মেয়েটার হাতে ঝিনুক দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠলো ডজ। ওই তো! পেয়েছে, পেয়েছে! সাগর এখানে বেশি হলে একশো ফুট গভীর। কেন দেখা যাচ্ছে বুঝতে পারছি। সূর্য অনেক নিচুতে রয়েছে। খাড়া রোদ না পড়লে দেখা যাবে না তল। আমি যখন দেখেছি, তখন ঠিক দুপুর, মাথার ওপরে ছিলো সূর্য।
হ্যাঁ, এটা ঠিক বলেছে, একমত হয়ে মাথা দোলালো ওমর।
ঝিনুকটা বিমানের ভেতরে ছুঁড়ে দিয়ে বেয়ে উঠে এলো সাগরের হাসি। উত্তেজিত কণ্ঠে মারকুইজান ভাষায় দ্রুত কিছু বললো ডজকে। নিচের দিকে দেখাতে লাগলো।
ও বলছে, অনুবাদ করে বললো ডজ। সাগরের তলা এখানে পাহাড়ের ঢালের মতো নেমে গেছে। আর ওদিকটায় গভীরতা কম। আমি যা ভেবেছিলাম। আসলে সাগরের তল নয় এটা, একটা ডুবো পর্বতের চূড়া। ওমর, ওদিকটায় নিয়ে যাও।
চালাতে শুরু করলো ওমর। ফ্লাইং বোটটাকে নিয়ে এলো ডজের নির্দেশিত স্থানে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, রাখো এখানেই! চেঁচিয়ে বললো ডজ। তল দেখতে পাচ্ছি। ওই তো! বলেছিলাম না? পানি বেশি হলে বিশ-তিরিশ ফুট হবে!
অন্যেরও তাকিয়ে দেখলো, ঠিকই বলছে ডজ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সাগরের তল। অসংখ্য ঝিনুক ছড়িয়ে আছে, ডালা ফাঁক করা।
দেরি করলো না ডজ। ডাইভিং স্যুট পরতে আরম্ভ করলো। তার দিকে তাকিয়ে মুসাও উসখুস করে উঠলো ওই পোশাক পরে ডুব দেয়ার জন্যে। কাজটা বিপজ্জনক, তার পরেও আনন্দ পায় সে। খুব ভালো ডুবুরি মুসা। কানে বাজছে ওস্তাদের কণ্ঠস্বর, অনেকে পেশা হিসেবে নেয় কাজটাকে। ভয়ানক বিপজ্জনক পেশা। দুনিয়ার কোনো বীমা কোম্পানিই ডুবুরির জীবন বীমা করতে রাজি নয়। কারণ যে কোনো মুহূর্তে যা খুশি ঘটে যেতে পারে তার।
ঠিক যেন সেই ওস্তাদের কথাগুলোই নকল করে বলতে লাগলো ডজ, মুসার সেরকমই মনে হলো, বিপদে পড়াটা এখানে কিছুই না। অনেক ব্যাপার আছে। সেগুলো এখন কোনোটাই মনে করতে চাই না। তবে একটা কথা না বলে পারছি না। বাথটাবের মতো বড় বড় ঝিনুক আছে সাগরে, এখানটায়ও থাকতে পারে। টন খানেক ওজন হবে। ডালা ফাঁক করে ছড়িয়ে পড়ে থাকে অনেক সময়, শিকার ধরার জন্যে। ওটার মধ্যে পা পড়লে আর রক্ষা নেই। ঝট করে বন্ধ হয়ে যাবে ডালা। টেনে খোলা অসম্ভব। কপাল ভালো হলে তখন ডাইভারের কোনো একজন সঙ্গী গিয়ে যদি পা কেটে আলাদা করে তুলে আনতে পারে। আর কোনো উপায় নেই। সাগরের হাসি আর ঝিনুককে দেখিয়ে বললো, ওরা এসেছে, খুব ভালো হয়েছে। ওরকম অবস্থায় পড়লে কি করতে হবে জানে। দুজনের সঙ্গে কথা বললো সে। একটা করে হাতকুড়াল তুলে দিলো ওদের হাতে। মাথা ঝাঁকাল দুজনেই। হাসি হাসি ভঙ্গিটা দূর হয়ে গেছে মুখ থেকে।
এসব কথা কিশোরেরও জানা আছে। সে আর রবিনও মুসার সাথে একই সময়ে ট্রেনিং নিয়েছে। তবে মুসা জাতসাঁতারু, ওরা নয়। কিছুদিন দক্ষিণ সাগরের কোনো দ্বীপে মুসাকে রেখে দিলে সে-ও ঝিনুক কিংবা সাগরের হাসির সঙ্গে সমানে পাল্লা দিতে পারবে।
সংকেতগুলো মনে আছে তো? কিশোর, মুসা আর ওমরের দিকে তাকিয়ে বললো ডজ। ঈশ্বর যেন সেরকম অবস্থায় না ফেলেন! দড়িতে চারটে টান দিলে বুঝতে হবে, ভয়ানক বিপদে পড়েছি। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব তখন দড়ি টেনে তুলে আনতে হবে। ওরকম করার প্রয়োজন সাধারণত পড়ে না, দশ লাখে একবার হয়তো পড়তে পারে, আমি যদ্দুর জানি। তবু, ওই একটা বার আমার কপালেও ঘটতে পারে। টানতেই থাকবে, দড়ি ছিড়ে যায় যাক, তবু থামবে না। তবে সংকেত না পেলে কক্ষণাে ওরকম করবে না, বুঝলে? শেষ কথাটা ওমরের দিকে তাকিয়ে বললো সে।
হ্যাঁ, বুঝেছি, শান্তকণ্ঠে বললো ওমর।
বেশ। এবার আমাকে সাজিয়ে দাও, এই কথাটা কিশোর আর মুসাকে উদ্দেশ্য করে বললো ডজ।
ডাইভিং স্যুটের বেল্ট বাঁধতে তাকে সাহায্য করলো দুই গোয়েন্দা। সব শেষে হেলমেটটা মাথায় গলিয়ে সকেটে বসিয়ে দিলো। নাটগুলো টাইট করে দিলো দুজনে। বেজায় ভারি পোশাক। পা টেনে টেনে এগোলো ডজ বিমানের দরজার পাশে ঝুলিয়ে রাখা মইয়ের দিকে, ওটা বেয়েই নামতে হবে।
নেমে গেল নিচে। পানিতে মাথা ডোবানোর আগে এক মুহূর্ত থেমে ওপরের দিকে তাকালো। হেলমেটের কাচের ঢাকনার ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে তার মুখ। হাসলো। তারপর ডুবে গেল। ডাইভিং স্যুটের সঙ্গে যুক্ত এয়ারপাম্পের হ্যান্ডেল ঘোরাতে শুরু করে দিয়েছে মুসা। কিশোর ছাড়ছে লাইফ লাইন। স্কুবা ডাইভিঙে যেসব পোশাক ব্যবহার হয়, ওগুলোতে এতো সব ঝামেলা করতে হয় না। তবে ওগুলো নিয়ে বেশি দূর যেমন নামাও যায় না, বেশিক্ষণ ডুবেও থাকা যায় না পানিতে। কারণ পিঠে বাধা অক্সিজেন সিলিন্ডারে থাকে সীমিত অক্সিজেন। আর নিজের দায়িত্বে ঘুরে বেড়ায় ডুবুরি। কিছু ঘটলে বাইরের কেউ জানতে পারে না তার কিছু হয়েছে।
মিনিটখানেক পরে দড়ি হঠাৎ ঢিল হয়ে যাওয়ায় বোঝা গেল তলায় পৌঁছেছে ডজ। ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকালো কিশোর। সঙ্গে সঙ্গে দড়িতে বাঁধা একটা তারের ঝুড়ি নামিয়ে দিলো ছেলেটা, ঝিনুক ভোলার জন্যে। ওর হাতে কুড়াল। তাকিয়ে রয়েছে পানির দিকে।
কয়েকটা মিনিট কেটে গেল। দড়িতে একটামাত্র টান পড়লো।
ঝুড়ি তোলো, নির্দেশ দিলো কিশোর।
তোলা হতে লাগলো। পানির অনেক নিচে থাকতেই দেখা গেল ঝুড়িটা। বিশ-পঁচিশটা বড় বড় ঝিনুকে বোঝাই। কোথায় রাখতে হবে দেখিয়ে দিলো ওমর। কেবিনের মেঝেতে ওখানে ঝিনুকগুলো ঢেলে দিয়ে আবার ঝুড়িটা নিচে পাঠিয়ে দিলো ঝিনুক।
