কয়েকবার করে চললো এরকম। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে অনেক ঝিনুক জমে গেল কেবিনে। সেগুলোকে ছড়িয়ে দেয়া হলো মেঝেতে, বিমানের ভারসাম্য সমান রাখার জন্যে। নইলে একদিকে বেশি কাত হয়ে যাবে। সবচেয়ে কম গভীর জায়গাটা প্রায় খালি করে ফেললো ডজ। তারপর সরে গেল আর একটু গভীরে মাঝে মাঝে ওপর থেকে তাকে দেখা গেল হালকা রঙের প্রবালের ওপর দিয়ে পার হয়ে যাওয়ার সময়। কিন্তু গাঢ় রঙের প্রবালের মাঝে যেখানে অন্ধকার হয়ে আছে, সেখানে থাকলে দেখা যায় না। পানিতে বেশিক্ষণ ডুবে থাকলে, কিংবা গভীর পানিতে থাকলে ডুবুরির রক্তে এক ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটতে থাকে। তখন তাকে তাড়াতাড়ি তোলার চেষ্টা করলে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হয়। এতে অকল্পনীয় কষ্ট পেয়ে মারা যায় রোগী। তবে ডজ এখন যে গভীরতায় রয়েছে, তাতে সেরকম কিছু ঘটার সম্ভাবনা নেই।
ডজের উঠে আসার ইঙ্গিত পেয়ে হাঁপ ছাড়লো কিশোর। কয়েক মিনিট পর তার মাথা ভেসে উঠলো পানির ওপরে। দুর্বল ভঙ্গিতে মই বেয়ে উঠে এসে মেঝেতে বসে পড়লো সে। তার হেলমেট খুলে নেয়া হলো।
ভালোই তুলেছি, তাই না? ঝিনুকগুলোর দিকে তাকিয়ে বললো ডজ। জিরাতে এলাম।
নিচেটা কেমন? জিজ্ঞেস করলো কিশোর।
চমৎকার। দুএকটা বিশ্রী খাঁজ আছে অবশ্য। ডাঙার ওপরের পাহাড়েও থাকে ওরকম। তাতে হোঁচট খেয়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে। আরেকটা বাজে জিনিস হলো প্রবাল, আকৃতির কোনো ঠিকঠিকানা নেই। লাইফ লাইন আর এয়ার টিউবের ওপর কড়া নজর রাখতে হয়েছে সারাক্ষণ। প্রবালে ঘষা লেগে কিংবা জড়িয়ে গিয়ে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। স্রোতও বেশ জোরেই টানে।
দড়ি প্যাঁচ লাগে নাকি?
লাগে মানে? প্রবালে ওটাই তো বেশি লাগে। সব চেয়ে বড় ভয় এখানে।
ডাইভিং স্যুট খুললো না ডজ। আরেকবার নামার ইচ্ছে। যতগুলো তুলেছি, আরও অতগুলো তুলবো, বললো সে। ঝিনুককে বললো আবহাওয়ার দিকে নজর রাখতে। কারণ কখন বাতাস বইতে আরম্ভ করবে তার ঠিক নেই। ঝিনুকই সেটা ভালো বুঝতে পারবে। সাগরে হঠাৎ ঢেউ উঠলে বিপদে পড়তে চায় না ডজ।
তবে আবহাওয়া পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। আগের মতোই শান্ত রয়েছে সাগর। কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো ডজ। নেমে গেল পানিতে।
পঁয়তাল্লিশ মিনিট পেরোলো। বিমানে যারা বসে আছে তাদের কাছে অনেক দীর্ঘ লাগছে। তবে ঝিনুক তোলার বিরাম নেই। কিছুক্ষণ পর পরই ঝুড়ি ভর্তি করে পাঠাচ্ছে।
অনেক হয়েছে, অবশেষে ঝিনুকের স্কুপের দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করলো ওমর। আর বেশি তুললে বিপদে পড়তে পারি।
বিপদ? বুঝতে পারলো না মুসা।
বাতাস বইতে শুরু করলে আর ঢেউ উঠলে মহাবিপদ হবে। এতো ভার নিয়ে কিছুতেই আকাশে তোলা যাবে না প্লেন। সীসার মতো ভারি হয়ে যাবে, উঠতেই চাইবে না পানি থেকে। বাঁচার তাগিদে তখন ঝিনুক ফেলেও দেয়া লাগতে পারে। এতো কষ্ট করে তুলে এনে ফেলার কোনো মানে হয় না। তার চেয়ে কম রাখাই ভালো। আকাশের দিকে তাকালো সে। আকাশ অবশ্য ভালোই আছে। হঠাৎ খারাপ হবে বলে মনে হয় না। তবে এখানকার আবহাওয়াকে বিশ্বাস না করাই ভালো।
সেটা খুব ভালো করেই জানে কিশোর আর মুসা। আগের বার এখানে এসে হারিকেনের রূপ দেখছিলো ওরা। ভাবলেই পিলে চমকে যায়।
ভাবতে চাইলো না কিশোর। বললো, আর বেশি তুলবেও না। ঘড়ি দেখলো সে। উঠে চলে আসবে। লাইফ লাইনটাকে এমন ভাবে ছুঁলো, যেন বড়শি ফেলে মাছের অপেক্ষায় রয়েছে, ফাৎনায় টান পড়লেই মারবে কষে টান।
আরও কয়েক মিনিট পেরোলো। টেনে তোলার সংকেত আর আসে না। অনেকক্ষণ হলো, কিশোর বললো, আর কোনো ঝিনুকও তো পাঠাচ্ছে না।
কেউ জবাব দিলো না। ধীরে গড়িয়ে চলেছে সময়, মিনিটের পর মিনিট কাটছে। ঘড়ির দিকে তাকালো ওমর। তারপর ইনস্ট্রমেন্ট বোর্ডের দিকে। এক ঘণ্টা হয়ে গেছে। ঘোষণা করার মতো করে বললো।
নড়ছে, বললো কিশোর। দড়িতে টের পাচ্ছি। তবে বেশি না। ঝিনুকের খোলে পা দিলো না তো? বড়গুলোর?
বিমানের পিঠের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে নিচে তাকিয়ে রয়েছে সাগরের হাসি বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ কোনো কথা বলছে না। হঠাৎ কোমর থেকে একটানে ছুরিটা খুলে নিয়ে দাঁতে কামড়ে ধরলো। পিছলে নেমে গেল পানিতে। মাথা নিচু করে দ্রুত সাঁতরে নেমে যেতে লাগলো।
চট করে মুসার চোখে চোখে তাকালো কিশোর। দৃষ্টি ফেরালো ওমরের দিকে।
শ্রাগ করলো ওমর। বুঝলাম না কেন ওরকম করলো! নিশ্চয় কোনো কারণ আছে।
খাইছে! প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো মুসা। উঠে আসছে! এতো তাড়াহুড়ো করছে কেন?
ভুস করে পানির ওপরে মাথা তুললো সাগরের হাসি। মুখ থেকে পানি ছিটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো, ফেকি! ফেকি! দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে বললো, অনেক বড়!
ফেকি! খোদা! অকটোপাসের কথা বলছে! ফ্যাকাসে হয়ে গেছে কিশোরের চেহারা। ওমর ভাই, কি করবো? টেনে তোলার চেষ্টা করবো?
ও তো বললো সংকেত না দিলে না টানতে, কঠিন হয়ে উঠেছে ওমরের মুখ।
ভাবভঙ্গিতে আর ভাঙা ইংরেজিতে মেয়েটা জানালো, অকটোপাসের সঙ্গে লড়াই করছে ডজ। সাগরের হাসি তাকে সাহায্য করতে যেতে সাহস করেনি। দড়িতে জড়িয়ে যেতে পারে। আটকে গিয়ে দম আটকে মরবে তখন।
মুসা, থেমো না! কিশোর বললো, পাম্প চালিয়ে যাও! দড়ি টান দিলো সে। একটুও উঠলো না। টানটান হয়ে গেল দড়ি। কাঁপছে, মৃদু।
