জাহাজটাকে দেখতে পেয়েছে, ডজ বললো। চলো, দেখি, কতোটা এগোলো।
৪
বেশি দূরে যেতে হলো না। সৈকতেই এসে জড়ো হয়েছে গাঁয়ের লোক। উত্তেজিত হয়ে কলরব করছে। কয়েকজনের কথা শুনলো ডজ। ফিরে সঙ্গীদেরকে জানালো, অবাক কান্ড! কারনেই এসেছে। তবে এদিকে না এসে চলে গেছে কার আরেক ধারে। ওখানে নোঙর ফেলেছে। এটা ভাবা উচিত ছিলো আমাদের। এখানে জাহাজ ভেড়াতে সাহস করবে না, এ-তো জানা কথা। গায়ের লোকে ধরে খুন করে ফেলবে। এখুনি কয়েকজনে গিয়ে কাজটা সেরে আসতে চাইছে। আমি ওদের মানা করেছি। অন্তত আমরা যতোক্ষণ এখানে রয়েছি কোনো খুনখারাপি চলবে না।
তাহলে কি করা যায়? পরামর্শ চাইলো ওমর। ঘুরে যেতে হলে কতদূর?
হেঁটে যাওয়ার উপায় নেই। ঘুরে যেতে হলে ক্যানুতে চড়ে। তাতে পনেরোবিশ মাইলের কম হবে না।
শিস দিয়ে উঠলো ওমর। এতো? দ্বীপের মাঝখান দিয়ে সরাসরি গেলে?
সাত-আট মাইল। তবে যাওয়াটা অতো সোজা না। খানিক দূর গিয়েছিলাম একবার, পুরোটা যেতে পারিনি। যাওয়া যায় না তা নয়। তবে সাংঘাতিক কঠিন। যেতে হয় পাহাড় ডিঙিয়ে, তিন হাজার ফুট উঁচু। ভয়ানক বিপজ্জনক। শুধু যে পড়ে মরার ভয় আছে তা নয়, বুনো জানোয়ারও আছে।
এখানে বুনো জানোয়ার? মুসা অবাক।
মহাসাগর পেরিয়ে এই দ্বীপে জানোয়ার এলো কোত্থেকে? কিশোরও বুঝতে পারছে না।
এসেছে। ষাঁড় আর কুকুর। কুত্তাগুলো হলো সব চেয়ে খারাপ। আমি অবশ্য দেখিনি, শোনা কথা বলছি। একপাল শাদা কুত্তা নাকি বাস করে পাহাড়ে। হিংস্র। আগে পোষা ছিলো, ছাড়া থাকতে থাকতে বুনো হয়ে গেছে। কয়েক বছর আগে তিমি-শিকারীদের এক জাহাজে করে নিয়ে আসা হয়েছিলো ওগুলোকে, ফেরার সময় ফেলে চলে গেছে জাহাজের মালিক। গরুও বোধহয় অনেক আগে ওভাবেই ফেলে যাওয়া হয়েছে। আশপাশের অনেক দ্বীপে বনবেড়াল আছে, আগে পোষা ছিলো। ফেলে যাওয়ার পর বনে থাকতে থাকতে বন্য হয়ে গেছে।
হুঁ, ওমর বললো। ওসব জানোয়ারকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যাওয়া যাবে কিনা তাই বলো। কারনেসকে ঠেকাতেই হবে। ছেলেটাকে অন্তত কেড়ে রেখে দেয়া উচিত।
দেখি, অশান্ত সাগরকে জিজ্ঞেস করে। মোড়লের কাছে এগিয়ে গেল ডজ। কথা বলে ফিরে এলো। বললো, হ্যাঁ, যাওয়া যাবে বলছে। তবে পথ খুব খারাপ। গাইড হিসেবে তার কয়েকজন লোক দিতেও রাজি হয়েছে।
তাহলে তাড়াতাড়ি রওনা হওয়া দরকার। অস্ত্র-টস্ত্র নেবো নাকি? রাইফেল?
বেশি বোঝা নিলে অসুবিধে হতে পারে। যা দরকার শুধু তা-ই। আমরা তো আর যুদ্ধ করতে যাচ্ছি না। পিস্তল নিলেই যথেষ্ট।
বেশ। মোড়লকে বলো এখুনি রওনা হতে চাই আমরা।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই রওনা হলো ওরা। সঙ্গে চললো ছয়জন যোদ্ধা। মশাল জ্বেলে নিয়েছে। দেখতে দেখতে চলে এলো পাহাড়ের গোড়ায়। আঁকাবাকা পাহাড়ী পথ ধরে ঢাল বেয়ে উঠতে শুরু করলো। দুপাশে ঘন জঙ্গল। মশালের আলোয় আরো বেশি ঘন লাগছে, মনে হচ্ছে লতাপাতার দুর্ভেদ্য দেয়াল। এর মধ্যে প্রবেশ করা যাবে না।
কিছুদূর এগোনোর পর হাতে একটা আলতো ছোঁয়া পেলো মুসা। তার বাহু খামচে ধরলো নরম একটা হাত। অবাক হয়ে ফিরে তাকিয়ে দেখলো, সাগরের হাসি। হাসলো। মশালের আলোয় ঝিক করে উঠলো শাদা দাঁত। এলাম।
মেয়েটার খালি পায়ের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠলো মুসা। যে হারে ধারালো পাথর খোঁচা খোঁচা বেরিয়ে রয়েছে, তাতে জুতো না থাকলে কেটে পা ফালাফালা হয়ে যাওয়ার কথা। বললো, কেটে যাবে তো!
কাটবে না, হেসে বললো সাগরের হাসি। কতো উঠলাম। প্রবালের ওপর দিয়েও হাঁটতে পারি খালি পায়ে।
পাশাপাশি চলছে কিশোর। বিশ্বাস করলো কথাটা। কথা শুনে ফিরে তাকিয়ে ওমর বললো, এই, তুমি এসেছো কেন?
আসুক, ডজ বললো। ওকে নিয়ে ভাবতে হবে না তোমাকে। বিপদে ফেলবে ভাবছো তো? ফেলবে না। বরং সাহায্য করবে। ঝিনুক ওর বন্ধু। ও যাবেই। বলেও ফেরাতে পারবে না।
আর কিছু বললো না ওমর। মশালের আলোয় জঙ্গল দেখতে দেখতে চললো। বুনো ফুল ফুটে আছে। অর্কিডের অভাব নেই, অনেক জাতের, অনেক ধরনের। একধরনের দানবীয় পাতাসর্বস্ব গাছ জন্যে রয়েছে, এর নাম কুমারীর চুল। ওই চুলের মাঝে বিচিত্র অলংকরণ সৃষ্টি করেছে অর্কিডগুলো। কিছু লতানো অর্কিড ঝুলে রয়েছে বড় গাছের ডাল থেকে। হাজারে হাজারে গিনিপিগ রয়েছে। হুটোপুটি করছে, ছুটে যাচ্ছে সামনে দিয়ে।
যতোই উঠছে খাড়া হচ্ছে আরও পথ। দুপাশে খাড়া হয়ে আছে পাহাড়ের দেয়াল, গিরিপথের মতো লাগে। কখনও হঠাৎ করে শেষ হয়ে যাচ্ছে দেয়াল, তার পরে রয়েছে গভীর গিরিখাত। পড়লে ছাতু হয়ে যেতে হবে। কখনও পথ মোড় নিচ্ছে বিপজ্জনক ভঙ্গিতে। নারকেল আর রুটিফল গাছ পড়ে আছে অনেক নিচে, এখানে উঠতে পারেনি। আরেকটু এগিয়ে বড় বড় পাথরের চাঙরের ভেতরে হারিয়ে গেছে পথ। কখনো তার ভেতরে ঢোকা যায়; কখনো যায় না। তখন এক পাথর থেকে আরেক পাথরে লাফিয়ে লাফিয়ে এগোতে হয়।
একটা খোলা জায়গা পেরোনোর সময় নিচে তাকালো কিশোর। অদ্ভুত একটা শৈলশিরা চোখে পড়লো। ধারের ওপরটা করাতের দাঁতের মতো হয়ে আছে। আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ ছিলো ওটা একসময়, বুঝতে পারলো। আরো অনেক নিচে পানিতে ভাসতে দেখা যাচ্ছে বিমানটাকে, ওটার রূপালি ডানায় চাঁদের আলো পড়ে চিকচিক করছে। বিমান আর মনে হচ্ছে না এখান থেকে, এতোই ছোট দেখাচ্ছে। বরং মনে হয় পানিতে ভেসে আছে ডানা মেলে দেয়া কোনো নিশাচর পতঙ্গ। লেগুনের বাইরে সাগরকে লাগছে রূপালি চাদরের মতো। পানি বলে মনে হয় না। যেন এই পৃথিবীর কোনো কিছু নয় ওসর, অপার্থিব।
