এখানেই থাকি, নিচু গলায় বলল মুসা। লোকটাকে চিনি না আমরা। জানি না কোন বদ মতলব আছে কিনা তার। পিছু ঘুরলেই যদি ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ে!
কিন্তু লোকটা গেল কোথায়? হিসিয়ে উঠল মুসা। এত অন্ধকার! ব্যাটা আমাদের পেছনে ঘাপটি মেরে নেই তো? ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল ও।
হঠাৎ মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল চাঁদ। আবার আলোর বন্যায় ভেসে গেল যব খেত। ভৌতিক চেহারাটাকে এবার পরিষ্কার দেখা গেল।
ওটা একটা কাঠের খুঁটির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হ্যাঁটের নিচে বেরিয়ে পড়েছে খড়। বাঁকানো আঙুলগুলো তারের তৈরি। সাদা মুখটা রং করা।
কাকতাড়ুয়া! দারুণ অবাক কিশোর। একটা কাকতাড়ুয়ার ভয়ে মরছি আমরা!
কিন্তু ওটাকে অবিকল মানুষের মত লাগছে, বলল মুসা। এমন নিখুঁত জিনিস বানাল কে? ভয়ে আমার হার্টবিট বেড়ে গেছে।
আমারও, মুসা। তবে কাকতাড়ুয়া যেহেতু আছে, কাছেপিঠে খামার বাড়িও থাকার কথা। চলো, খামার বাড়ি-টাড়ির খোঁজ মেলে কিনা দেখি।
তিনজনে হাঁটা শুরু করেছে এমন সময় খনখনে কণ্ঠে কে যেন বলে উঠল, সাবধান! ভীষণ বিপদ! বাঁচতে চাইলে এখুনি এখান থেকে পালাও?
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ওরা। কিশোরের ঘাড়ের পেছনের চুলগুলো সরসর করে খাড়া হয়ে গেল। গলা শুকিয়ে গেল মুসার। রবিনের বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করছে। বাকরুদ্ধ হয়ে কাকতাড়ুয়ার দিকে তাকিয়ে রইল ওরা। কথাগুলো বেরিয়েছে ওটার মুখ থেকেই!
বাতাসে কাকতাড়ুয়ার কোট উড়ছে পতপত করে, পা নড়ছে। চাঁদের আলোয় মনে হলো হাসছে ওটা। বিদ্রুপের হাসি। আঙুলগুলো বাঁকা করে সামনে বাড়ানো, যেন খামচি দিয়ে ধরার ইচ্ছে।
আমি যা শুনেছি তোমরাও কি তাই শুনেছ, মুসা? কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল কিশোর।
হ্যাঁ, জবাব দিল মুসা।
কিন্তু কাকতাড়ুয়া যে কথা বলতে পারে, রবিন বলল, শুনিনি কোনদিন!
পরীক্ষা করে দৈখি। সত্যি ওটা কথা বলেছে কিনা তা জানা যাবে।
কিশোর জিজ্ঞেস করল কাকতাড়ুয়াকে, আমাদেরকে পালাতে বললে কেন? কেন পালাব? কিসের বিপদ?
জবাব দিল না কাকতাড়ুয়া। আগের মতই তাকিয়ে রইল কটমট করে।
কিশোর আরও কয়েকটা প্রশ্ন করল। চুপ হয়ে রইল কাকতাড়ুয়া। শুধু বাতাসের শব্দ ছাড়া আর সব নিশ্চুপ।
খামোকাই সময় নষ্ট করছি, বিড়বিড় করল কিশোর। খড়ের তৈরি জিনিস কি আর কথা বলতে পারে? চলো, মুসা।
চলো, বলল মুসা। কিন্তু যাব কোন দিকে
এদিক-ওদিক তাকাল কিশোর। খেতের শেষ প্রান্তে বড় একটা দালান চোখে পড়ল।
ওটা নিশ্চয়ই খামার-বাড়ি, বলল সে, চলো। ওখানেই যাই।
তাই ভাল। সায় দিল মুসা। এই ভূতুড়ে জায়গা থেকে পালাতে পারলে বাঁচি।
কাকতাড়ুয়াকে পেছনে রেখে দালানটার দিকে পা বাড়াল তিন গোয়েন্দা। মাঝে মাঝেই মেঘ চাঁদকে ঢেকে ফেলছে বলে চলার গতি মন্থর ওদের। অন্ধকারে এবড়োখেবড়ো গর্তে ভরা মাঠ দিয়ে হাঁটা কঠিন। বার কয়েক মাটির টিবিতে পা হড়কে পড়ে যাচ্ছিল ওরা।
পাহাড়ে চড়ার চেয়েও বিশ্রী কাজ, একটা গর্ত লাফ মেরে টপকাতে টপকাতে মতব্য করল মুসা।
ঠিক বলেছে। সায় দিল কিশোর।
এরচেয়ে বেপোর্ট হিলসে ওঠা সহজ, বলল রবিন।
এমন সময় পায়ের শব্দ কানে এল। কেউ দৌড়ে আসছে ওদের পেছন পেছন।
কনুই দিয়ে কিশোরকে গুঁতো মারল মুসা। ফিসফিস করে বলল, কেউ আমাদের পিছু নিয়েছে।
বুঝতে পারছি, ফিসফিস করেই জবাব দিল কিশোর। পায়ের শব্দ আমিও শুনেছি। তবে অনুসরণকারী যে-ই হোক খারাবি আছে তার কপালে।
পেছন ফিরে দেখল না ওরা, গুনে গুনে দশ কদম এগোল। যব খেতের মাঝ দিয়ে কেউ আসছে। শোনা যাচ্ছে পায়ের শব্দ। ঠিক দশ কদম যাবার পরে ঘুরে দাঁড়াল তিন গোয়েন্দা। কারাতে মারের কায়দায় দাঁড়িয়ে গেছে আত্মরক্ষার জন্যে। আসন্ন হামলার জন্যে প্রস্তুত। তবে মেঘে ঢাকা চাঁদের আবছা আলোয় কাউকে দেখতে পেল না। পায়ের শব্দ আর শোনা যাচ্ছে না।
ঠোঁট কামড়াল কিলোর। বেহুদা কল্পনা করে আমরা খামোকই ভয় পাচ্ছি, মুসা।
কি জানি! নীরস শোনাল মুসার গলা। তোমার কথাই হয়তো ঠিক। বাতাসের শব্দ শুনে ভাবছি কেউ আমাদের পিছু নিয়েছে। তা ছাড়া এখানে আমাদের পিছু নিতেই বা যাবে কে?
ওর কথা মাত্র শেষ হয়েছে, এমন সময় যব গাছের বড় একটা অংশ দুদিকে ভাগ হয়ে গেল। একই সঙ্গে মেঘের আড়াল থেকে আত্মপ্রকাশ করল চাঁদ। চাঁদের আলোয় দেখা গেল ঠোঁটে সেই বিশ্রী জ্জিপের হাসি নিয়ে ওদের সামনে হাজির হয়ে গেছে কাকতাড়ুয়াটা।
দৃশ্যটা দেখে আতঙ্কে জমে গেল তিন গোয়েন্দা। পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বিস্ফারিত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ভৌতিক মূর্তিটার দিকে। দুহাতে যব গাছগুলোকে দুপাশে ঠেলে ধরে একটা গর্তে দাঁড়িয়ে আছে ওটা। নিঃশব্দে হাসছে।
হঠাৎ রাতের নিস্তব্ধতা চিরে খনখনে গলায় হেসে উঠল কাকতাড়ুয়া। তীব্রতর হয়ে উঠল আওয়াজ। তারপর হঠাৎই থেমে গেল।
দ্বিতীয়বার কথা বলল কাকতাড়ুয়া। কর্কশ শোনাল কণ্ঠ, ওই বাড়িতে যেয়ো না। এখুনি চলে যাও। নইলে কপালে অনেক দুর্ভোগ আছে।
দুই গোয়েন্দা আগের মতই দাঁড়িয়ে আছে। কথাগুলো সত্যি শুনেছে কিনা বিশ্বাস করতে পারছে না। কাকতাড়ুয়া ছেড়ে দিল যব গাছ। গাছগুলোর আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল ভয়ঙ্কর মুখটা। দ্রুত মিলিয়ে গেল দুটন্ত পায়ের আওয়াজ।
