কি হয়েছে? ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করলো ওমর। উঠে পড়েছে বিছানা ছেড়ে। জ্যাকেট চড়াচ্ছে গায়ে।
কারনেস আসছে বলে!
দুই লাফে দরজার কাছে চলে এলো ওমর। কই?
দেখতে তো পাচ্ছি না।…হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই যে! পাথরের দেয়ালটার দিকে দেখালো কিশোর। লেগুনে ঢোকার মুখে খুদে একটা দ্বীপ পড়ে। ওটার পেছনে দেখা যাচ্ছে স্কুনারের পাল। সব কটা পালই ফুলে উঠেছে ভোরের বাতাসে। সাগরের পানিতে রাজহাঁসের মতো স্বচ্ছন্দে ভেসে চলেছে জাহাজ। আরেকটু এগিয়ে ঘুরে গেল ওটার নাক। ঢুকে পড়লো লেগুনে। সোজা এগিয়ে আসতে লাগলো সৈকতের দিকে।
করছে কি? পাল নামায় না কেন? কাঁধের ওপর দিয়ে বললো ডজ। সে-ও এসে দাঁড়িয়েছে পেছনে।
খাইছে! ওটা… মূসার কথা শেষ হওয়ার আগেই কিশোরও বুঝে ফেললো। চেঁচিয়ে উঠলো, প্লেনটাকে ভাঙতে যাচ্ছে! ধাক্কা মারবে!
একটা মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইলো সে। তারপরেই নড়ে উঠলো। মুসা, এসো! বলেই সৈকতের দিকে দৌড় দিলো কিশোর। যেখানে ক্যানুগুলো রয়েছে। ওদের পেছনে ছুটলো সাগরের হাসি।
ধরো, ধরো, হাত লাগাও! একটা ক্যানুকে টানতে শুরু করলো কিশোর, পানিতে নামানোর জন্যে। বেজায় ভারি। বললো, নাহ! নামানো যাবে না! বলে একটা মুহূর্তও আর দেরি না করে গিয়ে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে পড়লো। কিছুই বুঝতে না পেরে মুসাও নামলো তার সঙ্গে। সাগরের হাসিও নামলো।
বিমানটার দিকে সাঁতরাচ্ছে কিশোর। পাশে চলে এলো মুসা আর সাগরের হাসি। কিশোরের চেয়ে ভালো সাঁতরায় মুসা, তার চেয়েও অনেক ভালো সাগরের হাসি, একেবারে মাছের মতো। মুসা জিজ্ঞেস করলো, কি করবে?
নোঙরের দড়িটা কেটে দিতে হবে! হাঁপাতে শুরু করেছে কিশোর। মুসা, জলদি!
আমি যাচ্ছি, বলেই গতি বাড়িয়ে দিলো সাগরের হাসি। পানির ওপর দিয়ে পিছলে চলে যেতে লাগলো যেন। অনেক পেছনে পড়ে গেল মুসা আর কিশোর।
একশো গজ দূরে রয়েছে বিমানটা। কিশোরের মনে হলো, কয়েক মাইল। জাহাজটার আগে সে কিছুতেই পৌঁছতে পারবে না, বুঝে গেছে। মুসাও না। সাগরের হাসিই এখন একমাত্র ভরসা। ওরা অর্ধেক যাওয়ার আগেই পৌঁছে গেল মেয়েটা। নোঙরের দড়ি বেয়ে উঠে গেল ওপরে। কোমর থেকে ছুরি টেনে নিয়ে কাটতে শুরু করলো দড়ি। ভোরের রোদে ঝিক করে উঠছে ছুরির ফলা। জাহাজটাও প্রায় পৌঁছে গেছে। ভালো বাতাস পেয়েছে। ফুলে উঠছে সব কটা পাল।
সাগরের দিক থেকে বইছে বাতাস, দড়ি কাটা হয়ে গেল। বিমানটাকে ঠেলে নিয়ে আসতে লাগলো তীরের দিকে। নাক ঘোরাতে শুরু করলো হোয়াইট শার্ক। ধাক্কা মারবেই, যে করেই হোক।
তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে কিশোর। ঝড়ের গতিতে চিন্তা চলছে মগজে। কিছু একটা করা দরকার, কিছু একটা…আবার সাঁতরাতে শুরু করলো সে বিমানের দিকে। জাহাজের ধাক্কা খাওয়ার ঝুঁকিকে অগ্রাহ্য করে চলে এলো বিমানের কাছে। নোঙরের দড়িটা চেপে ধরলো। মুসাকে বললো, ধরো! দড়িটা ছেড়ে দিয়েই হাত বাড়িয়ে ধরে ফেললো একটা উইং ফ্লোট। যেগুলোর ওপর ভর করে পানিতে ভেসে থাকে ফ্লাইং বোট। একপাশে কাত হয়ে গেল বিমান। পরোয়াই করলো না সে। মুসা দড়ি ধরেছে কি না সেটাও দেখতে গেল না। ফ্লোট থেকে এক ডানার ওপরে চড়লো। নাকের ওপর বসে জাহাজটার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে সাগরের হাসি। কি করবে বুঝতে পারছে না। ডানার ওপর দিয়ে দৌড় দিলো কিশোর। মেয়েটাকে চুপ করে বসে থাকতে বললো। পিঠের ওপর দিয়ে পার হয়ে এসে নামলো আরেক ডানায়। চলে এলো ডানার একেবারে প্রান্তে। ওদিক দিয়েই এগোচ্ছে স্কুনারটা। লোহায় বাঁধানো গলুইয়ের একটা ধাক্কা লাগলেই চুরমার হয়ে যাবে ফ্লাইং বোট। ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে পারলে সরিয়ে নেয়া যেতো, কিন্তু সময় নেই। কারনেসও বুঝতে পারছে সেটা। হুইল ধরে দাঁড়িয়েছে। মুখে কুৎসিত হাসি। নিশ্চিত হয়ে গেছে, তারই জিৎ হবে।
তবে একটা ব্যাপার সে জানে না, যেটা কিশোর জানে। উইং ফ্লোটের ওপর খুব হালকা হয়ে ভাসে ফ্লাইং বোট। একটা বাচ্চা ছেলেও টেনে ওটাকে সহজেই সরিয়ে ফেলতে পারে। তবে কোনো কিছুর ওপর দাঁড়িয়ে। দাঁড়ানোর মতো সেরকম কোনো জায়গা পায়নি কিশোর। তাই বিমানের ওপরই দাঁড়িয়েছে।
নোঙরের দড়ি ধরে রেখেছে মুসা। কিশোরের উদ্দেশ্য বুঝে ফেলেছে। ধাক্কা দেয়ার আগেই দু হাত বাড়িয়ে স্কুনারের গলুইয়ের নিচেটা ধরে ফেলতে চায় কিশোর। তাহলে আর বিমানের গায়ে ধাক্কা লাগবে না। জাহাজের সঙ্গে সঙ্গে বিমানটাও সরতে থাকবে।
দুরুদুরু করছে কিশোরের বুক। আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে রয়েছে গলুইয়ের নিচের লোহাবাঁধানো জায়গাটার দিকে। ঠেকাতে পারবে তো? চট করে তাকালো একবার জাহাজের নোঙরটার দিকে। কাদা লেগে রয়েছে। পানি ঝরছে ফোটা ফোটা। বলা যায় না, রেগে গিয়ে ওটা তার মাথার ওপরে ছেড়ে দিতে পারে কারনেস।
দুই পা ফাঁক করে শক্ত হয়ে দাঁড়ালো কিশোর। এসে গেছে গলুই। ধাক্কা প্রায় লাগে লাগে এই সময় হাত বাড়িয়ে ধরে ফেললো গলুইয়ের নিচের অংশ। প্রচন্ড একটা ঝাঁকুনি লাগলো। পলকের জন্যে মনে হলো তার, পায়ের নিচ থেকে পিছলে সরে যাচ্ছে বিমানের ডানা। দুলুনিতে পড়ে যাচ্ছিলো সে আরেকটু হলেই। কোনোমতে সামলে নিয়ে জোরে এক ঠেলা মারলো জাহাজের গায়ে। জাহাজ সরলো না, সেটাকে সরানোর চেষ্টাও করেনি সে, পায়ের ধাক্কায় বিমানটাই বরং সরলো। এবার আর তাল সামলাতে পারলো না কিশোর। মাথা নিচু করে পড়ে গেল পানিতে ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো কানের ভেতর। বিশাল একটা ছায়া উঠে আসছে মাথার ওপরে। ডাইভ দিয়ে নিচে নেমে যেতে লাগলো সে। বাতাসের জন্যে আকুলি-বিকুলি করছে ফুসফুস। ফেটে যাবে যেন। কিন্তু ওঠার উপায় নেই। জাহাজের তলায় বাড়ি লেগে ছাতু হয়ে যাবে খুলি। হাত-পা ছোড়াছুঁড়ি করে ছায়াটার নিচ থেকে সরে আসার আপ্রাণ চেষ্টা চালালো সে। সে সরলো, না ছায়াটাই সরলো, বলতে পারবে না। সুযোগ পেয়েই উঠতে শুরু করলো ওপরে। যখন মনে হলো, আর টিকবে না ফুসফুসটা, ঠিক ওই মুহূর্তে ভুস করে মাথাটা ভেসে উঠলো ওপরে। হাঁ করে শ্বাস টানতে শুরু করলো সে।
