আরও ঘণ্টাখানেক একনাগাড়ে হাঁটলো ওরা। শেষ দিকে নামলো হুড়মুড় করে বৃষ্টি। নারকেল গাছের এলাকা শুরু হয়েছে তখন। থেমে মশাল নিভিয়ে ফেললো যোদ্ধারা। ডজকে একজন বললো, এর বাইরে বেরোলেই সৈকত, শুনেছি।
আমি আগে যাই, ওমর বললো। দেখে আসি। বলেই হাঁটতে আরম্ভ করলো। হারিয়ে গেল নারকেল কুঞ্জের ভেতরে। ফিরে এলো একটু পরেই। ঠিকই। জাহাজটা দেখে এলাম। তীর থেকে শখানেক গজ দূরে। আলো একটা জ্বলছে বটে, তবে কোনো সাড়াশব্দ নেই। লোকগুলো জাহাজে আছে না ডাঙায় বুঝতে পারলাম না। ছোট একটা গা দেখে এলাম পানির কিনারেই। ওখানে গিয়ে থাকতে পারে।
আমার মনে হয় না কারনেস গিয়েছে, ডজ বললো। গেলে তার সাগরেদরা গিয়েছে। সে জাহাজেই রয়ে গেছে। লোকগুলো গায়ে মদ খেতে গেছে।
মদ? মুসার প্রশ্ন।
হ্যাঁ। নারকেলের ফুল থেকে তৈরি করে এখানকার লোকে।
তাই নাকি! নারকেলের ফুল থেকে মদ…
ব্রান্ডির চেয়ে কোনো অংশে খারাপ না…
আচ্ছা, মদের আলোচনা বাদ দাও এখন, হাত নেড়ে বাধা দিলো ওমর। কাজের কথা বলো। কারনেসটার একটা ব্যবস্থা হওয়া দরকার। যেমন কুকুর তেমন মুগুর পেটা করা উচিত। তবে আগেই কিছু করবো না। যদি শয়তানী করে, তাহলে। সৈকতে কিছু ক্যানু দেখে এলাম। একটায় করে জাহাজে গিয়ে তাকে সোজাসুজি বলতে হবে ঝিনুককে ফিরিয়ে দেয়ার জন্যে। এক ক্যানুতে করেই আমরা সবাই যেতে পারবো। আমি কারনেসকে সামলাবো। কিশোর, তুমি আর মুসা পাহারায় থাকবে, সাগরেদগুলো ফিরে আসে কিনা দেখবে। ডজ, তুমি থাকবে নৌকায়। যোদ্ধাদেরকে বলো, আমরা না ফেরাত যেন এখানেই থাকে।
আবার সৈকতের দিকে রওনা হলো ওমর। নারকেল কুঞ্জের ভেতর থেকে বেরোনোর আগেই চোখে পড়ে ঝলমলে সাগর। চাঁদের আলোয় মনে হচ্ছে গলিত রূপা। তার পেছনে এলো অন্য তিনজন।
নীরব নির্জন সৈকত। জীবনের চিহ্ন নেই। খোলা জায়গায় বেরোলো না ওরা, একধারে কয়েকটা রুটিফল গাছ জন্মে রয়েছে, তার নিচে এসে দাঁড়ালো। গাঁয়ের উঠনে আগুনের কুন্ড জ্বলছে। শুধু ওই আগুন আর স্কুনারটা প্রমাণ করছে যে এখানে মানুষ আছে। গাছের ছায়ায় ছায়ায় নীবে এগিয়ে চললো ওরা, ক্যানুগুলোর দিকে। বালির ওপরে কাত হয়ে পড়ে আছে ওগুলো। একটা ক্যানু টেনে নামালো চারজনে মিলে। পানিতে পড়েই টলে উঠলো ওটা। জীর্ণ দশা। মেরামত করা জরুরী হয়ে পড়েছে। সবগুলো ক্যানুর একই অবস্থা। কিশোরের ভয়ই হলো, চারজনে উঠলে না ডুবে যায়। তবে ডুবলো না নৌকাটা। সাবধানে দাঁড় বাইতে শুরু করলো ওমর আর মুসা। জাহাজের দিকে এগিয়ে চললো যতোটা সম্ভব কম শব্দ করে আর ঢেউ না তুলে। আস্তে করে এসে স্কুনারের গায়ে ভিড়লো নৌকা। মুসার তুলে রাখা দাঁড়ের পানি ফোটা ফোটা ঝরছে, তার শব্দও কানে আসছে, এতোই নীরব হয়ে আছে চারপাশ।
বেয়ে ওপরে উঠে গেল ওমর। তার পেছনে উঠলো মুসা আর কিশোর। ডজ নৌকায় বসে রইলো।
থাকো, ফিসফিস করে বললো ওমর। পিস্তল তো আছে। গুলি চালাতে দ্বিধা করবে না।
দেখেশুনে করবেন, নীরবে হাসলো মুসা। আমাদের গায়ে আবার লাগিয়ে দেবেন না।
কম্প্যানিয়ন ওয়ের দিকে চললো তিনজনে। সবে সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছেছে। ওরা, এই সময় গর্জে উঠলো একটা কণ্ঠ, কে?
যে কেবিন থেকে কথা বলেছে লোকটা, একটানে ওটার দরজা খুলে ফেললো ওমর। নাকেমুখে এসে ধাক্কা মারলো যেন তামাকের ধোঁয়া আর কড়া মদের গন্ধ। হ্যারিকেন জ্বলছে। ধোঁয়ার জন্যে ছড়াতেই পারছে না হলদেটে আলো, অন্ধকার কাটেনি। ঘরের মাঝখানে একটা টেবিল। তার ওপরে একটা চার্ট বিছিয়ে দেখছে কারনেস। আস্তে করে উঠে দাঁড়ালো সে। দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে ওমর, যেন বিশ্বাস হচ্ছে না এটা। আচমকা গাল দিয়ে উঠে এক ধাক্কায় একপাশে সরিয়ে দিলো টেবিলটা। খেঁকিয়ে উঠলো, এখানে কি?
তোমার কাছেই এসেছি, কঠিন গলায় জবাব দিলো ওমর। সেই রাটুনা ছেলেটাকে চাই।
তাই নাকি? রাগে ফুসতে শুরু করলো কারনেস।
হ্যাঁ, তাই। আসতে বলবে, নাকি আমরাই গিয়ে ডেকে আনবো?
তোমাকে তোমাকে আমি…
বুঝেছি। আমরাই ডেকে নিয়ে যাচ্ছি। এই কিশোর, ছেলেটা কোথায় দেখ তো?
ঝিনুকের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে সরু করিডর ধরে এগোলো কিশোর। কয়েকবার ডাকতেই সাড়া এলো দুর্বল কন্ঠে। একটা দরজার সামনে এসে থামলো কিশোর। ওটার ভেতর থেকেই শব্দটা এসেছে। কিন্তু দরজায় তালা দেয়া। ডেকে জিজ্ঞেস করলো, ঝিনুক, তুমি ভেতরে আছো?
আছি।
করিডরের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে জুতোসহ একটা পা পাল্লার ওপরে তুলে দিলো কিশোর। তারপর ঠেলা দিলো। হলো না কিছু। আরো জোরে ঠেলতে লাগলো। চাপ সইতে না পেরে তালা ছুটে গিয়ে ঝটকা দিয়ে খুলে গেল পাল্লা। নাকে এসে লাগলো দুর্গন্ধ। কিছু দেখতে পাচ্ছে না অন্ধকারে। পকেট থেকে টর্চ বের করে জ্বাললো। মেঝেয় বসে আছে একটা ছেলে।
তোমার নাম ঝিনুক? কিশোর জিজ্ঞেস করলো।
হ্যাঁ। আমি ঝিনুক।
গুড। তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি। এসো, ওঠো।
দুর্বল ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো ছেলেটা। ঘর থেকে বেরিয়ে কিশোরের পেছন পেছন চললো।
এই যে, নিয়ে এসেছি, ওমরকে বললো কিশোর। দরজায় আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে ওমর। হাতে পিস্তল।
খাঁচায় আটকা জানোয়ারের মতো আচরণ করছে কারনেস। মুখ খারাপ করে গালাগাল করছে। হুমকি দিচ্ছে বার বার।
