড়ল আরেকটা দরজা। ওটা খুলে একটা হলরূমে ঢুকে পড়ল তিনজনে।
আমার কি মনে হয় জানো? বলল কিশোর। বাড়িটা পরিত্যক্ত। মেঝেতে কার্পেট নেই, হলরূমে কোন আসবাব নেই। ইলেকট্রিসিটি নেই…।
হঠাৎ হলরূমের শেষ মাথায় কিসের যেন শব্দ হলো। থেমে গেল কিশোর। দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল। পা টিপে টিপে এগোল দরজার দিকে। দরজাটা ভেড়ানো। ধাক্কা মেরে দরজা খুলল কিশোর। টর্চ জ্বালল। এ ঘরটাও খালি।
মেঝেতে টর্চের আলো ফেলল সে। হাসতে লাগল। ওই যে ভূতুড়ে শব্দের উৎস!
একটা ইঁদুর। মানুষের সাড়া পেয়ে দৌড়ে পালাল মেঝের গর্তে।
এদিকের সবগুলো ঘর একে একে আলাদা ভাবে পরীক্ষা করে দেখল ওরা।
দোতলায় কেউ নেই, কাজ শেষ করে জানাল মুসা।
আমিও কাউকে দেখতে পাইনি, রবিন বলল।
হু, গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা দোলাল কিশোর। এবার নিচতলাটা দেখা দরকার।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল ওরা, ঢুকল ডাইনিং রূমে। অন্যান্য ঘরগুলোর মত এটাও খালি এবং ধুলোয় ভর্তি। তবে এ ঘরে পায়ের ছাপ চোখে পড়ল ওদের।
দেখো দেখো, পায়ের ছাপ! বলে উঠল উত্তেজিত রবিন।
কেউ এখানে ছিল! ফিসফিস করে বলল কিশোর।
এবং মাত্র কিছুক্ষণ আগে! ঢোক গিলল মুসা।
টর্চের আলোয় পায়ের ছাপগুলো পরীক্ষা করল ওরা। ছাপগুলো রান্নাঘর হয়ে খিড়কির দরজার দিকে চলে গেছে। দরজাটা বন্ধ। আর দ্বিতীয় পায়ের ছাপ এসে মিশেছে লিভিং রুমে।
পায়ের ছাপগুলো একজনেরই, মন্তব্য করল কিশোর। খিড়কির দরজা দিয়ে ঢুকেছিল সে। আবার বেরিয়ে গেছে ও পথেই।
মেঝেতে টর্চের আলো ফেলে আঁতকে উঠল মুসা। মেঝেতে কতগুলো খড় পড়ে রয়েছে। কেউ এ ঘরে খড়ের গাদা নিয়ে ঢুকেছিল। নাকি কাকতাড়ুয়াটাই…? গায়ে কাঁটা দিল তার। যে-ই হোক, এখনও এ বাড়িতেই রয়েছে সে। সম্ভবত বেসমেন্টে।
যেখানেই থাক, খুঁজে বের করব ওটাকে, দৃঢ়কণ্ঠে বলল কিশোর। রহস্যের সমাধান না করে যাচ্ছি না।
ঠিক বলেছ, বলল বটে রবিন, কিন্তু মুখ শুকিয়ে গেছে ওর।
রান্নাঘরে ফিরে এল ওরা। লক্ষ করল আরও কিছু পায়ের ছাপ চলে গেছে বেসিমেন্টের দরজার দিকে। তারপর নেমে গেছে সিঁড়ি বেয়ে।
সিঁড়ির শেষ মাথায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ল ওরা। ভয়ে ভয়ে চোখ বুলাল চারপাশে। বেসিমেন্ট অর্থাৎ মাটির নিচের ঘরে কেউ নেই। ধুলো জমেছে পুরো হয়ে। জানালায় মাকড়সার জাল। এখান থেকে উঠান বা বাগানে যাবার কোন দরজা চোখে পড়ল না।
পায়ের ছাপ চলে গেছে ফিউজ বক্সের ধারে। ফিউজ বক্স পরীক্ষা করল কিশোর। তার ছেঁড়া। ইলেকট্রিসিটি থেকে থাকলেও বাতি জ্বালানোর কোন উপায় নেই।
পায়ের ছাপের মালিক এখান থেকে চলে গেছে সিঁড়ির দিকে, দেখেটেখে বলল সে।
সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল ওরা। যেতে যেতে রবিন বলল, ফোনটোন তো দেখলাম না এখানে। কাজেই সাহায্য পাচ্ছি না আমরা।
কাঁধ ঝাঁকাল কিশোর। দুটো কাজ করতে পারি আমরা এখন। হয় গাড়িতে ফিরে যেতে পারি, নয়তো এখানেই রাত কাটাতে পারি। তবে এখানে রাত কাটানোই বোধহয় ভাল হবে। মেঝেতে শুতে আমার কোন অসুবিধে নেই।
হাই তুলল মুসা। আমারও নেই। খুব ঘুম পাচ্ছে। শোয়ার মত জায়গা যখন আছেই আর দেরি করি কেন?
সে জ্যাকেট খুলে ভাঁজ করল। তারপর মাথার নিচে দিল। বালিশের কাজ দেবে জ্যাকেটটা। রবিন আর কিশোরও তা-ই করল।
শোয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল ওরা।
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখল, কিশোর। দেখল গাড়িতে করে একটা বাড়ি খুঁজে বেড়াচ্ছে ওরা। মুসা গাড়ি চালাচ্ছে। কিন্তু রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে বলে খুঁজে পাচ্ছে না বাড়িটা। লোকজনকে জিজ্ঞেস করেও লাভ হচ্ছে না। বদমেজাজী লোকগুলো প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে না। হঠাৎ পেছন থেকে অদ্ভুত গলায় কে যেন বলে উঠল, যে বাড়িটা তোমরা খুঁজছ ওটা ডান দিকে। মোড় ঘোরো। মোড় ঘুরে নাক বরাবর চলে যাও। বাড়িটা দেখতে পাবে।
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল কিলোর। দেখল পেছনের সীটে বসে আছে সেই কাকতাড়ুয়াটা।
ভৌতিক মূর্তিটা ওদের দিকে তাকিয়ে খনখনে গলায় হেসে উঠল। সরু, লম্বা টুপির ডগায় টোকা মেরে বলল, কাউকে জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। আমি তোমাদের বলে দিচ্ছি কি ভাবে যেতে হবে। ডান দিকে টার্ন নাও।
মুসা জানে ডান দিকে খাড়া খাদ। সে বাম দিকে হুইল ঘোরাল। তর ডান দিকেই ঘুরে গেল গাড়ি। গতি কমাতে ব্রেক চেপে ধরল। কমার বদলে বেড়ে গেল স্পীড। আতঙ্কিত হয়ে দেখল সোজা খাদের দিকে এগিয়ে চলেছে গাড়ি। গতি ক্রমে বেড়েই চলেছে।
পেছনের সীটে বসা কাকতাড়ুয়াটা হেসে উঠল ভয়ঙ্কর গলায়। খাদের কিনার লক্ষ্য করে ছুটে গেল গাড়ি। পরক্ষণে ডিগবাজি খেয়ে শূন্যে উঠে পড়ল, সাঁ সাঁ করে নিচে পড়তে শুরু করল, নেমে যেতে থাকল খাদের অতল অন্ধকারের দিকে। পড়ছে তত পড়ছেই! প্রতি সেকেন্ডে খাদের বিকট হ বড় হয়ে উঠছে।
বিজয় উল্লাসে চিৎকার করে উঠল কাকতাড়ুয়াটা। কানে হাত চাপা দিল কিশোর। খাদের পাথরের ওপর আছড়ে পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে ওদের গাড়ি। মারা যাবে ওরা।
ঘুম ভেঙে গেল কিশোরের। কোথায় আছে বুঝতে সময় লাগল।
ভয়ানক দুঃসপ্ন! ভাবল সে। কাকতাড়ুয়ার ভয় পেয়ে বসেছে আমাকে।
হঠাৎ বারান্দার কাঠের মেঝেতে ক্যাচকোচ শব্দ উঠল। কে যেন হেঁটে আসছে সামনের জানালার দিকে। উঠে বসল কিশোর।
