দীর্ঘ কয়েকটা সেকেন্ড একভাবে ভেসে থেকে বাতাস টানলো সে। শক্তি ফিরে এলো খানিকটা। মুখ ঘুরিয়ে তাকালো বিমানটার কি হয়েছে দেখার জন্যে। স্পষ্ট হয়নি এখনও দৃষ্টি। আবছা ভাবে দেখলো, তার দিকে সাঁতরে আসছে সাগরের হাসি। তীরের দিকে বিমানটাকে টেনে নিয়ে চলেছে মুসা। মুসার মুখটা দেখা যাচ্ছে ককপিটের জানালায়। স্টার্ট নিয়েছে ইঞ্জিন। তীরে দাঁড়িয়ে আছে ওমর আর ডজ। দুজনের হাতেই পিস্তল।
চলতে শুরু করলো বিমান।
ওটাকে ধরতে পারবে না বুঝেই যেন সমস্ত আক্রোশ কিশোর আর সাগরের হাসির ওপর এসে পড়লো কারনেসের। জাহাজের নাক ঘোরালো ওদের দিকে। মেরেই ফেলবে। গুলি আরম্ভ করলো ওমর আর ডজ। কিন্তু হুইল হাউসে কারনেসের গায়ে লাগাতে পারলো না একটা গুলিও।
বিমানটাও ছুটে আসছে।
কিশোরের হাত ধরে টান মারলো সাগরের হাসি। ডুব দাও! বলেই ডুব মারলো সে।
কিশোরও ডুব দিলো। সাঁতরে চললো তীরের দিকে। কোনোমতে অল্প পানিতে চলে যেতে পারলেই হয়, যেখানে পৌঁছতে পারবে না জাহাজ। আবার যখন বাতাসের জন্যে তাগাদা দিতে লাগলো ফুসফুস, তখন ভাসলো। দেখলো, অনেকটা সরে এসেছে জাহাজের কাছ থেকে। আবার দিলো ডুব। আবার ভাসলো। আর ডুবলো না। নিরাপদ জায়গায় চলে এসেছে। এখানে আর পৌঁছতে পারবে না স্কুনার। আর পারলেও ধরতে পারবে না ওকে।
তীরের অনেক কাছাকাছি চলে গেছে সাগরের হাসি। দৌড়ে আসছে ঝিনুক। পানির কিনারে এসে একটা মুহূর্ত থমকালো। দেখলো পুরো অবস্থাটা। তারপর নেমে পড়লো পানিতে কিশোরকে সাহায্য করতে এগোলো।
ফ্লাইং বোট নিয়ে উড়াল দিলো মুসা।
তীরে উঠে ধপাস করে বালিতেই বসে পড়লো কিশোর। থু থু করে মুখ থেকে ছিটিয়ে ফেললো নোনা পানি আর বালি।
নাক ঘুরিয়ে ফেলেছে স্কুনাটা। আর কিছু করার নেই, বুঝে গেছে কারনেস। ফিরে যাচ্ছে খোলা সাগরে।
জাহাজটা বেরিয়ে যাওয়ার পর লেগুনে নামলো আবার মুসা।
জিরিয়ে নিয়ে কাপড় পরে ডজ আর ওমরের সঙ্গে নাস্তা সেরে নিলো কিশোর ও মুসা। তারপর বিমানে করে রওনা হলো ডজ আইল্যান্ডের উদ্দেশে। ঝিনুক আর সাগরের হাসিকেও নেয়া হয়েছে সঙ্গে। এতোগুলো মানুষ নিয়ে আকাশে উড়তে বেশ কষ্টই হলো ফ্লাইং বোটের। তবে যেটুকু অসুবিধে হয়েছে, তা ওঠার সময়। ওপরে উঠে আর কিছু হলো না। উড়ে চললো নিরাপদেই।
দশ মিনিটের মধ্যেই নজরে এলো ডজ অ্যাইল্যান্ড।
দ্বীপের লেগুনে বিমান নামালো ওমর। দক্ষিণ সাগরের অনেক দ্বীপেরই লেগুন দেখেছে কিশোর আর মুসা। তবে এটার মতো এতো সুন্দর আর দেখেনি। ওদের দিকে তাকিয়ে হাসলো কিশোর। জীবনে এই প্রথম প্লেনে চড়েছে ওরা। দারুণ খুশি। গড়গড় করে কি যেন বললো আঞ্চলিক ভাষায়। কয়েকটা শব্দ শুধু বুঝলো কিশোর আর মুসা। ডজকে জিজ্ঞেস করলো, কি বলেছে।
ওরা বলছে, ডজ জানালো। বিদেশী মানুষের কাজকারবারই আলাদা। এমন কোনো মজার কান্ড নেই, যা তারা করতে পারে না। বাক্সের ভেতর থেকে গান বের করে দিতে পারে। ক্যানুতে ডানা লাগিয়ে আকাশে উড়তে পারে।
হাসলো দুই গোয়েন্দা। এসব কথায় কান দিচ্ছে না ওমর। সে তখন নোঙরের জায়গা খুঁজছে। বিমানের উইং ফ্লোট চিরে দিচ্ছে যেন লেগুনের শান্ত পানিকে, লাঙল দিয়ে মাটি ফাড়ার মতো করে। বিশাল ঢেউ উঠছে। এখানেই রাখলাম, কি বলো? ডজের দিকে তাকালো সে।
রাখো, যেখানে খুশি, ডজ বললো।
ক্যাম্পের কাছাকাছি রাখাই ভালো। চোখের আড়াল করা উচিত না। একবার করেই তো শিক্ষা হয়েছে।
ওই যে ওই নারকেল গাছগুলোর কাছাকাছি নিয়ে রাখো। তীরের কাছেও পানি বেশ গভীর। প্লেন থেকেই লাফ দিয়ে ডাঙায় নামতে পারবো। জুতো ভেজাতে হবে না। ওই যে, ওটাই আমার কুঁড়ে। নারকেল পাতায় তৈরি ছাউনিটা দেখলো ডজ।
তিনটে মাস থেকেছো ওর মধ্যে! বিড়বিড় করলো ওমর।
থেকেছি। বিল্ডিং আর এখানে পাবো কোথায়।
ডজ যে জায়গাটা দেখিয়েছে ধীরে ধীরে বিমানটাকে সেখানে নিয়ে এলো ওমর। ইঞ্জিন বন্ধ করলো। পানি ওখানে এতো পরিষ্কার, মনে হয় নেইই, অবিশ্বাস্য লাগে।
প্রবালের একটা চড়ায় নামলো সে। বললো, এখানেই বাঁধি। জিনিসপত্র নামিয়ে নিয়ে যাবো। যাতে সকালে উঠেই কাজে লেগে যেতে পারি।
চোখা পাথরের মতো বেরিয়ে থাকা এক টুকরো প্রবালে বিমানের দড়ি বাঁধা হলো। ভেসে যাওয়ার ভয় নেই। টান লেগে ছুটবেও না, কারণ সামান্য ঢেউও নেই পানিতে। রসদপত্র আর পেট্রোল তীরে নামানো হলো প্রথমে। তারপর বয়ে আনা হলো ডজের কুঁড়েতে। ঘরটা অতো খারাপ না। মেরামত করে নিলে সবারই জায়গা হয়ে যাবে। সাগরের হাসি আর ঝিনুকও অভিযাত্রীদের কাজে সাহায্য করলো। অনর্গল বকবক করে যাচ্ছে ওরা আঞ্চলিক ভাষায়। ভালো লাগলো অন্যদের। ছেলেমেয়ে দুটো সহজ করে রেখেছে পরিবেশ। ডাইভিঙের পোশাক আর অন্যান্য সরঞ্জাম বিমানেই রেখে দেয়া হলো। আগামী দিন সকালে কাজে লাগবে ওগুলো।
মুক্তো খেতটা কোনদিকে? ওমর জানতে চাইলো।
ওদিকে, হাত তুলে দেখালো ডজ। কাল এই সময়ে অনেক ঝিনুক তোলা হয়ে যাবে আমাদের।
আচ্ছা, একটা কথা, মুসা বললো। ঝিনুক খুলতে যাবে কে? যে রকম বড় বড় বললেন। ঝিনুক খোলা খুব কঠিন।
হাসলো ডজ। ঠিকই। একটা দুটো হলে সম্ভব। কিন্তু আমাদেরকে যতোগুলো তুলতে হবে, অতোগুলো জ্যান্ত অবস্থায় ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে খোলা.. হাত নাড়লো সে। কিছুতেই পারবো না। তুলে এনে সৈকতে ছড়িয়ে রাখতে হবে, পচানোর জন্যে। ঝিনুক মরে গেলে আপনা আপনি ডালা ফাঁক হয়ে যাবে।
