এভাবে হবে বলে মনে হয় না! উৎকণ্ঠা আর উত্তেজনায় ভারি হয়ে উঠেছে মুসার নিঃশ্বাস। অন্য কিছু করা দরকার!
মিনিটখানেক সময় দিয়ে দেখা যেতে পারে! কিছু করার সিদ্ধান্ত ওমরও নিতে পারছে না। রক্ত সরে গেছে মুখ থেকে। হয়তো তাড়িয়ে দিতে পারবে। প্রয়োজন হলে নিশ্চয় তোলার জন্যে সংকেত দিতো।
হাতটাত সব জড়িয়ে ধরেছে কি না তাই বা কে জানে! কিশোর বললো। হয়তো নড়তেই দিচ্ছে না! জানোয়ার তো না ওগুলো, শয়তানের চেলা!
দাঁড়াও! টেনো না!
মিনিটখানেক কেউ কোনো কথা বললো না। দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে কিশোর। মূর্তির মতো।
ঝিনুক, অবশেষে বললো ওমর। নিচে গিয়ে দেখবে কি হয়েছে?
হাত থেকে ঝুড়ির দড়িটা ছেড়ে দিলো ঝিনুক। কোমর থেকে ছুরিটা নিয়ে দাঁতে কামড়ে ধরে ঝাপ দিতে যাবে এই সময় চিৎকার করে উঠলো কিশোর, টানছে!…এক…দুই…তিন… চার! তার মানে টানতে হবে, যতো জোরে পারা যায়! টানতে শুরু করলো সে। একচুল নড়লো না দড়ি। যেন পাথরে আটকে গেছে। ওমরভাই! ঝিনুক! ধরো!
দুজনেই ছুটে এলো তাকে সাহায্য করার জন্যে। কিন্তু তিনজনে মিলে টেনেও এক ইঞ্চি তুলতে পারলো না দড়ি।
ইয়াল্লা! বলে উঠলো ওমর। আর জোরে টান দিলে ছিড়ে না যায়! খসখসে হয়ে উঠেছে তার কণ্ঠ। না টেনে আর কিছু করারও নেই। মুসাকে পাম্প চালিয়ে যেতে বলে আবার টান দিলো দড়িতে। তিনজনে মিলেই টানছে। দড়ি আর নড়ে না।
হবে না, দাঁতের ফাঁক দিয়ে বিড়বিড় করলো কিশোর। বোধহয় পেঁচিয়ে ফেলেছে কোনো কিছুতে। দেখি আরেকবার চেষ্টা করে। সাগরের হাসি, এসো, তুমিও ধরো।
চারজনে মিলে টানতে শুরু করলো। ঘাম বেরিয়ে এসেছে সকলেরই। টানের চোটে একপাশে কাত হয়ে গেছে বিমানটা। তবু এক ইঞ্চি নড়লো না দড়ি। মনে হচ্ছে ওমরের অনুমানই ঠিক। পেঁচিয়ে গেছে কিছুতে।
সোজা হয়ে দাঁড়ালো ওমর। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো। ও বলেছে যততক্ষণ দড়ি না ছেড়ে, টানতে। ঠিক আছে। হয় সে উঠবে, নয়তো দড়ি ছিড়তে যাচ্ছি আমি। এটাই ওর শেষ সুযোগ! কিশোর যেখানে ধরেছে, তার পেছনের দড়ির অংশটুকু নিয়ে একটা সীটের পায়ায় পেঁচিয়ে বাঁধলো সে। সবাইকে দড়ি ছেড়ে দিতে বলে গিয়ে উঠে বসলো পাইলটের সীটে। থ্রটলে চেপে বসলো আঙুলগুলো। মৃদু ঝিরঝির করে চলছিলো এঞ্জিন, সেটা রূপান্তরিত হলো গর্জনে। সামনে টান দিলো বিমান। ধনুকের ছিলার মতো টানটান হয়ে গেল দড়ি। প্রচন্ড চাপে ডানে কাত হয়ে গেল বিমান। ডানার ডগা পানি ছুঁই ছুঁই করছে। কিন্তু আগে আর বাড়তে পারছে না। শেষে ডানে কেটে, চক্রাকারে ঘুরতে শুরু করলো।
কতোটা দিয়েছেন? চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো কিশোর।
হাফ থ্রটল।
আরো লাগবে। দড়ি নড়ছে না। চালিয়ে যান।
ভয় লাগছে, প্লেনটাই না উল্টে যায়!
যাবে না। টানুন।
আরও গম্ভীর হয়ে গেল এঞ্জিনের গর্জন।
উঠছে? উঠছে! চিৎকার করে উঠলো কিশোর।
আরো জোর বাড়ালো ওমর। বুনো ঘোড়ার লাগাম পরানো হয়েছে যেন, খেপে গেছে, ওরকম আচরণ করছে বিমান। যেখানটায় ঘুরছে ওটা, সেখানে ফেনার ঘূর্ণি সৃষ্টি হয়েছে।
আসছে। আবার চেঁচিয়ে বললো কিশোর। দড়ি ধরে টানতে শুরু করেছে সে। ঠেলে বেরিয়ে আসবে যেন চোখ, পরিশ্রমে।
হঠাৎ থ্রটলের পাওয়ার কেটে দিয়ে লাফিয়ে নেমে গেল ওমর, কিশোরকে সাহায্য করার জন্যে। ঝিনুক আর সাগরের হাসিকেও ডাকলো। টানো! টানো! ছাড়বে না!
মুসা পাম্প ছাড়ছে না। উঠে আসছে ডেজা দড়িটা, প্রতিবারে এক ফুট করে।
ওমাথায় ডজ ছাড়াও আর কিছু আছে, ওমর বললো। ভাগ্যিস, নতুন দড়ি। মোটা দেখে লাগিয়েছিলো ডজ।
নাইলন না হলে যতো মোটাই হোক, টিকতো না, মুসা বললো।
হ্যাঁ। ঝিনুক, কুড়াল নিয়ে গিয়ে দাঁড়াও।
এক ফুট এক ফুট করে উঠে আসছে দড়ি। সাংঘাতিক কাত হয়ে গেছে বিমান। এখন শুধু কিশোর আর ওমর টানছে। সাগরের হাসিও চলে গেছে দরজার কাছে, উবু হয়ে বসে তাকিয়ে রয়েছে পানির দিকে। হঠাৎ লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো। আসছে! আসছে! ওই তো! একটু থেমে আবার চিৎকার করে উঠলো তীক্ষ্ম কণ্ঠে। আসছে! ফেকি আসছে! হাতে ছুরি, সামান্য ফাঁক হয়ে আছে দাঁত। চকচকে চোখ। পুরোপুরি বন্য লাগছে এখন তাকে, আদিম মানবী, ভয়াবহ শত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ের জন্যে তৈরি।
পানির ওপরে ঝটকা দিয়ে বেরিয়ে এলো একটা শুঁড়, বীভৎস ভঙ্গিতে পেঁচালো আর খুললো, প্রজাপতির শুঁড়ের মতো করে। কিলবিল করে উঠলো।
খবরদার! টান ছাড়বে না! চিৎকার করে বললো ওমর।
টেনে ডুবিয়েই না ফেলে!
টান ছেড়ো না! প্লেন ডুববে না। ওই তো, আরও উঠছে। ডজকে পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে অকটোপাসটা। ধরে রাখো, ছেড়ো না। বলে দড়ি ছেড়ে দিলো ওমর। তুলে নিলো একটা হাতকুড়াল। সাগরের হাসিকে তখন যেটা দিয়েছিলো। কোপ মারলো পানিতে।
দড়ি কাটবেন না! সাবধান! চেঁচিয়ে হুশিয়ার করলো কিশোর।
কিশোর, আমিও যাই! হাত নিসপিস করছে মুসার। পাম্পের কাছে এভাবে বসে থাকতে আর ভালো লাগছে না ওর।
না! তাড়াতাড়ি বললো কিশোর। যা করছো করো।
ওমর কিছুই বললো না। কুপিয়ে চলেছে। ভেসে উঠলো একটা, কাটা শুঁড়। এখনও পাক খুলছে আর বন্ধ করছে। টিকটিকির লেজের মতোই যেন শরীর থেকে আলাদা হয়ে গেলেও মরে না। আরেকটা শুঁড় বেরিয়ে এসে বিমানের কাঠামো পেঁচিয়ে ধরে টান দিলো। কাত করে ডুবিয়ে দেয়ার ইচ্ছে যেন বিমানটাকে। ধা করে কোপ মারলো ওমর। শুঁড় কেটে প্লাইউডে বসে গেল কুড়ালের ফলা। হ্যাচকা টান দিয়ে তুলে আনলো আবার।
