উঠেই চলেছে পথ। অনেক পাহাড়ে চড়েছে মুসা, কিন্তু এরকম পাহাড় আর দেখেনি। মনে হয় যেন পৃথিবীর বুকের বিশাল এক ফোড়া ফেটে গিয়েছিলো। পুঁজের বদলে বেরিয়ে এসেছিলো পাথর। সেসব ছড়িয়ে রয়েছে। আর ফোঁড়ার মুখের কাছটা বিকৃত হয়ে গেছে।
পথ এখানে সরু। একপাশে গভীর খাদ। পাশাপাশি চলার আর উপায় নেই। একসারিতে এগিয়ে চলেছে মশালধারীরা। শুধু তাদের দিকে চোখ রেখে এগিয়ে চলেছে কিশোর। পাশে খাদের দিকে তাকাতে সাহস করছে না। যদি মাথা ঘুরে পড়ে যায়?
কিশোরের মনের অবস্থা কি করে জানি টের পেয়ে গেছে সাগরের হাসি। হাসতে লাগলো সে। পাহাড়ী ছাগলের মতো আশ্চর্য ক্ষিপ্রতায় হালকা পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে। পড়ে যাওয়ার ভয় নেই। কোনো কিছুরই পরোয়া করছে না।
একটা জায়গায় এসে সমতল হয়ে গেছে খানিকটা জায়গা। তার ওপাশ থেকে নামতে আরম্ভ করেছে পথ। দ্রুত নেমে গেছে পেয়ালা আকৃতির একটা খাদের মধ্যে। কোনো গাছপালা নেই তাতে। ওটাই মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের নিচের গহ্বর, অনুমান করতে পারলো কিশোর। ওখানে নেমে থামলো যোদ্ধারা। বিশ্রাম নিতে। মশালের আলোও নিভু নিভু হয়ে এসেছে। থামতে পেরে খুব খুশি হলো কিশোর।. গড়িয়ে পড়লো মাটিতে। দরদর করে ঘামছে।
কিন্তু শুয়েও সারতে পারলো না, লাফিয়ে উঠে দাঁড়াতে হলো আবার। রক্ত জমাট করা একটা চিৎকার শুনতে পেয়েছে। নেকড়ের ডাকের সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে। যোদ্ধারাও উঠে পড়েছে। চেঁচিয়ে বলতে লাগলো, কুকুর! কুকুর! ভয় পেয়েছে ওরা।
খাইছে! বলে সাগরের হাসির হাত ধরে একটানে তাকে পেছনে সরিয়ে দিলো মুসা। পিস্তল বের করলো।
ওমরও পিস্তল বের করে ফেলেছে। ওই যে! এসে গেছে! তাকিয়ে রয়েছে কুকুরগুলোর দিকে। চাঁদের আলোয় ভূতুড়ে লাগছে শাদা জানোয়ারগুলোকে। সোজা ছুটে আসছে এদিকেই।
গুলি করলো সে। প্রায় তার গায়ের ওপর এসে পড়লো একটা মৃত জানোয়ার।
গুলি করেই সাগরের হাসিকে টেনে নিয়ে একপাশে সরে গেল মুসা। গর্জন করতে করতে ছুটে আসছে কুকুরগুলো। মানুষকে ধরতে পারলে ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে।
কিশোর আর ডজও গুলি চালাতে লাগলো।
রুদ্ধ জায়গায় প্রচন্ড শব্দ হতে লাগলো গুলির। প্রতিধ্বনি উঠতে লাগলো। সেই সঙ্গে কুকুরের আর্তনাদ আর গর্জন। নরক গুলজার শুরু হয়ে গেল যেন।
মশালগুলো জ্বালিয়ে ফেলেছে আবার যোদ্ধারা। শুকনো ঘাস জড়ো করে তাতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। দেখতে দেখতে ঘাসের একটা চক্র তৈরি করে ফেললো ওরা। আগুন লাগালো। তার মধ্যে ঢুকে পড়তে অনুরোধ করলো অভিযাত্রীদেরকে।
ঢুকে পড়লো সবাই। আগুনের বৃত্তের বাইরে এসে থেমে গেল কুকুরগুলো। চারপাশ ঘিরে গোল হয়ে বসে পড়লো। লম্বা টকটকে লাল জিভ বের করে দিয়েছে। ঝুলছে ওগুলো, লালা গড়াচ্ছে। কয়েক মিনিট মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকলো ওগুলো। আগুন পেরিয়ে এসে ধরতে পারবে না বুঝে অন্য কাজে মন দিলো। মরা আর আহত সঙ্গীদেরকে ছিড়ে ছিড়ে খেতে শুরু করে দিলো। মাঝে মাঝে মুখ ফিরিয়ে মানুষদের দিকে তাকিয়ে দাঁত খিচাচ্ছে। জানোয়ারগুলোর হিংস্রতা দেখে গায়ে কাঁটা দিলো কিশোরের।
এখন কি করবো? জিজ্ঞেস করলো ওমর।
যোদ্ধাদের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত ডজ। ফিরে তাকিয়ে বললো, ওরা বলছে, নতুন করে মশাল বানিয়ে নেবে। আগুনকে ভয় পায় কুকুরগুলো। এগোতে সাহস করবে না।
কিছু একটা করা দরকার, গম্ভীর হয়ে বললো ওমর। এভাবে আটকে থাকলে কারনেস ওদিকে চলে যাবে।
আরেক ধরনের মশাল বানাতে শুরু করলো যোদ্ধারা। শুকনো ঘাসকে শক্ত করে পাকিয়ে নিয়ে লাঠির মাথায় বাঁধলো। যে ঘাস তুলছে, তাকে আগের মশাল নিয়ে পাহারা দিলো অন্যেরা। তবে ওদের দিকে এখন আর তেমন খেয়াল নেই কুকুরগুলোর। ভোজে ব্যস্ত। মশাল বানানো শেষ করার পর এলো কুকুর তাাড়নোর পালা। যোদ্ধারা শুকনো ডালের মাথায় আগুন ধরিয়ে ছুঁড়ে মারতে শুরু করলো ওগুলোর দিকে। সেই সঙ্গে পাথর। কয়েক রাউন্ড গুলিও চালানো হলো, মেরে ফেলা হলো আরও কয়েকটাকে।।
এই বার ঘাবড়ালো কুকুরের পাল। পালালো। পেছনে মশাল হাতে তেড়ে গেল যোদ্ধারা। তবে বেশি দূর গেল না। কুকুরগুলো আবার সাহসী হয়ে উঠলে মুশকিল।
রওনা হলো আবার ওরা। জ্বালামুখটা পেরিয়ে এলো দ্রুত। ঝপ করে যেন হঠাৎ নিচে নেমে গেছে পথটা। সামনে আবার আরম্ভ হয়েছে জঙ্গল। পায়ের নিচে এখন নরম শ্যাওলা। হাঁটছে ওরা আর বার বার পেছনে ফিরে তাকাচ্ছে। আর কোনো সাড়া নেই কুকুরগুলোর।
বেশ সুন্দর একটা ফুল দেখতে পেলো মুসা। পাপড়িগুলো কেমন পালকের মতো ছড়িয়ে গেছে, কোমল মনে হচ্ছে দেখে। হাত বাড়িয়ে সেটা ছিড়তে গেল, সাগরের হাসিকে উপহার দেয়ার জন্যে। খপ করে তার হাত চেপে ধরলো মেয়েটা সরিয়ে আনতে আনতে বললো, পাকে!
ডজও দেখলো ফুলটা। ছুঁয়ো না। ওটা পাকে!
পাকেটা কি জিনিস? জানতে চাইলো কিশোর।
ছুঁয়ে দেখ, তাহলেই বুঝবে। জীবনে ভুলবে না আর। আগুনের পোড়ার মতো জ্বলতে শুরু করবে। বিছুটি এর কাছে কিছু না।
ঠিকই বলেছিলো ডজ, স্বর্গেও সাপ থাকে-ভাবলো কিশোর। দক্ষিণ সাগরের দ্বীপগুলো খুব সুন্দর, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই সৌন্দর্যের মাঝেও এমন সব ব্যাপার রয়েছে, যা অনেক ভালো লাগাকেই ম্লান করে দেয়।
