এতো ঝিনুক পচে নিশ্চয়ই খুব গন্ধ বেরোয়? ওমর জানতে চাইলো।
খুব মানে? ভয়াবহ! এতো দুর্গন্ধ পৃথিবীতে আর কিছুর আছে কি না জানি। তবে ভয় নেই। আমরা ওগুলোকে ফেলবো দ্বীপের একধারে, বাতাস যেদিকে বইবে তার উল্টো দিকে। তাহলেই আর গন্ধ লাগবে না।
আলোচনা আর খাবার তৈরি একসাথে চললো। তারপর খেতে বসলো ওরা। তখুনি একবার মুক্তো খেত দেখতে যেতে চাইলো কিশোর। ওমর রাজি হলো না। বললো, প্লেনটা একবার পরীক্ষা করে দেখবে। যাতে পরে কোনো বিপদ না ঘটায়। আর ক্যাম্পেও সব কিছু গোছগাছ করা দরকার। ডজ বললো, সে ডুবুরির পোশাক আর সরঞ্জামগুলো পরখ করবে। তাকে সাহায্য করতে চাইলো মুসা।
আপাতত কিশোরের কিছু করার নেই। সে সাগরের হাসি আর ঝিনুককে নিয়ে চললো লেগুন দেখতে। ওটা কেমন, ভাবতে একটা শব্দই শুধু মাথায় এলো তার পরীর রাজ্য। রঙের বাহার অভিভূত করে ফেললো তাকে। স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ পানিতে গাঢ় নীল আকাশের ছায়া পড়ে পানিকেও নীল করে তুলেছে। এর পটভূমিতে নারকেলের ঘন সবুজ পাতাকে লাগছে ছবির মতো। পানিতে সাঁতার কাটছে হাজার রকমের মাছ। কোনোটা ছোট, কোনোটা বড়। রামধনুর সমস্ত রঙই রয়েছে ওগুলোর শরীরে। যেমন রঙ তেমনি ছটা। রীফের গায়ের কাছে এখানে ওখানে দেখা যাচ্ছে প্রবালের ছড়াছড়ি। সূর্য রশ্মি তেরছা ভাবে এসে পড়েছে তার ওপর। কোথাও কোথাও এমন লাগছে, মনে হচ্ছে মেঘ করেছে পানির তলায়। কোথাও তুষার-শুভ্র প্রবাল পাথরের বিশাল চাইয়ের মতো মাথা তুলেছে পানির ওপরে, ভাসমান বরফখন্ড ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না ওগুলোকে। লেগুনের নিচেটা যেন রূপকথার এক রহস্যময় জগৎ। প্রবালের বিচিত্র আকার, আজব চেহারা। রঙও তেমনি। লালই আছে কয়েক রকম। ঘন লাল, রক্ত লাল, টুকটুকে লাল, ফ্যাকাসে লাল, গোলাপী। আছে নীল, সবুজ, হলুদ। মোট কথা একজন শিল্পীর তুলি দিয়ে যতগুলো রঙ তৈরি করা সম্ভব, সবই আছে এখানে। অসাধারণ সুন্দর। জ্যান্ত উদ্ভিদের মতো লাগছে গোলাপী আর আশমানি রঙের প্রবালের ডালপালা। কোনোটা বড় পাতার মতো দেখতে, কোনোটা কৌণিক, কোনটা আবার বিশাল ব্যাঙের ছাতার মতো। সে-এক উজ্জ্বল পৃথিবী। কোথাও কোনো অসামঞ্জস্য নেই। কঠিন অথচ দেখতে লাগে কোমল। সব কিছুতেই যেন জাদুর পরশ। অবিশ্বাস্য! এই সুন্দরের মাঝে দুই ফুট লম্বা একটা শুঁয়াপোকার মতো জীবকে বুকে হেঁটে এগোতে দেখে গায়ে কাঁটা দিলো কিশোরের। মনে পড়ে গেল ডজের কথা, সৌন্দর্য আর কদর্যের ঠাই এখানে পাশাপাশি।
জীবটাকে দেখে কিশোরের মুখ বিকৃত করে ফেলা নজর এড়ালো না সাগরের হাসির। ঝাঁপ দিয়ে পড়লো সে পানিতে। স্বচ্ছন্দে ডুবে গেল পানির তলায়। তুলে নিয়ে এলো জীবটাকে। কিশোরের চেহারা দেখে খিলখিল করে হাসলো। ওটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে উঠে এলো ওপরে। কুকুরের মতো গা ঝাড়া দিয়ে শরীর থেকে পানি ফেলছে।
কিশোর অনুমান করলো দ্বীপটা তিন কি চার মাইল লম্বা। পাশে একেবারেই কম, মাত্র কয়েকশো গজ। তা-ও সব চেয়ে চওড়া অংশটায়। লেনের দিকটায় হ্রদের পানির মতোই শান্ত পানি, কিন্তু সাগরের দিকটায় ঢেউ আছড়ে ভাঙছে ভীমবেগে। হাজারো বজ্রের আওয়াজ তুলে ফাটছে পানির পর্বত, অনবরত পানি ছিটাচ্ছে বৃষ্টির মতো। প্রবালের ওপর এসে জমা হয়েছে হাজারে হাজারে ঝিনুকের খোসা, সাগরে যতো রকম আর আকারের থাকতে পারে সব রকম-কিশোরের অন্তত তা-ই মনে হলো। আছে মাছের কঙ্কাল। বড় বড় দাঁতও পড়ে থাকতে দেখা গেল। সেগুলো কোন জীবের বুঝতে পারলো না সে। তবে যারই হোক, সে-যে দৈত্যাকার প্রাণী, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ঢেউ আসছে, আর সঙ্গে করে বয়ে আনছে ওসব।
দ্বীপে উদ্ভিদের প্রজাতি তেমন বেশি নেই। এসব অঞ্চলের প্রধান যে গাছ, নারকেল, তা আছে প্রচুর পরিমাণে। পানির ধার ঘেঁষেও জন্মেছে অনেক। ওপরের উঁচু দিকটায় জন্মেছে ঘন সবুজ ঘাস। কিছু অচেনা ঝোঁপ হয়ে আছে, তাতে উজ্জ্বল রঙের ফুল ফুটেছে। সব চেয়ে উঁচু জায়গাটাও পানির সমতল থেকে পঁচিশ ফুটের বেশি উচু হবে না। হারিকেনের সময় নিশ্চয় ওখানেও পানি উঠে যায়। নোনা পানির এই অত্যাচারের কারণেই এসব অঞ্চলে উদ্ভিদ তেমন জন্মাতে পারে না।
ডাঙায় জীবনও অনেক কম, পানির তুলনায় প্রায় শূন্য বললেই চলে। যারা আছে তারাও বেশির ভাগই পানির জীব। বালিতে ঋষি কাঁকড়ার ছড়াছড়ি, হাজারে হাজারে, অদ্ভুত খোলাওলো বিচিত্র শব্দ করে বন্ধ করছে, আবার খুলছে। পাথরের ওপর নুড়ি পড়লে যেরকম আওয়াজ হয়, বন্ধ করার শব্দটা অনেকটা তেমন। এছাড়া আছে কিছু সামুদ্রিক পাখি।
বিকেলের দিকে ভাটায় যখন টান পড়লো, আশ্চর্য রকম নীরব হয়ে গেল তখন পরিবেশ। কেমন যেন গায়ে লাগে সেই নীরবতা। অসহ্য মনে হয়। বিষন্ন করে দেয় মন। সাংঘাতিক নিঃসঙ্গ মনে হলো নিজেকে কিশোরের। এখানে তিনটে মাস একা একা থাকলে কি করে ডজ! পাগল যে হয়নি এটাই যথেষ্ট। অস্বাভাবিক মনের জোর আর সহ্য ক্ষমতা তার। কিশোর হলে পারতো না। অনেকে তো সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যাই করে বসে। তাড়াতাড়ি ফিরে এলো সে অন্যদের কাছে। সবাই কেমন যেন চুপচাপ হয়ে আছে। পরিবেশের চাপ ওদের ওপরও পড়েছে, বোঝা যায়। এমনকি সাগরের হাসি আর ঝিনুকও অগ্নিকুন্ডের দিকে তাকিয়ে ঝিম মেরে রয়েছে।
