পায়ের শব্দে সংবিৎ ফিরে পেল যেন তিন গোয়েন্দা। কাকতাড়ুয়াটা যেখান থেকে উঁকি দিয়েছে দৌড়ে গেল সে-জাযগায়। কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না ওরা। ওনতেও পেল না।
ওটার পিছু নেব, চেঁচিয়ে বলল কিশোর।
কিন্তু যাব কোন দিকে? রবিনের প্রশ্ন।
যেখানে ওটাকে প্রথম দেখেছিলাম সেখানে।
ছুটল ওরা। দৌড়াতে দৌড়াতে চলে এল আগের জায়গায়। এখানেই কাকতাড়ুয়াটাকে দেখে গেছে।
কিন্তু খালি কাঠের খুঁটিটা দাঁড়িয়ে আছে। কাকতাড়ুয়াটা নেই!
হতভম্ব হয়ে গেল দুই গোয়েন্দা। বেদম হাঁপাচ্ছে। তবে যতটা না পরিশ্রমে তারচেয়ে বেশি ভয়ে।
কিশোর, আমরা সত্যি কি অশরীরী কিছু দেখছি? কেঁপে গেল মুসার কণ্ঠ।
আর অস্বাভাবিক কিছু কি শুনছি? অবাক শোনাল রবিনের কণ্ঠ। অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক মাথা নাড়ল।
জবাব দিল না কিশোর। ভূতুড়ে এ সব কাণ্ডকারখানার মাথামু কিছু সে-ও বুঝতে পারছে না।
মাঠের মধ্যে কাকতাড়ুয়াটাকে খুঁজে বেড়াল ওরা। কোথাও দেখতে পেল না। শেষে ঠিক করল খামারবাড়িতেই যাবে। খামারবাড়িতে কেউ থাকলে কাকতাড়ুয়া রহস্যের জবাব হয়তো সে দিতে পারবে। প্রেতের অভিশাপ
খামারবাড়িটা বেশ বড়। কতগুলো গাছ-পালার মধ্যে কাঠের বাড়ি। তবে খুবই দৈন দশা। বাড়ির জানালায় কোন আলো জ্বলছে না।
সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠে এল মুসা। দরজার কলিংবেল টিপল। ভিতরে কোথাও তীক্ষ্ণ শব্দে বেজে উঠল বেল। কিন্তু কারও সাড়া মিলল না। আবার বেল বাজাল মুসা। এবারও কোন সাড়া নেই।
মনে হয় বাড়িতে কেউ নেই, বলল কিশোর। তবে নিশ্চিত না হয়ে চলে যাওয়া ঠিক হবে না।
পেছন দিকে কেউ থাকতে পারে, রবিন বলল। চলো। ওদিকটা ঘুরে দেখি।
বারান্দার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল ওরা। চক্কর দিল বাড়িটাকে ঘিরে। কিন্তু জীবনের চিহ্নমাত্র নেই কোথাও। ছোট ছোট গুলো পেঁচিয়ে যাচ্ছে পা, কাঁটা গাছের খোঁচা লাগছে হাতে। সেই সাথে কানের পাশে মশার ভনভনানি তো আছেই।
গত কয়েক বছরেও এ বাড়ি কেউ সাফ-সুতরো করেনি মনে হচ্ছে, অসন্তোষের গলায় বলল কিশোর।, জবাবে কেউ কিছু বলার আগেই ভয়ঙ্কর একটা চিৎকার ভেসে এল। আঁতকে উঠল ওরা।
কি-কি ওটা? কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল মুসা।
জানি না। কাকতাড়ুয়ার চিৎকার নয়তো? বিড়বিড় করল রবিন।
কাছের একটা গাছ থেকে ডানা ঝাপটানোর শব্দ শোনা গেল। একটা পেঁচা। উড়ে আসছে গাছটা থেকে। বসল একটা ঝোঁপের ওপর। গোল গোল, বড় বড় চোখে কটমট করে তাকাল ওদের দিকে। তারপর ডানা ঝাঁপটে বুক হিম করা চিৎকারটা দিল আবার।
দুই গোয়েন্দা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ফ্যাকাসে যসি হাসল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বাড়ি চক্কর দেয়া শেষ। আবার চলে এসেছে বারান্দায়। বৃথা খোঁজাখুঁজি। মানুষ জন নেই। গলা ফাটিয়ে কেউ কি আছেন? বলে ডাকাডাকি করল। কোন জবাব এল না।
ফোন করা দরকার, বলল মুসা। কাছেপিঠের কোন গ্যারেজে খবর না দিলেই নয়। কিন্তু সমস্যা হলো বাড়ির ভেতরে ঢুকব কি করে? দরজা ভেতর থেকে ছিটকানি দেয়া।
জানালা দিয়ে যে ঢুকব তারও উপায় নেই, হতাশ শোনাল কিশোরের কণ্ঠ। অনেক উঁচুতে জানালা!
এদিক ওদিক তাকিয়ে রবিনও কোন উপায় বের করতে পারল না।
উপায় একটা আছে, মুসা বলল। পেঁচাটা যে গাছ থেকে উড়ে এসেছে, লক্ষ করেছি ওটার একটা ভাল চিলেকোঠার জানাল ছুঁই ছুঁই করছে। জানালা খোলা থাকলে গাছ বেয়ে উঠে গেলেই হলো। তারপর ভেতরে ঢুকে পড়ব।
গাছটার নিচে চলে এল ওরা। প্রথমে মুসা চড়ল গাছে। উঁচু ডালে দাঁড়িয়ে নিশ্চিত হয়ে নিল ওটা ওর ওজনের চাপে ভেঙে পড়বে না। তারপর জানালা ছুঁই ছুঁই ডালের ওপর চলে এল। হাত বাড়িয়ে জানালার কাঁচ স্পর্শ করল। ধাক্কা দিল। কাঅ্যাঅ্যাচ শব্দে খুলে গেল জানালা।
ভাগ্য ভাল আমাদের, কিশোর আর রবিনকে উদ্দেশ্য করে বলল মুসা। জানালা খোলা। চলে এসো।
গাছে উঠে পড়ল কিশোর। চলে এল মুসার পেছনে, মগডালে। খোলা জানালা দিয়ে চিলেকোঠার ঘরে ঢুকে পড়ল মুসা। তাকে অনুসরণ করল অন্য দুজন। ভিতরে ঢুকে পকেট থেকে পেন্সিল টর্চ বের করল ওরা।
টর্চের আলোয় বুঝতে পারল বেশ বড়সড় ঘর এটা। খালি। মেঝের ওপর ধুলোর ঘন আস্তরণ।
মেঝেতে কারও পায়ের ছাপ দেখছি না, বলল কিশোর। তার মানে অনেক দিন কেউ এ ঘরে ঢোকেনি।
চিলেকোঠার দরজায় টর্চ মারল রবিন। এ ঘরে ফোন নেই। নিচে আছে কিনা দেখে আসি।
দরজার দিকে পা বাড়িয়েছে ওরা, এমন সময় ছাদ থেকে কিচকিচ শব্দ ভেসে এল। কালো কালো কি যেন ছাদের কড়ি-বর্গা থেকে নেমে এসে উড়তে লাগল ওদের মাথার ওপর।
বাবাগো, ভূত! বলে চিৎকার দিয়ে মেঝে লক্ষ্য করে ডাইভ দিল মুসা।
খেয়ে গিয়ে তার সঙ্গে সঙ্গে কিশোর আর রবিনও ঝাঁপ দিল মেঝেতে।
শিকার ফস্কে যাওয়ায়ই যেন দিক পরিবর্তন করল হামলাকারীরা, আবার উঠে গেল ছাদে। বর্গা ধরে ঝুলতে লাগল। সেই সাথে অনবরত কিচকিচ শব্দ করেই চলেছে।
ভ্যাম্পায়ার! বাদুড়ের রূপ ঘরে আছে! রুদ্ধশ্বাসে বলল মুসা। জলদি ভাগো!
ওঠো না, সাবধান করল কিশোর। হামাগুড়ি দিয়ে এগোও। ভূত না হলেও আবার আক্রমণ চালাতে পারে ওরা।
চিলেকোঠার মেঝের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে এগোল তিন গোয়েন্দা। দরজার সামনে পৌঁছে দ্রুত খুলে ফেলল কবাট। হামাগুড়ি দিয়েই বেরিয়ে এল ঘর থেকে। তারপর বন্ধ করে দিল দরজা।
