আদর করে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিলো ডজ, মেয়েদেরকে এখানে অভ্যর্থনার জবাব দেয়ার এটাই নিয়ম। বললো, ঝিনুককে ছাড়িয়ে আনতে যাবো আমরা।
বন্ধুর নাম শুনে মেঘ জমলো যেন মেয়েটার বাদামী মুখে। ওর জন্যে আমার খুব খারাপ লাগে। কাঁদি।
ডজ, এসো, ডাকলো ওমর। প্লেন থেকে কিছু খাবার নামিয়ে নিয়ে আসি। আর মোড়লের জন্যে কিছু উপহার। তার পর কথা বলা যাবে যতো খুশি। এসো।
বিমান থেকে মাল নামানো, কোনো কাজই না, কিন্তু ইচ্ছে করেই এগিয়ে এলো অনেকে, সাহায্য করার জন্যে। মানা করলেও শোনে না। বরং মুখ বেজার করে ফেলে। আপাতত মোড়লের ঘরে ওদেরকে নিয়ে আসা হলো। পরে নতুন ঘর তৈরি হলে সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে।
তোমার দ্বীপ থেকে কত দূরে আছি? ডজকে জিজ্ঞেস করলো ওমর।
বিশ-তিরিশ মাইল। এর বেশি না।
এই দ্বীপেই আমাদের হেডকোয়ার্টার করলে কেমন হয়?
পেট্রোলের অসুবিধে হবে। বার বার যেতে আসতে অনেক তেল খরচ হবে, অতো নেই স্টকে। আবহাওয়া ভালো হলে ওড়ারও দরকার পড়বে না, পানিতে ট্যাক্সিইং করে চলে যেতে পারবো। রোজ সকালে রওনা হতে হবে তাহলে। রোজ এভাবে নিয়মিত যেতে-আসতে থাকলে সন্দেহ করে বসতে পারে এখানকার লোকে। সেটা উচিত হবে না। যতো কম লোক জানাজানি হয় ততোই ভালো। ওদের লোভ নেই, এটা ঠিক। কিন্তু বিদেশী কোনো জাহাজ চলে আসতে পারে। ফাঁস হয়ে যেতে পারে খবরটা।
মাথা ঝাঁকাল ওমর। ঠিকই বলেছো। যাকগে, সেটা নিয়ে পরে ভাবা যাবে। আগে কারনেসের ব্যাপারটার একটা মীমাংসা করে নিই।
হালকা খাবার খেয়ে নিলো ওরা। ঘুরতে বেরোলো কিশোর আর মুসা। উঁচু উঁচু অসংখ্য নারকেলের জটলার ফাঁকে ফাঁকে তৈরি হয়েছে কুঁড়েগুলো। বেরিয়ে চলে এলো ওরা সৈকতে। শান্ত নিথর হয়ে আছে সাগর। দিগন্ত সীমায় হেলে পড়ছে সূর্য! ফ্যাকাসে হয়ে গেছে আকাশের ঘন নীল, মাঝেমাঝে লালচে-হলুদ রঙের ছোপ। মৃদু বাতাস বইছে, যেন সাগরের শেষ নিঃশ্বাস, থিরথির করে কাঁপছে নারকেলের ডগা। আশ্চর্য এক নীরবতা। সামনে ছড়ানো শাদা সৈকত। জীবনের কোনো চিহ্নই নেই, কিছু ঋষি কাঁকড়া বাদে। চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকছে, যেন বোঝাতে চাইছে-না, না, আমরা জীবন্ত কিছু নই, পাথর। কিন্তু কাছে গেলেই ঝট করে বেরিয়ে আসছে দাঁড়া। বিদ্যুতের গতিতে ছুটে গিয়ে ঢুকে পড়ছে অসংখ্য গর্তের কোনো একটাতে। সৈকতের কিনার ধরে হাঁটতে হাঁটতে সামনে বাধা দেখতে পেলো ওরা। পথ রুদ্ধ করে দিয়ে যেন দাঁড়িয়ে গেছে, পাথরের দেয়াল। দেখলে মনে হবে হয় আকাশ থেকে ঝুপ করে পড়েছে হঠাৎ করে, কিংবা ধীরে ধীরে সাগরের নিচ থেকে ঠেলে মাথা তুলেছে। বেশি দূরে যেতে ওদেরকে মানা করে দিয়েছে ডজ। থামলো ওরা। এই সময় পেছনে শোনা গেল হালকা পায়ের আওয়াজ। ফিরে তাকিয়ে দেখলো হাতে একটা আদিম মাছ ধরার বড়শি নিয়ে এগিয়ে আসছে সাগরের হাসি।
অনেক টুপা, হেসে হাত তুলে কাঁকড়াগুলোকে দেখালো সে। মাছও অনেক আছে। দেখবে? এসো। দুজনের মধ্যে হাত ধরার জন্যে মুসাকেই বেছে নিলো সে টেনে নিয়ে চললো পাথরের দেয়ালের পাশের একটা বড় চাঙড়ের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে চললো কিশোর।
চাঙড়টা আসলে দেয়ালেরই অংশ। ওপরে উঠে বোঝা গেল, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে চূড়াটা কেটে চলে গেছে। জায়গা বেছে নিয়ে বসে পড়লো সাগরের হাসি। সাথে করে নিয়ে এসেছে অনেক কুঁচো চিঙড়ি। বড়শিতে সেগুলো গেঁথে পানিতে ফেলে দেখতে দেখতে অনেক মাছ ধরে ফেললো। একেকটা করে মাছ ধরে, আর সেগুলোর স্থানীয় নাম বলে, মুসাকে দিয়ে আবার উচ্চারণ করায় সেগুলোর।
শুনে কিশোরও শিখে ফেলেছে। তাকিয়ে রয়েছে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ পানির দিকে। একেবারে তল পর্যন্ত দেখা যায়। যেন ভিডিওতে নেচারাল ওয়ার্ল্ড দেখছে। আজব, সুন্দর সেই জগৎ। বিশাল এক অ্যাকুয়ারিয়াম যেন। খেলে বেড়াচ্ছে নানা রকম রঙিন মাছ। কোনোটা চুপ করে ভাসছে, কোনোটা ছোটাছুটি করছে, তাড়া করছে একে অন্যকে, পাথরের খাঁজ থেকে সুডু়ং করে বেরিয়ে আসছে কেউ, কেউ বা আবার ধীরে সুস্থে গিয়ে ঢুকে পড়ছে।
মস্ত একটা বান মাছ দেখতে পেলো। পুরো পনেরো ফুট লম্বা। কুৎসিত, ভয়ংকর মুখ। পাথরের কালো গর্ত থেকে বেরিয়ে পিছলে গিয়ে যেন ঢুকে পড়লো আরেকটা পাথরের ফাটলের ভেতরে। দেখতে দেখতে এতেই তন্ময় হয়ে গেল, অনেকক্ষণ থেকেই যে নীরব হয়ে আছে সাগরের হাসি, সেটা লক্ষ্যই করলো না। করলো অনেক পরে, যখন তার গায়ে কনুই দিয়ে গুতো দিলো মুসা।
পাথরের দেয়ালের গায়ে কালো বিষন্ন চেহারার একটা গুহামুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে মেয়েটা। নিশ্চয় কিছু দেখতে পেয়েছে। মুসাও দেখেনি, কিশোরও পাচ্ছে না। তবে পেলো খুব তাড়াতাড়িই। চামড়ায় একধরনের শিরশিরে অনুভূতি হলো কিশোরের, ভয় পেলে কিংবা বেশি অবাক হলে এরকমটা হয় মানুষের। কালো কিছু একটাকে নড়তে দেখেছে।
সাগরের হাসির তীক্ষ্ণ চিৎকার ফালা ফালা করে দিলো যেন অখন্ড নীরবতা। গাঁয়ের দিকে ফিরে মুখের ওপর দুই হাত জড়ো করে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো, ফেকি! ফেকি! ফেকি!
চিৎকার শুনেই ছুটে ঘর থেকে বেরোলো চার-পাঁচজন মানুষ। হাতে মাছ মারার বর্শা। দৌড়ে আসতে লাগলো এদিকে। কাছে এসে ওরাও চেঁচাতে শুরু করলো। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করছে সাগরের হাসিকে। হাত তুলে গুহাঁটা দেখিয়ে মেয়েটা আবার বললো, ফেকি!
