সাপটাপ নেই তো? মুসা জিজ্ঞেস করলো। অতো সুন্দর বনে সাপ থাকলে ভালো লাগবে না।
না, তা নেই। তবে বিষাক্ত পোকামাকড়ের অভাব নেই। দশ ইঞ্চি লম্বা শতপদী আছে। ওগুলো সাপের চেয়ে কম বিষাক্ত না। কামড়ে দিলে টের পাবে।
কিছুটা নিচে নামলো ওমর। ডজ তাকে দেখালো, ওই যে, গ্রাম। সৈকতের কিনারে কয়েকটা কুঁড়ে চোখে পড়ছে। নারকেল পাতার ছাউনি। দ্বীপের আরেক ধারে আরেকটা গ্রাম আছে। তবে সেটার চেয়ে এই গ্রামটা বড়। লোকজন এখানেই বেশি। সৈকতের ধারে যেখানে খুশি নামাতে পারো। টিলাটকর কিছু নেই। তবে ক্যানু থাকতে পারে।
গাঁয়ের ওপরে ধীরে ধীরে চক্কর দিতে লাগলো ওমর। উচ্চতা কমিয়ে আনলো আরও। তারপর নাক নিচু করে উড়ে গেল নীল পানির দিকে। যেখানে পানির গা ঘেঁষে রয়েছে একফালি বাঁকা শাদা সৈকত।
চিলের মতো ডানা মেলে দিয়ে যেন ভেসে ভেসে নামতে শুরু করলো ফ্লাইং বোট। সামনে ঝুঁকে এসে কোন জায়গায় নামতে হবে ওমরকে দেখিয়ে দিলো ডজ।
তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় কিশোর মন্তব্য করলো, পৃথিবীর দেশ বলে মনে হয় না! একেবারে স্বর্গ!
তা ঠিক, কথাটা ডজও স্বীকার করলো। এতো সুন্দর জায়গা পৃথিবীতে কমই আছে। তবে স্বর্গেও সাপ থাকে।
সাপ! অবাক হয়ে বললো মুসা। এই না বললেন নেই!
আরে না না, ওই সাপের কথা বলছি না, ডজ বললো, ব্যাখ্যা করে কিভাবে বোঝাই! বলতে চাইছি ভালোর পাশাপাশিই মন্দ জিনিস তৈরি করে রাখে প্রকৃতি। এই যেমন রুটিফল আর কলার কথাই ধরো। কতো ভালো খাবার। ওই পাহাড়ের গোঁড়ায় প্রচুর জন্মায়। তেমনি জন্মায় বিষ। বনের ভেতরে বিষাক্ত অর্কিড জন্মায়। এমন সব মাছি আছে কামড়ালে সাংঘাতিক জ্বালা করে। সাগরে যেমন মুক্তো আছে, তেমনি রয়েছে হাঙর আর অন্যান্য ক্ষতিকর জিনিস। জ্যান্ত প্রবাল তো পৃথিবীর সুন্দরতম জিনিসগুলোর একটি। কিন্তু গিয়ে ঘষা লাগিয়ে দেখ না। কেটে রক্ত তো বেরোবেই, বিষও ঢুকে যেতে পারে। সবার ওপর রয়েছে অসুখ, দক্ষিণ সাগরের এই স্বর্গগুলোতে। একশো বছর আগে এই দ্বীপটাতেই শুধু ছিলো দশ হাজার মানুষ। এখন আছে মোটে দুশো। বাকি সব মরেছে শাদা মানুষের বয়ে নিয়ে আসা অসুখে। কেউ এনেছে যক্ষ্মা, কেউ কুষ্ঠ। আর কয়েক বছর পরে এখানে একজন মানুষ থাকবে কিনা সন্দেহ! পঙ্গপালের মতো মরে সাফ হয়ে গেছে এখানে মানুষ…
পানিতে নেমে পড়েছে ফ্লাইং বোট। ছুটলো গায়ের দিকে। বিমানের শব্দ শুনেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে গায়ের লোক। জটলা করছে সৈকতের ধারে। কেউ কেউ উত্তেজনায় নাচতে শুরু করেছে।
এই প্রথম এখানে প্লেন নামছে। জানালার বাইরে মাথা বের করে দিলো ডজ। চেঁচিয়ে বললো, কাওহা!
আরও বেড়ে গেল সৈকতে উত্তেজনা। ডজকে চিনেছে। তাকে চেনা সহজ, লাল রঙের চুলের জন্যে। ঝপাঝপ কয়েকটা ক্যানু টেনে নামানো হলো পানিতে। ছুটে এলো বিমানের পেছনে। ঘিরে ফেললো এসে। কেউ কেউ সাঁতরে চলে এলো। নারী, পুরুষ, ছেলেমেয়ে, সব রকমের মানুষ। চেঁচিয়ে ডজের নাম ধরে ডাকতে লাগলো ওরা, স্বাগত জানাচ্ছে, তবে ডজ নামটা বলছে না, বলছে লাল চুল। কাওহা কাওহা বলে তার জবাব দিচ্ছে ভজ। শান্ত পানিতে বিমানের নোঙর ফেলে ক্যানুতে নামলো বৈমানিকেরা। নিয়ে আসা হলো ওদেরকে নারকেল গাছে ঘেরা সৈকতে।
উঁকি দিয়ে শরীরে অনেক বেশি আঁকিবুকি আঁকা বয়স্ক একজন লোককে হাত ধরে টেনে নিয়ে এলো ডজ। পরিচয় করিয়ে দিলো, ওর নাম অশান্ত সাগর। তারপর হো হো করে হেসে উঠলো যখন অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে ওমরের নাকে নাক ঘষার আগে মোড়ল ভালোমতো তার মুখটা শুকে নিলো। মোড়ল ইংরেজি তেমন জানে না। বললো সে, ফরাসী ভাষা জানে। তবে তার মাতৃভাষা মারকুইসাসে কেউ কথা বললেই বেশি খুশি হয়। আমি কিছু কিছু জানি। আলোচনা চালাতে পারবো।
মোড়লের পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েকজন তরুণ ওদেরকে দেখিয়ে ডজকে বললো ওমর, ওদের ভাবভঙ্গি তো সুবিধের লাগছে না। মনে হচ্ছে মাথায় মুগুরের বাড়ি মারার জন্যে হাত নিসপিস করছে ওদের।
মোড়লের সঙ্গে কথা বললো ডজ। লোকগুলোর দিকে একবার ফিরে তাকিয়ে আবার ডজের দিকে ফিরলো মোড়ল। মারকুইসাসে কিছু বললো। সঙ্গীদেরকে জানালো ডজ, ওরা ভয় পাচ্ছে। জোর করে আমরা ধরে নিয়ে যেতে পারি, এই ভয়। ভয়টা পাইয়েছে ওদের কারনেস, ঝিনুককে জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে।
ওদের বলো, ওমর বললো। ঝিনুককে ছাড়িয়ে আনতে যাবো আমরা।
আবার মোড়লের সঙ্গে কথা বললো ডজ। মোড়ল কি বললো সেটা অনুবাদ করে শোনালো, খুশি হয়েছে ওরা। বলছে এই দ্বীপকে আমরা নিজেদের বাড়ির মতো মনে করতে পারি। তারপর নিজে থেকে বললো, ওরা যা বলে, ঠিক তাই বোঝায়। ফাঁকি-ঝুঁকি নেই। যাকে পছন্দ করবে তাকে সব দিয়ে দিতে রাজি। এখুনি আমাদের জন্যে একটা ঘর বানাতে হুকুম দিয়ে দিয়েছে মোড়ল। রাতের বেলা ভোজ হবে।
ঘর বানিয়ে দেবে, ঠিক আছে, ওমর বললো। তবে খাবার দাওয়াতটা রাখতে পারবো কিনা সন্দেহ। আসার সময় কারনেসের স্কুনার দেখে এসেছি। সত্যিই যদি তারটাই হয়, তাহলে সন্ধ্যার পর পরই পৌঁছে যাবে সে। ভোজফোজের মধ্যে না গিয়ে তার ওপর নজর রাখাটা জরুরী।
আরেক দফা লম্বা আলোচনা হলো ডজের সঙ্গে মোড়লের। ওমরের দিকে ফিরে ডজ বললো, ও বুঝতে পেরেছে। কয়েকজন যোদ্ধাকে পাহাড়ে পাঠিয়ে দেবে নজর রাখার জন্যে। স্কুনারটাকে দেখা গেলেই আমাদের হুঁশিয়ার করে দেবে।…আহ্, ওই যে আসছে সাগরের হাসি, ঝিনুকের বান্ধবী। বছর পনেরোর এক কিশোরী এগিয়ে এলো। খুব সুন্দরী। পরনে হালকা নীল রঙের পোশাক, দ্বীপের লোকেরা যেমন পরে। ছেলে আর মেয়েতে কোনো ভেদাভেদ নেই, একই রঙের কাপড় পরে। চমৎকার স্বাস্থ্য। তেল চকচকে বাদামী চামড়া। হাসতে হাসতে এসে হাত চেপে ধরলো জজের, কোনো জড়তা নেই, বললো, কাওহা, কাওহা।
