একে একে চল্লিশটা ঝিনুক খুললো ডজ। যতোই খুলছে, হতাশা বাড়ছে। খোলাগুলো ছুঁড়ে ফেলছে। একটা মুক্তোও বেরোয়নি এতোক্ষণে। তবে, একচল্লিশ নম্বর ঝিনুকটা খুলে ভেতরে আঙুল ঢুকিয়েই চিৎকার করে উঠলো। বের করে আনলো ছোট নুড়ির সমান শাদা একটা জিনিস। তুলে দেখালো। রোদ লেগে ঝিক করে উঠলো যেন ওটার ভেতরের সুপ্ত আগুন।
মুক্তোটাকে চুমো খেলো সে। বললো, আমাদের সৌভাগ্য নাম্বার ওয়ান। এই শুরু হলো।
হাত থেকে হাতে ঘুরতে লাগলো মুক্তোটা।
দাম কতো হতে পারে? জিজ্ঞেস করলো মুসা। হাতের তালুতে রেখে মুক্তোটা দেখছে।
পাঁচ হাজারের কম বললে ঘুসি মারবো পাইকারের নাকে, হেসে জবাব দিলো ডজ।
যে হারে চলছে, ওমর বললো। তাতে এক বাটি ভরতেই অনেক সময় লাগবে। ঝুড়ি ভরতে অনেক দিন।
তবে ভরে ফেলবো, জোর দিয়ে বললো ডজ। অতো তাড়াহুড়ো করলে চলে না। মুক্তো বের করতে হলে ধৈর্য রাখতে হয়। একচল্লিশটা খুলে যে একটা পেয়েছি, এটা অনেক বেশিই মনে হয়েছে আমার কাছে। অনেক সময় কয়েক হাজার ঝিনুক খুলেও একটা মেলে না। আবার তার পর হয়তো পর পর ছয়-সাতটা খোলা হলো, দেখা যাবে সবগুলোতেই মুক্তো রয়েছে। এটা এক ধরনের জুয়াখেলা বলতে পারো। মরা ঝিনুকগুলোর ওপর হাত বোলালো সে। এগুলো হাজারে হাজারে খুলতে হবে বলে মনে হয় না। তবে হলে খুব হতাশ হব।
তার কথার সমর্থনেই যেন পরের ঝিনুকটাতেই পাওয়া গেল একেবারে পাঁচটা মুক্তো। তবে বেশি বড় নয়, ভালোও নয়। কমদামী জিনিস। যা-ই হোক, পাওয়া তো গেল। আশা বাড়লো ওদের। দ্রুত হাত চালালো ডজ। তার কাজ দেখেই বোঝা যায়, এই কাজে অভ্যস্ত সে।
কলরব করে উঠলো সবাই যখন অনেক বড় একটা মুক্তো বের করলো ডজ। দেখতে অনেকটা পানের মতো। রেফারেন্স বইতে লিখে রাখার মতো জিনিস এটা। কোনো একদিন হয়তো এটা শোভা পাবে কোনো রাজার মুকুটে, কিংবা রাজকুমারীর টায়রায়। আর পত্রিকায় যখন সেই ছবি দেখবে, কি একটা ধাক্কা খাবে, ভাবো? মনে করবে না, এটা তুমিই তুলেছিলে সাগরের তল থেকে! পঁচিশ থেকে তিরিশ হাজার ডলারে বিকোবে এটা। বিড়বিড় করে নিজেকেই যেন বললো সে।
খুব সুন্দর, কিশোর বললো।
তবে এতো সুন্দর আর লাগবে না, তিক্ত কষ্ঠে বিড়বিড় করলো ডজ। এখন যেমন লাগছে।
কাজ চলতে লাগলো। বিস্কুটের টিনে জমা হচ্ছে একের পর এক মুক্তো। একপাশে বড় হচ্ছে ফেলে দেয়া খোলার স্তূপ। শেষ ঝিনুকটাও খুলে ছুঁড়ে ফেলা হলো। কতগুলো মুক্তো পাওয়া গেল গুনতে লাগলো ডজ। পাঁচটা বড় বড় মুক্তো, অনেক দাম হবে সেগুলোর। উনিশটা পাওয়া গেছে মাঝারী আকারের। একটা ডাবল বাটন–দুটো মুক্তো জোড়া লেগে থাকলে ওগুলোকে বলে ডাবল বাটন আর দুই মুঠো সীড পার্ল-ছোট মুক্তো, কম দামী।
যাক, ভালোই পাওয়া গেল, ডজ বললো। অন্তত আফসোস করতে হবে না আর কিছু পেলাম না বলে। সব মিলিয়ে লাখ খানেকের বেশি চলে আসবে।
মুক্তো-টুক্তো তো ভালোই চেনেন, আইডিয়া আছে, মুসা বললো। কালচারড পার্লের কথা কিছু বলতে পারবেন? ওগুলোর নাম বেশ শোনা যায়। জাপানীরা নাকি ছোট ছোট খামার করে ওই মুক্তোর চাষ করে। খোলা ঝিনুকের পেটের ভেতরে হঠাৎ করে বালির কণা ফেলে দেয়, যাতে রস ছাড়তে পারে ঝিনুক। মুক্তো তৈরি হয়ে যায় ওই কণার চারপাশে রস জমে শক্ত হয়ে।
ওগুলো মুক্তো হলো নাকি? তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাত নাড়লো ডজ। আসল মুক্তোর সঙ্গে ওসবের কোনো তুলনাই হয় না। আর কিছুদিন পর ওগুলো স্টেশনারি দোকানেই কিনতে পাবে। গয়নায় লাগিয়ে ফেরিওয়ালারা বিক্রি করলেও অবাক হবো না।
এতোই শস্তা?
এতোই শস্তা।
কেন? ঝিনুকের পেট থেকেই তো আসে।
এলে কি হবে? রাসায়নিক কোনো গোলমাল রয়েছে হয়তো। ঝিনুকের পেট থেকে বের করার সময় চকচকেই থাকে, আসল মুক্তোর মতো। তারপর দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। তাড়াহুড়োয় তৈরি অনেক জিনিসের মতোই। আসল মুক্তোর মতো আভা থাকে না ওর ভেতরে। আর খোসা ছাড়ানো যায়।
খোসা! মুক্তোর? অবাক হয়েছে মুসা।
হ্যাঁ, খোসা। পেঁয়াজের খোসার মতো। একটার ওপরে আরেকটা জড়িয়ে থাকে। কথা বলছে, আর বালতির পানিতে হাতড়াচ্ছে ডজ, মুক্তো রয়েটয়ে গেল কিনা দেখছে।
ভুলেই গিয়েছিলাম, আচমকা বলে উঠলো কিশোর। আরেকটা আছে।
সবগুলো চোখ ঘুরে গেল তার দিকে। ওমর জিজ্ঞেস করলো, কী?
সেই প্রথম মুক্তোটা, সাগরের হাসি যেটা তুলে এনেছিলো। রেখে দিয়েছিলাম। একটা গাছের গোড়ায়। যাই, নিয়ে আসি। দৌড়ে গিয়ে আধখোলা একটা ঝিনুক নিয়ে ফিরে এলো কিশোর। চেহারা দেখে তো মনে হয় না এর ভেতরে কিছু আছে। ঝিনুকটা ছোট। দেখতে বিশ্রীই বলা চলে। খোলার নানা জায়গায় দাগ, নিশ্চয় কোনো রোগ হয়েছিলো। শ্যাওলা লেগে রয়েছে এখনও, শুকিয়ে গেছে। অনেক বয়েস। বালিতে বসে পচা মাংসে আঙুল ঢুকিয়ে দিলো সে। শক্ত হয়ে গেল হঠাৎ। মুখ তুলে তাকালো সবার দিকে।
হাসলো ডজ। প্রথম মুক্তোটা পেলে ওরকমই হয়।
এটা আমার প্রথম নয়, কাঁপা গলায় বললো কিশোর। বড় বলেই! দুই আঙুলে ধরে মার্বেলের মতো বড় একটা মুক্তো বের করে আনলো সে। শাদা নয় ওটা, গোলাপী। এই জিনিস আগেও দেখেছে সে। একটা নয়, অনেকগুলো, আস্ত একটা হার। তবে সেগুলোর কোনোটাই এটার মতো বড় ছিলো না। এতো জীবন্তও নয়। হ্যাঁ, ভেতরের আগুন এমনভাবে ঝলকাচ্ছে, তার কাছে জ্যান্তই লাগছে জিনিসটা।
