পানির আরও কিনারে গিয়ে দাঁড়ালো লোকগুলো, দ্বিতীয়ার বাঁকা চাঁদের মতো গোল হয়ে। ওদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে নিচে উঁকি দিলো কিশোর আর মুসা। কিন্তু ঠেলে সরিয়ে দেয়া হলো ওদেরকে। মনে হলো বিপজ্জনক কোনো ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। বেশি দূরে সরলো না গোয়েন্দারা। গলা বাড়িয়ে তাকিয়ে রইলো কালো গুহাঁটার দিকে।
ঝট করে বেরিয়ে এলো একটা লম্বা লিকলিকে বাহু। আরেকটা। তারপর আরেকটা।
মোচড় দিয়ে উঠলো কিশোরের পেট। এই জীব আগেও দেখেছে সে, তবু চমকে গেল। কিলবিলে ওই কুৎসিত গুড়গুলো দেখলে অনেকেরই হয়, এরকম, জানা আছে তার, ওয়াপোকা দেখলে যেমন হয়। ঘেন্না লাগে, শিউরে ওঠে শরীর।
কাঁপতে কাঁপতে একটা শুঁড় উঠে এলো লোকগুলোর দিকে। লাফিয়ে কিশোরদের কাছে সরে এলো সাগরের হাসি। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে, টাটা-টা-টা! ছেলেদের দিকে চেয়ে হেসে বললো, ভয় লাগছে? আমরা ভয় পাই না। ও আমার ভাই। লম্বা, জোয়ান একটা লোককে দেখালো সে। দুর্দান্ত সাহসী। ঠিক মেরে ফেলবে। অনেক ফেকি মেরেছে। এটাকেও মারবে।
জীবটা কি? শরীরটা এখনও বেরোয়নি, আন্দাজ করতে পারছে কী, তবু জিজ্ঞেস করলো।
ফেকি! কিশোরের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাঙা ইংরেজিতে অশুদ্ধ উচ্চারণে অনুবাদ করে দিলো সাগরের হাসি, ডেবিল ফিশ! ডেবিল ফিশ! ডেভিল ফিশ, অর্থাৎ শয়তান মাছ।
এই জীবের সঙ্গে লড়াইয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে মুসার, অথৈ সাগর অভিযানে যখন এসেছিলো। মরতে মরতে বেঁচেছিলো সেবার। দ্বিতীয়বার আর এর কবলে পড়তে চায় না। ওই শুঁড়ের ভয়ংকর ক্ষমতা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলো সেবার। ভয়ে ভয়ে দেয়ালের দিকে পিছিয়ে গেল সে।
কিশোর নড়লো না। বেরিয়ে এলো শুঁড়ের চেয়ে কুৎসিত শরীরটা। জীবটাকে কেউ দেখে না থাকলে তার কাছে হরর ছবির ভয়াবহ দানব বলে সহজেই চালিয়ে দেয়া যাবে। মস্ত, কালচে-লাল একটা মাংসের দলা যেন। সেটা থেকে বেরিয়ে রয়েছে অসংখ্য আঁচিল, দেখলেই গা গুলিয়ে ওঠে। মুখটা হাতির মুখের মতো, শুঁড় বাদ দিয়ে। গোল গোল বিশাল দুটো চোখ, শরীরের তুলনায় অনেক বড়, তাতে একধরনের শয়তানী উজ্জ্বলতা, এতোই কুৎসিত, না দেখলে বলে বোঝানো যাবে না। মোট আটটা বাহুঁ, হাতির শুঁড়ের মতো গুটিয়ে নিয়ে আবার লম্বা করে দিচ্ছে, একেকটা চোদ্দ-পনেরো ফুটের কম হবে না। লাফ দিয়ে এসে পড়লো একটা শুঁড়ের মাথা, কিশোরের কয়েক ফুটের মধ্যে। ভয় পেয়ে লাফিয়ে সরে গেল সে কয়েক পা। লোকগুলো সরছে না। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে একনাগাড়ে খুঁচিয়ে চলেছে ওদের পায়ের কাছে এসে পড়া শুঁড়গুলোকে।
পরোয়াই করছে না যেন বিশাল অকটোপাস। গর্ত থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে পড়েছে, এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। একটা মানুষকে ধরতে পারলেই রাতের খাবার হয়ে যাবে তার। শিকার ধরতে গেলে কিছুটা আঘাত সইতেই হয়, কাজেই বর্শার খোঁচাগুলো হজম করে যাচ্ছে সে।
পানি থেকে ছিটকে বেরিয়ে যেন উড়ে এসে কিশোরের পায়ের কাছে পড়লো একটা শুঁড়ের মাথা। ছুঁয়ে ফেললো পা। লাফ দিয়ে পিছিয়ে গেল কিশোর। জড়িয়ে ধরতে পারলে আর মুক্তি ছিলো না ওই গুঁড়ের কবল থেকে। ঠান্ডা ভেজা স্পর্শ। নিজের অজান্তেই গলা চিরে বেরিয়ে এলো চিৎকার। তার হাত ধরে একটানে সরিয়ে নিলো মুসা, দেয়ালের কাছে, শুঁড়ের নাগালের বাইরে।
ভোজালি দিয়ে এক কোপে শুঁড়ের মাথাটা কেটে আলাদা করে ফেললো একজন যোদ্ধা। টিকটিকির লেজের মতো কুৎসিত নাচ শুরু করলো কাটা অংশটা।
রাগে ব্যথায় ভীষণ খেপে গেল অকটোপাস। যে করেই হোক মানুষ শিকার করবেই, পণ করে ফেললো যেন সে। একসঙ্গে পানি ওপরে তুলে দিলো আটটা শুঁড়। এরই জন্যে অপেক্ষা করছিলো যোদ্ধারা। প্রচন্ড আক্রমণ চালালো। কুপিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলতে লাগলো শুঁড়গুলো।
পানিতে মাথা তুলেছে অকটোপাস। যন্ত্রণায় শরীর মোচড়াচ্ছে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে কাটা শুঁড়ের মাথা থেকে। রীতিমতো হরর ছবি। অনেকটা মানুষের মতো করেই গোঙাতে আরম্ভ করেছে মৃত্যু যন্ত্রণায়। শরীরের যেখানে সেখানে বর্শা বিদ্ধ হচ্ছে। আক্রমণ করছে না আর, অস্ত্রই নেই, করবে কি দিয়ে? অদ্ভুত আচরণ করছে। মুসার মনে হলো, অন্তিম মুহূর্ত উপস্থিত, বুঝে গেছে জীবটা। গর্তের ভেতরে থেকে লড়াইয়ের সময় অকটোপাসের বুদ্ধির যে পরিচয় পেয়েছিলো সে, তাতেই এরকমটা ভাবতে পারলো।
খোঁচানোর বিরাম নেই। যতো তাড়াতাড়ি শেষ করে দেয়া যায়, সেই চেষ্টা করছে যোদ্ধারা।
আনন্দে নাচতে শুরু করেছে সাগরের হাসি। ওকে খাবো! ওকে খাবো! মজার মাংস! মুসা আর কিশোরের দিকে তাকিয়ে বাচ্চা মেয়ের মতো হাততালি দিয়ে হাসতে লাগলো সে। তোমরাও খাবে!
তুমি খেয়ো। হাত নেড়ে বললো কিশোর, আমি এর মধ্যে নেই। বাপরে বাপ, কি বিচ্ছিরি! শুয়াপোকা এর চেয়ে অনেক সুন্দর!
মুসা কিছু বললো না। খাবারটা কেমন হয়, না দেখে আগেই মানা করে দিতে রাজি নয়।
পানি থেকে তোলা হলো মৃত অকটোপাসটাকে। ওখানেই কুপিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা হতে লাগলো। সাগরের হাসিও যোগ দিলো সেই কাটাকাটিতে।
ঘন হয়ে আসছে গোধূলী। ঘরে ফিরে চললো কিশোর আর মুসা! কুঁড়েতে ফিরে দেখলো কথা বলছে ডজ আর ওমর। অকটোপাসের সঙ্গে লড়াইয়ের কথা ওদেরকে বলতে যাবে, এই সময় পাহাড়ের দিক থেকে ভেসে এলো চিৎকার, আসছে! আসছে!
