এবার ছেড়ে দিলাম, ওমর বললো। আর যদি দেখি কখনও শয়তানী করেছে, এমন শিক্ষা দেবো তোমাকে বুঝবে তখন। বরফের মতো শীতল হয়ে উঠেছে তার কণ্ঠ। ঘর থেকে বেরোবে না বলে দিলাম। তোমার মাথা দেখলেই গুলি চালাবো আমি, মনে রেখো। কিশোরকে নির্দেশ দিলো, ছেলেটাকে নৌকায় নিয়ে যাও।
ডেকের কিনারে এসে দেখলো ওরা, তীরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে ডজ। আরেকটা নৌকা নামানো হয়েছে। অনেকগুলো ছায়ামূর্তি নড়ছে তাতে। কারনেসের সাগরেদরা ফিরে আসছে, নিচু গলায় বললো সে। কি করবো? দেখলে গন্ডগোল করবেই।
না, করবে না, বলে উঠলো আরেকটা কোমল কণ্ঠ। ক্যানুর কিনার থেকে।
অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলো কিশোর, চাঁদের আলোয় সাগরের হাসির হাসি হাসি মুখটা। বললো, আরে তুমি। তুমি এখানে কি করছো?
দেখাচ্ছি, বলেই ডুব দিলো মেয়েটা। খুব হালকা একটা আলোড়ন তুলে তলিয়ে গেল মাছের মতো।
নৌকায় নামো, নির্দেশ দিলো ওমর। সৈকতে ফেরা দরকার।
ওদের ক্যানুটা এগোতে লাগলো সৈকতের দিকে, অন্য ক্যানুটা আসছে জাহাজের দিকে। দ্রুত। ডেকে বেরিয়ে এসেছে কারনেস। চেঁচিয়ে আদেশ দিলো তার সাগরেদদেরকে। আঞ্চলিক ভাষায়।
কি বললো, ব্যাটা? ডজকে জিজ্ঞেস করলো ওমর।
আমাদেরকে ডুবিয়ে দিতে বললো।
চেষ্টা করেই দেখুক।
তবে লড়াইটা আর হলো না। কারনেসের আদেশ পালন করার জন্যে ঠিকই তৈরি হয়েছিলো তার লোকেরা। নৌকার মুখও ঘুরিয়েছিলো কিশোরদের ক্যানুর কয়েক গজের মধ্যে এসে। কিন্তু হঠাৎ করেই এমন একটা কান্ড ঘটলো, যা কল্পনাও করতে পারেনি বিরোধী দল। পানিতে ঝপ করে একটা শব্দ হলো। মড়মড় করে উঠলো নৌকার পচা কাঠ। পরক্ষণেই কাত হয়ে গেল ক্যানুটা। একে অন্যের ঘাড়ের ওপর গিয়ে পড়লো লোকগুলো। পর মুহূর্তেই পানিতে। চেঁচাতে শুরু করলো ওরা। তাদের চিৎকারকে ছাপিয়ে পানির ওপরে ছড়িয়ে পড়লো যেন মেয়েলী কণ্ঠের খিলখিল হাসি।
টা-টা-টা-টা! চেঁচিয়ে উঠলো ঝিনুক। অকটোপাস মারার সময় সাগরের হাসিকেও এরকম শব্দ করতে শুনেছে কিশোর, অনুমান করলো বেশি উত্তেজিত কিংবা আনন্দিত হলেই বোধহয় ওরকম শব্দ করে এখানকার লোকে। ঝিনুক বলছে, দিয়েছে। নৌকা ডুবিয়ে দিয়েছে সাগরের হাসি! সে-ও ঝাপ দিলো পানিতে।
কিশোর আশা করলো, তার মাথাটা ভেসে উঠবে এখনই। উঠলো না। সাগরের হাসি কিংবা ঝিনুক, কারো মাথাই আর দেখতে পেলো না।
মুসাও খুঁজছে দুজনকে। না দেখে বললো, খাইছে! ডজ, ঠিকই বলেছিলেন! এগুলো মানুষ না, মাছ!
জাহাজের দিকে সাঁতরাতে শুরু করেছে কারনেসের সাগরেদরা। এছাড়া আর কিছু করারও নেই ওদের, জানে এখন ওমরদেরকে ধরতে এলে হয় বৈঠার বাড়ি খাবে, কিংবা পিস্তলের গুলি। ছুরির খোঁচা খাওয়ারও আশঙ্কা আছে। কে যায় শুধু শুধু মরতে।
নিরাপদেই তীরে পৌঁছলো অভিযাত্রীরা। ঝিনুক আর সাগরের হাসির জন্যে অপেক্ষা করবে ভেবেছিলো, কিন্তু ডাঙায় উঠে দেখলো ওরা দুজনই ওদের অপেক্ষায় রয়েছে।
যাক, জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেললো ওমর। যা করতে এসেছিলাম, করেছি। এবার বাড়ি ফেরা যাক।
গায়ের দিক থেকে এগিয়ে এলো কয়েকজন লোক। তবে খারাপ লোক মনে হলো না ওদেরকে। মারমুখো হয়ে আসেনি। ঝিনুক আর সাগরের হাসির সঙ্গে কয়েকটা কথা বলে আবার ফিরে চললো ওরা।
নিজের দলকে নিয়ে রওনা হলো ওমর, যোদ্ধারা যেখানে অপেক্ষা করছে সেখানে। ঝিনুককে দেখে খুব খুশি হলো ওরা।
অনেক পরিশ্রম করেছে। খানিকক্ষণ জিরাতে বসলো কিশোররা। সবাইকে বিস্কুট আর চকলেট ভাগ করে দিলো ডজ। খেতে খেতে ঝিনুককে জিজ্ঞেস করলো, কারনেস শয়তানটা তোমাকে অনেক প্রশ্ন করেছে, না?
করেছে। কোন দ্বীপে আপনাকে পাওয়া গেছে জানতে চেয়েছে বার বার।
বলেছো?
না। বলেছি, অনেক দূরে। বিশ্বাস করেনি। আমাকে মিথুক বলেছে। মেরেছে। ধমক দিয়েছে, না বললে একেবারে মেরে ফেলবে।
হয়েছে, আর কিছু করতে পারবে না, ছেলেটার কাঁধ চাপড়ে দিলো ডজ।
ঢাল বেয়ে যখন পাহাড়ে চড়ছে ওরা, তখনও মৃদু ভাবে কানে আসতে থাকলো কারননসের চেঁচামেচি।
আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে ভোর হয়ে গেল। বোধহয় একারণেই কুকুরগুলোর আর কোনো সাড়াশব্দ পেলো না এখানে এসে। যদিও মশাল জ্বেলে তৈরিই রয়েছ যোদ্ধারা। দিনের আলোয় পথ চলতেও সুবিধে। পাহাড়ের যেসব জায়গা ভয়াবহ মনে হয়েছিলো রাতের অন্ধকারে, এখন আর ততোটা বিপজ্জনক লাগছে না। চলার গতিও বাড়লো।
অবশেষে নারকেল কুঞ্জে ঘেরা গায়ে প্রবেশ করলো ওরা। ঝিনুককে দেখে এমন কান্ড শুরু করলো গায়ের লোকে, এমন করে স্বাগত জানাতে লাগলো, যেন কবর থেকে ফিরে এসেছে সে।
অনেক পরিশ্রম করেছে। অভিযাত্রীরা সবাই ক্লান্ত! কারনেসের স্কুনারটা ফিরে আসতে পারে, আবার কোনো শয়তানীর চেষ্টা করতে পারে সে। অশান্ত সাগরকে কড়া নজর রাখার ব্যবস্থা করতে বলে তিন সহকারীকে নিয়ে কুঁড়েতে এসে ঢুকলো ওমর। ঘুমাতে হবে। ডজ আইল্যান্ডে যাওয়াটা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিলো আগামী দিন ভোর পর্যন্ত।
৫
চমকে জেগে গেল কিশোর। কানে আসছে চিৎকার। কিছুই বুঝতে না পেরে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো। দরজার দিকে ছুটলো। মনে হচ্ছে কোনো গোলমাল হয়েছে। দরজা থেকেই সৈকত চোখে পড়ে। ভোর হয়ে গেছে। পুবের আকাশ লাল। মৃদু বাতাসে যেন অস্বস্তি বোধ করছে, এমনি ভঙ্গিতে কাঁপছে নারকেল পাতা। লেগুনের পানি শান্ত। আগের জায়গাতেই ভাসছে ফ্লাইং বোট। একটা নড়াচড়া চোখে পড়তেই ঝট করে তাকালো সেদিকে। সৈকত ধরে দৌড়ে আসছে সাগরের হাসি। আসছে! আসছে! চিৎকার করছে সে, শয়তানটা আসছে!
