হুঁ, আনমনে মাথা দোলালো মুসা। অকটোপাসের সঙ্গে হাতাহাতি লড়াইটা যে কেমন, হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি আমি। আপনাকে তো সাহায্য করার জন্যে অনেকেই ছিলাম আমরা, আমাকে করার কেউ ছিলো না। কেউ জানতোই না যে আমাকে অকটোপাসে ধরেছে।
হ্যাঁ, বুদ্ধির জোরেই বেঁচে এসেছিলে সেদিন, কিশোর বললো। আর কপাল অসম্ভব ভালো ছিলো বলে।
ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো ওমর। যা-ই বলো, ডজকে বললো সে। আর তোমাকে ওখানে নামতে দিতে রাজি নই আমি। আমার ভালো মনে হচ্ছে না।
অহেতুক ভয় পাচ্ছো। একদিন বিশ্রাম নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিছু হবে না আমার। আর, হাসলো সে। লক্ষ লক্ষ টাকা কামাতে চাইলে ওরকম একআধটু ঝুঁকি নিতেই হবে। টাকা জিনিসটা তো আর সহজে পাওয়া যায় না।
দেখা যাক, ওমর বললো। ভাবনাচিন্তা করি। ঝিনুক যা তুলে এনেছো সেগুলো কি করবো?
সৈকতে ফেলে রাখতে হবে। পশ্চিম দিকে। ওপরে, যাতে জোয়ারের পানি নাগাল না পায়। দিন দুয়েকের মধ্যে পচে যাবে। দেখতে পারবো, অকটোপাসের সঙ্গে লড়াই করে কি আনতে পেরেছি। হাসলো ভজ। ঝিনুক খোলাটা একটা মহা উত্তেজনার কাজ, দারুণ খেলা। বোঝার উপায় নেই, কোনটা খুললে বেরিয়ে পড়বে অনেক টাকার সম্পদ।
হু। আপাতত পেটপূজাটা সেরে নেয়া যাক। খিদে পেয়েছে। খেয়েদেয়ে তুমি রেস্ট নাও। আমরা ঝিনুকগুলো সরিয়ে ফেলবো।
৭
যতোটা ভাবা গিয়েছিলো, তার চেয়ে বেশি কাহিল হয়ে পড়লো ডজ। দুই দিন লাগলো তার শক্ত হতে। থেতলানো জায়গাগুলোতে ব্যথা। তার অবস্থা দেখে সবাই তো ভয়ই পেয়ে গেল। ওদের মনে হতে লাগলো, ঝিনুক তোলার কাজটাই বাতিল করে দিতে হবে। সেকথা বলাও হলো ডজকে।
ডজ মানতে নারাজ। তার এক কথা, এক জায়গায় বড় অকটোপাস একটাই থাকে। সেটা যখন মারা পড়েছে, নিরাপদেই এখন ডুব দেয়া যায়। তার কথা শুনতে প্রায় বাধ্য করলো সে অন্যদেরকে।
কাজেই তৃতীয় দিনে আবার চললো ফ্লাইং বোট, মুক্তো খেতের উদ্দেশে।
বেশ কয়েকবার ডুব দিলো ডজ। দুপুরের দিকে, বেজায় কাহিল হয়ে পড়লো সে। সেদিনের মতো ঝিনুক তোলা স্থগিত রেখে দ্বীপে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলো ওমর।
ডজ জানালো, ঢালের অগভীর অংশটায় ঝিনুক আর বেশি নেই, তোলা হয়ে গেছে। এরপর তুলতে হলে আরও নিচের দিকে নামতে হবে। আরও বেশি পানিতে ডুবে অতো নিচে নামার ক্ষমতা তার নেই। স্বীকার করলো একথা। অবশ্য আর ঝিনুক তোলার দরকারও নেই। যা তুলেছে, তাতে যদি মুক্তো পাওয়া যায়, যথেষ্ট হবে। সেগুলো নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে যা টাকা পাওয়া যাবে তা দিয়ে বড় জাহাজ ভাড়া করতে পারবে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে, অভিজ্ঞ জাপানী ডুবুরি ভাড়া করে আরও গভীর থেকে ঝিনুক তোলার জন্য নিয়ে আসতে পারবে। এই এলাকার মুক্তো সব সাফ করে নিয়ে বিদেয় হবে তখন, তার আগে নয়।
দ্বীপে ফিরে চললো বিমান। কি ভাবছিলো ডজ, হঠাৎ মুখ তুনে হাসলো। এই শোনো, বিকেলটা শুধু শুধু বসে না থেকে ঝিনুকগুলো কিন্তু খুলে ফেলতে পারি। নিশ্চয়, এতোদিনে পচন ধরেছে ঝিনুকগুলোতে। দুর্গন্ধ এখন ততোটা হবে না।
কথাটা ঠিক। হুল্লোড় করে উঠলো সবাই।
ওমর বললো, ভালো কথা বলেছে।
লাঞ্চ সেরে আর একটা মুহূর্ত দেরি করলো না ওরা। সবাই উত্তেজিত হয়ে আছে ঝিনুকের ভেতরে কি আছে দেখার জন্যে। চলে এলো দ্বীপের পশ্চিম ধারে, যেখানে পচার জন্যে ফেলে রাখা হয়েছে ঝিনুক।
এসেই নাকমুখ কুঁচকে ফেললো ওমর, কিশোর আর মুসা। ওদের অবস্থা দেখে হেসে ফেললো ডজ আর দুই পলিনেশিয়ান। মরা ঝিনুকগুলোর দিকে এগোতে এগোতে ডজ বললো, এখনই এই, আরও পচলে কি করতে? তা-ও তো বাতাস বইছে উল্টো দিকে, সরাসরি নাকে এসে লাগে না। নইলে দুর্গন্ধ কাকে বলে বুঝতে। হাসলো সে। তার পরেই কি মনে পড়ায় হাসি মুছে গেল। চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকালো সাগরের দিকে।
কি হলো? জিজ্ঞেস করলো ওমর।
একটা কথা, তার দিকে তাকিয়ে আনমনে মাথা ঝাঁকাল ডজ। এতোগুলো ঝিনুক একবারে পচতে দেয়া ঠিক হচ্ছে কিনা বুঝতে পারছি না। ভয়াবহ গন্ধ, কল্পনা করতে পারবে না। সাগরের বিশ মাইল দূর থেকে পাওয়া যাবে। আর এই গন্ধ একবার যার নাকে লেগেছে, জীবনে ভুলবে না সে।
তুমি বলতে চাইছো কারনেসও পেয়ে যাবে?
মাথা কঁকালো ডজ। হ্যাঁ। তারপর গন্ধ শুকে ওকে এখানে এসে হাজির হওয়াটা কিছুই না তার জন্যে।
তা বোধহয় ঠিকই বলেছে।
অবশ্যই ঠিক বলেছি। তবে আর কিছু করার নেই এখন। ভবিষ্যতে আর এরকম ভুল করবো না। অল্প অল্প করে তুলে এনে পচাবো। মুক্তো বের করে নিয়ে হয় খোলাগুলো পুঁতে ফেলবো, নয়তো পানিতে ফেলে দেবো।
হ্যাঁ, সেটাই ভালো হবে। যদি আর এভাবে তোলার দরকার পড়ে আমাদের। জাহাজ নিয়ে এলে তো অন্য রকম ব্যবস্থা হবে।
হাতে করে একটা প্লাষ্টিকের বালতি আর একটা বিস্কুটের টিন নিয়ে এসেছে ডজ। বালতিতে পানি ভরে নিয়ে চলে এলো ঝিনুকগুলোর কাছে। গভীর আগ্রহ আর কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে অন্যেরা, বিশেষ করে কিশোর, ওমর আর মুসা।
একটা ঝিনুক তুলে বালতির ওপরে এনে ডালার ফাঁকে আঙুল ঢুকিয়ে দিলো ডজ। শক্ত কিছু লাগে কিনা দেখলো। তারপর ঝিনুকের ভেতরের নরম অংশটা বের করে ফেললো পানিতে। ডালাটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো একপাশে। সেটা কুড়িয়ে নিয়ে ঝুড়িতে রাখলো সাগরের হাসি।
