কুড়াল দিয়ে কোপাতে বোধহয় ভালো লাগেনি ঝিনুকের, সেটা রেখে দিয়ে ছুরি দিয়ে খোঁচা মারছে ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে। সাগরের হাসিও খোঁচাচ্ছে। দুজনে পানির একবারে কাছাকাছি চলে গেছে। সাংঘাতিক ঝুঁকি নিয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে একটা শুঁড় এসে টেনে নিতে পারে ওদেরকে পানিতে।
দড়ি ছাড়ছে না কিশোর। টেনে ধরে রেখেছে। বাঁকা হয়ে গেছে তার শরীর। টপটপ করে ঘাম ঝড়ছে কপাল থেকে।
দেখা যাচ্ছে, অকটোপাসের বড় বড় চোখ, কেমন সম্মােহনী দৃষ্টি। কুড়াল রেখে দিয়ে পিস্তল বের করলো ওমর। পিরিচের মতো বড় চোখদুটোর মাঝখানে সই করে গুলি শুরু করলো। খালি করে ফেললো ম্যাগাজিন।
আচমকা ঢিল হয়ে গেল দড়ি। চিত হয়ে পড়ে গেল কিশোর। কোনোমতে উঠে দেখলো, পানিতে ভাসছে ধূসর রঙের একটা মাংসের দলা, তাতে যেন জোড়া লেগে রয়েছে কতোগুলো কুৎসিত শুঁড়, তার কয়েকটা আবার কাটা, আরও ভয়ংকর লাগছে। ধক করে উঠলো বুক। ডজ কি নেই! না, আছে। ওই তো, হেলমেট দেখা যায়। নিচু হয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো ওমর আর সাগরের হাসি। টেনে তুললো ডজকে। চিত হয়ে মেঝেতে পড়ে রইলো ডুবুরি।
হেলমেটটা খোল! নির্দেশ দিয়েই ককপিটের দিকে ছুটলো ওমর। গর্জে উঠলো এঞ্জিন।
ম্যাকো! ম্যাকো! বাচ্চা মেয়ের মতো হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো সাগরের হাসি। হাত তুলে দেখালো। ফেকিকে এবার শেষ করবে!
সবাই দেখলো, কয়েকটা হাঙর এসে হাজির হয়েছে। কামড়াতে শুরু করেছে অকটোপাসটাকে। সাবাড় করতে সময় লাগবে না, বোঝা গেল। কেঁপে উঠলো কিশোর। ডজকে তুলতে আরেকটু দেরি হলেই…ভাবতে চাইলো না সে। মুসাকে ডাকলো তাকে সাহায্য করার জন্যে। হেলমেট খুলতে শুরু করলো। নিথর হয়ে পড়ে আছে ডজ। ছাই হয়ে গেছে মুখের রঙ। সেদিকে তাকিয়ে বলে উঠলো মুসা, খাইছে! মরেই গেল নাকি!
ছুটে গিয়ে কেবিন থেকে একটা ফ্লাস্ক বের করে নিয়ে এলো সে। আঙুল দিয়ে টেনে ঠোঁট ফাঁক করে মুখের ভেতরে ঢেলে দিলো খানিকটা ব্র্যান্ডি।
ততোক্ষণে লেগুনের কাছে পৌঁছে গেছে বিমান। প্রায় ওড়ার গতিতেই ছুটছে। পানির ওপর দিয়ে। কয়েকবার লাফিয়ে উঠেই পড়েছিলো কয়েক ইঞ্চি করে। মুখের কাছে পৌঁছেও গতি কমালো না ওমর। তীব্র গতিতে ঢুকে পড়লো সরু চ্যানেলে। নিয়ে এলো শান্ত পানিতে, যেখানে নোঙর করেছিলো। এঞ্জিন বন্ধ করে দিয়ে অন্যদেরকে সাহায্য করলো ডজকে তীরে নামাতে।
নারকেল গাছের ছায়ায় এনে আস্তে করে বালিতে শুইয়ে দেয়া হলো তাকে। চোখ মেললো ডজ। নীল আকাশের ছায়া পড়লো তার চোখে। দুর্বল কণ্ঠে ককিয়ে উঠলো, ঝিনুকগুলো আছে তো?
নিজে যে মরতে বসেছিলে, সেটা নয়, প্রথমেই ঝিনুকের চিন্তা, স্বস্তি মেশানো ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো ওমর। তোমাকে যে বাঁচাতে পেরেছি এতেই আমরা খুশি। চুলোয় যাক ঝিনুক। কিশোর, ধরো তো, স্যুটটা খুলে ফেলা যাক। ডজকে জিজ্ঞেস করলো, খুলতে পারবে তো? তোমার অসুবিধে হবে?
না। আমি ভালো আছি। কয়েকটা আঁচড় শুধু লেগেছে।
কয়েকটা আঁচড় যে কি পরিমাণ পোশাক খুলতেই দেখতে পেলো সবাই। মাথা থেকে পা পর্যন্ত কোনো জায়গা আর বাকি নেই, কালো কালো দাগে ভরা। থেঁতলে গেছে। ওসব জায়গায় শুড় দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে চাপ দিয়েছিলো দৈত্যটা। তবে জখম তেমন নেই, রক্ত বেরুচ্ছে না, হাতের ছুরির ক্ষতটা বাদে। কেননা কোনো জায়গা এখনও কাঁচা রয়েছে, যা পুরোপুরি শুকায়নি, সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে দুই এক ফোটা রক্ত। উঠে বসলো সে। কয়েক ঢোক ব্র্যান্ডি পেটে পড়তেই আরেকটু সুস্থ হলো।
ঝিনুক তোলার অভিযান তাহলে আমাদের শেষ? চোখে প্রশ্ন নিয়ে ভজের দিকে তাকালো ওমর।
কেন? এটা কোনো একটা ব্যাপার হলো নাকি? ডুবুরির জীবনে প্রায় প্রতিদিনই ওরকম ঘটনা ঘটে।
হাঁ করে ডজের দিকে তাকিয়ে রয়েছে কিশোর। তার মানে… তার মানে, আপনি আবার ওই জায়গাটায় নামবেন?
নিশ্চয়। আগের চেয়ে নিরাপদ ভাবলো এখন নিজেকে।
কেন? মুসার প্রশ্ন।
এজন্যে, ওখানে আর ওরকম দানব নেই, ডজ বললো। জানা কথা। এক রাজ্যে দুই রাজা বাস করতে পারে না। একটাই থাকে, আর সেটাকে মেরে ফেলা হয়েছে। সাগরের আতঙ্ক ওই শয়তানগুলো, সাধে কি আর ডেভিল ফিশ বলে। অনেকেই ভয় পায় ওগুলোকে, এড়িয়ে চলে।
হাঙররা পাচ্ছে না, কিশোর বললো।
মরা বলে। জ্যান্ত হলে আসতো না। হাসলো ডজ। এমন ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াতে গেল, যেন শক্ত হয়ে গেছে পা। অকটোপাসটাকেও খুব একটা দোষ দিই না। গাধামীটা আমিই করেছি। কালো একটা গর্ত দেখতে পেলাম। মাছটাছ কিংবা অকটোপাসের বাচ্চা দেখলাম না তার মধ্যে। ওরকম গর্তে যা প্রায়ই থাকে। ওগুলো কোনো ক্ষতি করতে পারে না। মানুষ দেখলেই বরং সরে যায়, বিশাল মাকড়সার মতো দেখতে লাগে। ভেতরে কিছু নেই দেখে অবাকই লাগলো। তবে গুরুত্ব দিলাম না। ভাবলাম, এরকম গর্তে অনেক ঝিনুক থাকবে। দেখতে গেলাম। কপাল ভালোই বলতে হবে আমার। কারণ প্রথম শুঁড়ের মাথাটা এসে আলতো করে ছুঁয়ে দেখলো আমার হেলমেট। সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেলাম ওটা কি। তারপর যা করার তা-ই করলাম। হাত দুটো তুলে ফেললাম ওপর দিকে, যাতে শরীরের সঙ্গে পেঁচিয়ে ধরে আটকে ফেলতে না পারে। ভাগ্যিস, তুলেছিলাম! আরেকটা শুঁড় এসে জড়িয়ে ধরলো আমার কোমর। তখন আমার হাত তোলা না থাকলে শেষ করে ফেলতো। লড়াই করার একটা সুযোগ অন্তত পেলাম। ছুরি বের করে ফেলেছি আগেই। খোঁচাতে শুরু করলাম। বোধহয় মিনিট বিশেক ওরকম লড়াই করেছি। তবে আমার মনে হয়েছে কয়েক যুগ। গর্তের ভেতর থেকে জুলজুল করে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো জীবটা। চারটে শুঁড় ব্যবহার করেছে আমাকে কাবু করার জন্যে। বুঝলাম, বাকি চারটে দিয়ে পাথর আঁকড়ে ধরেছে, গ্যাট হয়ে বসে থাকার জন্যে। আসলে চারটে শুঁড়ই আমাকে শেষ করে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। বাকিগুলো আর খাটাতে যাবে কেন? আমাকে তোলার সংকেত দিয়ে তখন লাভ নেই। তুলতে পারবে না। হাত দিয়ে টেনে তো দূরের কথা, যুদ্ধ জাহাজ দিয়ে টানলেও উঠতো কিনা সন্দেহ। তাই জোর যাতে কমানো যায় সেই চেষ্টা চালালাম। চারটে শুঁড়ের গোটা দুই যদি কেটে দেয়া যায় তাহলে জোর কমবে। আমার বড় ভয় ছিলো, দড়ি আর এয়ার টিউবের লাইন না ছিড়ে ফেলে। তাহলে আর কেউ বাঁচাতে পারতো না আমাকে। দড়িটা টানটান হয়ে ছিলো বলেই পেঁচিয়ে যায়নি কোনো কিছুতে। অনেক চেষ্টা করে আমার গায়ে পেঁচানো দুটো শুঁড়ের মাথা কেটে দিলাম। আরও দুটো বের করে আনলো তখন ওটা। পেঁচিয়ে ধরলো। ভাবলাম, সংকেত দিই। তার পরে মনে হলো, না, ছিড়ে যেতে পারে। আরেকটু জোর কমানো যাক। কিন্তু দুর্বল হয়ে গেছি ততোক্ষণে। আর সেটা বুঝতে পেরেছে জানোয়ারটা। টানতে শুরু করলো নিজের দিকে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি তখন চোখজোড়া। শয়তানীতে ভরা। একবার ভাবলাম, যাই, গিয়ে ছুরি দিয়ে খোঁচা মেরে গেলে দিই। কিন্তু ওই চেষ্টা করাটাই বোকামি। চোখের কাছে কিছুতেই পৌঁছতে দেবে না আমাকে। একটু পর পরই কালি ছুঁড়ে অন্ধকার করে দিচ্ছে পানি, যাতে ওর শরীর কিংবা শুঁড় দেখতে পারি আমি। প্রায় শেষ করে এনেছিলো আমাকে। পাথরের মতো ভারি হয়ে উঠছিলো হাত। নড়নোর শক্তিও পাচ্ছিলাম না আর। একটা হাত পেঁচিয়ে ফেললো শরীরের সঙ্গে। আরেকটাও আটকে ফেলবে যে কোনো সময়। দড়ি না টেনে আর উপায় নেই। আমাকে টেনে তার মুখের দুই গজের মধ্যে নিয়ে গেছে। টান দিলাম। পর পর চার বার। তার পর আর কিছু মনে নেই।
