হাইপোর জাহাজটা যেখানে নোঙর করা রয়েছে, সেদিকে হেঁটে চললো তিনজনে।
৩
ভেইটিতে ফিরে দেখা গেল, ডজের জখমের অনেক উন্নতি হয়েছে। ঝিনুক কারনেসের হাতে পড়েছে শুনে চমকে গেল সে। ঘাবড়ে গেল রীতিমতো।
ফুঁসে উঠলো ডজ, সোজা মুক্তো খেতের দিকে যাচ্ছিলো ব্যাটা। পথে রাটুনা থেমেছে খাবার পানি নেয়ার জন্যে। থামতেই হবে। কয়েকটা কারণ। মিষ্টি পানি আছে। ওখানকার যে কটা দ্বীপ আছে, তার মধ্যে ওটাই সব চেয়ে বড়। লোকেরা নিশ্চয় বলেছে আমি কয়েক দিনের জন্যে উঠেছিলাম ওখানে। এজন্যে ওদেরকে দোষ দেয়া যায় না। এমনিতেই ঘটনা ওসব জায়গায় খুব কম ঘটে। আর আমার মতো একজন বিদেশীর ওখানে থাকাটা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে ওদের মাঝে, সহজে ভুলবে না। এটা একটা খবরের মতো খবর ওদের কাছে। কারনেস নেমে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবে আমার কথা। আর তা-ই সে করেছে। জেনেছে সাগরের হাসি আর ঝিনুক, নামের দুটো ছেলেমেয়ে সাগরের মাঝের এক দ্বীপ থেকে উদ্ধার করে এনেছে আমাকে। মেয়েটার গায়ে হাত দেয়ার সাহস করবে না কারনেস। কারণ মেয়েদের অপমান সহ্য করবে না দ্বীপের লোকে। এরকম অন্যায় করে অনেক বিদেশীকে মুন্ডু খোয়াতে হয়েছে। তাই ছেলেটাকে ধরেছে সে। লোভ-টোভ দেখিয়েই হয়তো বের করে নিয়ে এসেছে দ্বীপ থেকে। রসদপত্র ফুরিয়ে গিয়েছিলো হয়তো, তাই ফিরে গিয়েছিলো তাহিতিতে। এখন যখন বেরিয়ে গেছে, নিশ্চয় আবার গেছে মুক্তো খেতের দিকে।
মন দিয়ে শুনলো হাইপো। একমত হয়ে মাথা ঝাঁকাল, ঠিকই বলেছেন। অনেক মালপত্র কিনেছে সে। ডুবুরির পোশাক কিনেছে।
কি করে জানলেন? তীক্ষ্ণ হলো ডজের কণ্ঠ।
হু চি মিনের কাছে নারকেলের ছোবড়া বিক্রি করি আমি। ওর কাছে ডুবুরির পোশাক আছে। এবার গিয়ে শুনলাম সেটা নাকি বেচে দিয়েছে কারনেসের কাছে।
কেন নিয়েছে সে-তো বোঝাই যায়, ওমর বললো। ওসব নিয়ে আলোচনা করে আর লাভ নেই। দেরি করা যাবে না এখন। কারনেসের আগে গিয়ে পৌঁছতে হবে আমাদের।
এই তাড়াহুড়োটা করতে হতো না, বিড়বিড় করলো ডজ। ছেলেটাকে ধরেই সর্বনাশটা করলো।
ছেলেটা তাকে কতোটা বলবে, তার ওপর নির্ভর করবে অনেক কিছু। মুখ খুলবে?
কি জানি। মারকুইজানরা কখন যে কি করবে বলা কঠিন। ওদের দাদাৱা ছিলো মানুষখেকো, ভুলে যেও না। মানুষ খাওয়ার ব্যাপারে কানাঘুষা কিছু কিছু এখনও শোনা যায়। ভীষণ জেদী। যদি কোনো বিদেশীকে পছন্দ করে তো, তার জন্যে জীবন দিয়ে দেবে। আর না করলে, তার কথাই শুনবে না। কেটে ফেললেও একটা কথা বের করবে না মুখ থেকে। কারননসকে পছন্দ করার কোনো কারণই নেই ঝিনুকের। হয়তো ভুল জায়গায় নিয়ে চলে যাবে। ইচ্ছে করে।
পথে আবার রাটুনায় থামবে নাকি কারনেস? জানতে চাইলো ওমর। কি মনে হয়? দরকার আছে?
আছে। তাহিতি থেকে ডজ আইল্যান্ড অনেক দূরে। যেতে যেতে খাবার আর পানি ফুরোবেই। রাটুনায় থামতে বাধ্য হবে সে।
তাহলে এক কাজ করলেই পারি, কিশোর পরামর্শ দিলো। আগেই গিয়ে রাটুনায় বসে থাকি আমরা। কারনে গেলেই ধরবো। ঝিনুককে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবো।
হুঁ, বুদ্ধিটা মন্দ না, ডজ বললো। কারনেসও ভাববে সে বেরিয়ে গেছে। জাহাজ নিয়ে তার পিছু নিলেও আগে দ্বীপে পৌঁছতে পারবো না আমরা। সে তো আর জানে না যে প্লেন আছে আমাদের। ওর আগে গিয়ে ওত পেতে থাকবো আমরা, এটা কল্পনাই করতে পারবে না।
পারি, আর না পারি, মুসা বললো। চেষ্টা করে দেখতে দোষ কি?
ওমরও ভেবে দেখলো কথাটা। পছন্দ হলো।
লেগুনের পানিতে ভাসছে ফ্লাইং বোট। ওড়ার জন্যে তৈরি। কিশোরকে নিয়ে ওর চলে যাওয়ার পর বসে থাকেনি মুসা। বিমানটাকে স্টার্ট দিয়ে পানিতেই চালিয়েছে কিছুক্ষণ। কোনো খুঁত আছে কিনা বোঝার চেষ্টা করেছে। ট্যাঙ্কে ভরার পর পেট্রোল যা বাকি রয়ে গেছে, আর যেসব জিনিস তখুনি নেয়ার প্রয়োজন নেই, সেগুলো সুবিধে মতো জায়গায় লুকিয়ে ফেলেছে। যাতে প্রয়োজনের সময় এসে বের করে নিতে পারে।
রওনা হতে কোনো অসুবিধে নেই। হাইপো আর তার হাসিখুশি তিনজন নাবিককে ধন্যবাদ জানালো ওরা। তারপর গিয়ে উঠলো বিমানে। ইঞ্জিন স্টার্ট দিলো ওমর। মিনিট কয়েক পরেই শাদা রেখা তৈরি করে নীল পানিতে ছুটতে শুরু করলো বিমান। জয়স্টিক চেপে ধরেছে সে। ইনসট্রুমেন্ট বোর্ডের ওপর সাঁটানো রয়েছে চার্ট।
কয়েক ঘণ্টা ধরে মাঝারি গতিতে সাগরের ওপর দিয়ে উড়ে চললো ওরা। মাঝে মাকে নিচে দেখা গেল দ্বীপ, নীল মখমলের মাঝে সবুজ পান্নার মতো। একবার নিচে কালো একটা ফুটকির মতো দেখে ডজ জানালো ওটা আদিবাসীদের ক্যানু। শেষ বিকেলে দিগন্তের দিকে হাত তুলে দেখালো, স্কুনার! নিশ্চয় কারনেস!
আরেকটু পরেই সামনে লম্বা একটা ঝিলিমিলি দেখা গেল। আবছা থেকে স্পষ্ট হতে লাগলো ওটা। ভজ ঘোষণা করলো, রাটুনা এসে গেছে। ঘন নীল আকাশে এখন সবুজ একটা প্রতিবিম্ব। এসব জায়গায় বিমান থেকে দ্বীপগুলোকে ওরকমই দেখায়, দূর থেকে আরো কাছে এগোলে আকাশ থেকে যেন পানিতে নেমে পড়লো সবুজ রঙের ঝিলিমিলি। ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে পর্বতের উঁচু চূড়াগুলো।
আগেও দেখেছি এসব, কিশোর বললো। তার পরেও নতুন মনে হয়। যতোবারই দেখি, অবাক হই।
হওয়ারই জিনিস, ডজ বললো। আমি তো কতদিন ধরে আছি। বার বার দেখেছি। তার পরেও পুরনো হয় না। বেশির ভাগ দ্বীপই তৈরি করেছে প্রবালকীট। পানির সমতলের বেশি ওপরে উঠতে পারেনি সেজন্যেই। পমেটো ওই রকম দ্বীপপুঞ্জ। কিন্তু মারকুইস দ্বীপপুঞ্জ আলাদা। বড় বড় পাহাড় পর্বত যেন সাগরের ভেতর থেকে ঠেলে উঠেছে। প্রথমবার দেখে কেমন ভয়ই লাগতো। হাজার হাজার ফুট উঁচু পাহাড়। প্রবালের তৈরি দ্বীপের চেয়ে অবশ্য ওই পাহাড়ওয়ালা দ্বীপগুলোর সৈকতই সুন্দর। ধবধবে শাদা বালি। পাহাড়ের গোড়ায় ঘন জঙ্গলও আছে।
