অবশেষে নীরবতা ভাঙলো ওমর, কিশোরের দিকে তাকিয়ে বললো, পাহারায় থাকতে হবে। কারনেসকে বিশ্বাস নেই। প্রথম পালা তোমার।
ঠিক আছে, বস, পরিবেশটাকে হালকা করার জন্যে হেসে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো কিশোর। আগুনের দিকে তাকিয়ে আনমনে মাথা নাড়তে নাড়তে বললো, মনে হচ্ছে, এই পৃথিবীতে নেই আমরা, অন্য কোনো গ্রহে চলে গেছি! আশ্চর্য! আগেও তো দক্ষিণের দ্বীপে এসেছি, আটকা পড়েছি, পানির অভাবে মরতে বসেছি, তখন তো এরকম লাগেনি!
লাগেনি, ডজ বললো। তার কারণ, তখন বাঁচার জন্যেই ব্যস্ত ছিলে। চুপ করে বসে থাকার সময়ই ছিলো না। ফলে বিষন্নতাটা টের পাওনি। যে কোনো জায়গাতেই থােক, বাড়িতেও, কাজকর্ম না থাকলে, শুধু শুধু বসে থাকতে হলে মন খারাপ হয়ে যায়।
আস্তে ঘাড় নাড়লো কিশোর। হ্যাঁ, তা বটে।
৬
কাঁকড়ার যন্ত্রণায় রাতে ভালো ঘুমোতে পারেনি কিশোর। ঘরের মধ্যে এসে ঢুকেছে ওগুলো, বার বার গায়ের ওপর উঠেছে। মুসা আর ওমরের ঘুম ভেঙেছে ওগুলোর জ্বালায়। তবে ডজ, সাগরের হাসি আর ঝিনুকের কিছু হয়নি। ওদের অভ্যেস, হয়ে গেছে।
ঝিনুক তুলতে যাওয়ার জন্যে ফ্লাইং বোটে চড়লো ওরা। সকালটা বেশ ভালো। ওরকম একটা কাজে যাওয়ারই উপযুক্ত। এমনকি খোলা সাগরও শান্ত।
ট্যাক্সিইং করে চললো ওমর। পাশে বসে নির্দেশ দিতে লাগলো ডজ, কোনদিক দিয়ে যেতে হবে। বাইরে যদিও ঢেউ প্রায় নেই, তবু লেগুনে ঢোকার মুখটায় জোয়ারের পানি ঢোকার তীব্র স্রোত রয়েছে। বিমানটাকে এগোতে বাধা দিচ্ছে। তবে ঠেকাতে পারলো না। কারণ দুটো এঞ্জিন রয়েছে। তাছাড়া ওটার উইং ফ্লোটগুলো পানিতে তেমন ডোবে না। কামড় বসাতে পারলো না পানি। নৌকা-টৌকা হলে অবশ্য অন্য কথা ছিলো।
খোলা সাগরে বেরোতেই হাত তুলে একটা দিক নির্দেশ করলো ডজ, ওদিকে যেতে হবে। ওড়ার দরকার নেই। সাগর যে রকম শান্ত, এভাবেই চালিয়ে চলে যাওয়া যাবে। তবে প্রবালের দেয়াল-টেয়াল আছে কি না লক্ষ্য রাখতে হবে। এসব সাগরে ওসবের বিশ্বাস নেই। কোথায় যে পানির তলায় ঘাপটি মেরে থাকে, কিছু বোঝা যায় না। এমনিতে মনে হবে শুধু পানি, কিন্তু ফুটখানেক নিচেই হয়তো রয়েছে দেয়াল। লাগলে ফ্লোটের বারোটা বেজে যাবে।
জানালার পাশে বসে দেখছে কিশোর। সাগরের ওপর দিয়ে এভাবে ট্যাক্সিইং করে ছুটে যেতে দারুণ লাগছে তার। জাহাজ কিংবা স্পীড বোট এতো জোরে ছুটতে পারে না। কোথাও কোনো বাধা নেই। শুধুই ছুটে চলা। আনন্দে বেসুরো গলায় গানই গেয়ে উঠলো সে।
পনেরো মিনিট একটানা সামনে ছুটলো ওমর। তারপর গতি কমাতে বললো ডজ। তার মনে হলো জায়গাটার কাছে পৌঁছে গেছে। চেনার মতো কোনো চিহ্ন নেই। কয়েকশো গজের মধ্যে চলে এলেও বোঝার উপায় নেই। সাগরে এমনকি যন্ত্রের রিডিংও সঠিক হয় না। গড় কিংবা প্রায় ধরে নিতে হয়।
গতি একেবারে কমিয়ে ফেললো ওমর। ডজকে জায়গাটা খুঁজে বের করার সুযোগ দিলো।
বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুজি করলো। বের করতে না পেরে বললো, আশপাশে থাকতে পারে। এক কাজ করো। গতি এরকমই থাক। চক্কর দিতে শুরু করো তো।
যে ভাবে যা করতে বলা হলো, সে ভাবেই করতে লাগলো ওমর। সব কটা চোখ এখন পানির দিকে। সাগরের তল খুঁজছে।
দেখি, রাখ তো এখানে, ডজ বললো ওমরকে। ভাসুক। পেট্রোল খরচ বাঁচবে। ডজ আইল্যান্ড দেখা যায় ওখান থেকে। সেটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে খেতটা কোন জায়গায় হতে পারে বোঝার চেষ্টা করতে লাগলো। এখানেই আছে কোথাও। মুশকিলটা হলো, এখন সাগর শান্ত। আমি দেখেছি ঢেউয়ের সময়। এখন ডুব দেয়া সহজ বটে, কিন্তু জায়গাটা খুঁজে বের করা কঠিন।
স্টার্ট বন্ধ করলো না ওমর, তবে গতি বন্ধ করে দিলো। সাগরের ওপর ভেসে রইলো ফ্লাইং বোট। একটু একটু করে সরছে। পেরিয়ে গেল কয়েকটা নীরব মুহূর্ত। এখনও সব কটা দৃষ্টি পানির দিকে, সাগরের তল খোঁজায় ব্যস্ত।
আমাদের এই কান্ড দেখলে এখন, হেসে বললো মুসা। পাগল বলতো লোকে। ফ্লাইং বোটে বসে সাগরের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকা। হাহ হাহ।
হ্যাঁ, ওমরও হাসলো।
তোমাদের সন্দেহ হচ্ছে মনে হয়? ভুরু কোঁচকালো ডজ। এখানে নেই ভাবছো নাকি?
না না, তা ভাবছি না। তবে যে রকম করে খুঁজছি আমরা সেটা হাস্যকর।
এই দেখ, ওটা কি? আচমকা চিৎকার করে উঠলো কিশোর। কি যেন দেখলাম মনে হলো!
কিশোরের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো সাগরের হাসি। বললো, আমি দেখে আসি। বলেই খুব সামান্য একটা ঢেউয়ের আঙটি তৈরি করে ডুবে গেল গানিতে।
অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে কিশোর। কয়েক মুহূর্ত একই জায়গায় থেকে মুখ নিচু করে নিচের দৃশ্য দেখলো সাগরের হাসি। তারপর ডুবতে শুরু করলো। মাছ যেভাবে আস্তে আস্তে পাখনা দোলায় অনেকটা তেমনি করে পা দোলাচ্ছে মেয়েটা। পানি এতো পরিষ্কার, স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ওকে। এক ঝাঁক মাছ চলে গেল ওর শরীরের ওপর দিয়ে। অদৃশ্য হয়ে গেল সাগরের হাসি। আর ওঠে না। ভয়ই পেয়ে গেল কিশোর। সাগরের এই মাঝখানে কিছু হলো না তো তার!
সাগরের হাসিকে আবার ভেসে উঠতে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো কিশোর। মাথা তুললো মেয়েটা। হাতটা তুলে দেখালো। মস্ত একটা ঝিনুক নিয়ে এসেছে। নাক উঁচু করে দম নিতে লাগলো। শিসের মতো শব্দ বেরোতে লাগলো নাক দিয়ে। এই শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়ে গেছে কিশোর, অনেকক্ষণ পানির নিচে ডুব দিয়ে এসে এভাবেই দম নেয় দক্ষিণ সাগরের উভচর মানুষগুলো।
