এই কুত্তা! খেকিয়ে উঠলো কারনেস, আমার জাহাজের কাছে ঘুরঘুর করছিলি কেন?
আপনার জাহাজের কাছেও যাইনি আমি, ক্যাপ্টেন কারনেস, তাড়াতাড়ি জবাব দিলো হাইপো।
বাঁকা হয়ে গেল কারনেসের ঠোঁটের এক কোণ। আরও কুৎসিত করে তুললো মুখটাকে। মুঠো হয়ে গেল আঙুল। ব্যাটা মিথুক… বলতে গিয়েই থেমে গেল। তাকালো ওমরের দিকে। উঠে দাঁড়িয়েছে সে।
দেখুন, কঠিন কণ্ঠে বললো ওমর। এটা আমার টেবিল। আপনাকে ডেকেছি বলে তো মনে পড়ে না।
চুপ হয়ে গেছে সবাই। থমথমে পরিবেশ।
জ্বলন্ত চোখে ওমরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে কারনেস। দাঁতে দাঁত চেপে বললো, তোমাকে কথা বলতে কে বলেছে? বসো!
তার ধমকের পরোয়াই করলো না ওমর। ভদ্রভাবে কথা বলো। তোমার সাগরেদ পেয়েছো নাকি আমাকে?
বসো! চেঁচিয়ে উঠলো, কারনেস। আমার কাজ আমাকে করতে দাও।
কি করবে?
এই কুত্তাটাকে ভর্তা বানাবো।
মাথা নাড়লো ওমর। না, তা তোমাকে করতে দেয়া হবে না। কিছু করতে গেলে আমাকে নাক গলাতেই হবে।
অবাক হলো যেন কারনেস। আমি কে জানো?
জানি। তুমি কে, কী, ভালো করেই জানি। তোমার নাম কারনেস। একটা সাধারণ গুন্ডা। যে মনে করে এই দ্বীপটা তার সম্পত্তি। সরো, আমার টেবিলের সামনে থেকে!
চোখের পলকে পকেটে হাত চলে গেল লোকটার। বেরিয়ে এলো একটা ছুরি। ঝিক করে উঠলো আলোয়।
বিদ্যুৎ খেলে গেল ওমরের শরীরে। এসব ছুরি-টুরির থোড়াই পরোয়া করে সে। থাবা দিয়ে পানির একটা গেলাস তুলে নিয়েই ছুঁড়ে মারলো কারনেসের মুখে। একলাফে এগিয়ে এলো। ধা করে গিয়ে বাঁ হাতটা আঘাত হানলো লোকটার সোলার প্লেক্সাসে। প্রচন্ড আঘাতে ঝটকা দিয়ে সামনে ঝুঁকে এলো করসিকানের মাথা। ওমরের ডান হাতের ঘুসি লাগলো তার চোয়ালে। মাঠ পার করে দেয়ার জন্যে ক্রিকেট বলকে ব্যাট দিয়ে বাড়ি মারলে যেমন হয় শব্দ হলো সেরকম।
গুঙিয়ে উঠলো কারনেস। টলে উঠলো। ধারালো দা দিয়ে এক কোপে কলাগাছের গোড়া কেটে দেয়া হলো যেন, ধীরে ধীরে কাত হয়ে তেমনি ভঙ্গিতে উল্টে পড়লো লোকটা, চেয়ার টেবিল নিয়ে। সেই টেবিলের সামনে বসেছিলো একজন তরুণ আমেরিকান, লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে। চেঁচিয়ে বলতে লাগলো, দারুণ! দারুণ মার মেরেছেন! দেখালেন বটে!
ঘরের কেউ নড়লো না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাত ডলছে রেস্টুরেন্টের মালিক, কিন্তু কিছুই করতে এগোলো না। যেখানে ছিলো সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো ওমর। তাকিয়ে রয়েছে কারনেসের দিকে।
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো আবার করসিকান। মাথা নেড়ে যেন ভেতরটা পরিষ্কার করতে চাইছে। শুয়োরের চোখের মতো খুদে কুকুতে চোখ জোড়ায় তীব্র ঘৃণা। দ্রুত একবার দৃষ্টি ঘুরে এলো সারা ঘরে, তার এই হাস্যকর পরিণতিতে কে কতোটা খুশি হলো যেন দেখলো। ঘুরে এসে চোখজোড়া আবার স্থির হলো ওমরের ওপর। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে। দ্বিধা করলো একটা মুহূর্ত। তারপর দাঁতের ফাঁক দিয়ে হিসহিস করে বললো, আবার দেখা হবে আমাদের।
আলোয় আর দেখা করতে এসো না, শান্তকণ্ঠে বললো ওমর। অন্ধকার রাতে আমার পেছন দিক থেকে এসো, যদি আমাকে মারতে চাও। আরেকবার সামনে পড়লে দাঁত কটা খসিয়ে দেবো, মনে থাকে যেন। যাও, ভাগো! চুরি করে মদ বিক্রি করে গিয়ে। যেটা ভালো পারো।
আরেকবার সারা ঘরে চোখ বোলালো কারনেস। কয়েকজন হাসছিলো, তার চোখে চোখ পড়তেই হাসি মিলিয়ে গেল ওদের। ছুরিটা আবার পকেটে ভরলো করসিকান। তারপর শান্ত পায়ে এগোলো দরজার দিকে। বেরিয়ে গেল বাইরের অন্ধকারে।
একসাথে কথা বলে উঠলো অনেকগুলো কণ্ঠ। কিশোরের মনে হলো, ঝাঁপ দিয়ে এসে পড়লো যেন শব্দগুলো।
ভালো হয়েছে! আচ্ছা, শিক্ষা হয়েছে! বললো একটা কণ্ঠ। শয়তানটাকে একটা শিক্ষা দেয়া দরকার ছিলো!
তাহলে কেন এতোদিন দিলেন না? জিজ্ঞেস করলো ওমর। ভালোমতো একবার দিয়ে দিলেই তো ঠান্ডা হয়ে যেতো। ঘরের সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো, নিন। খাওয়া শুরু করুন। আপদ বিদেয় হয়েছে।
উঠে দাঁড়ালো একজন লম্বা, সুন্দর চুলওয়ালা স্ক্যানডিনেভিয়ান লোক। পরনে নাবিকের পোশাক, পুরনো, মলিন হয়ে গেছে। এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিলো। আমার নাম স্ট্রাডস স্যানটোজ। একটা কাজের কাজ করেছেন। আমার একটা জাহাজ আছে। সাহায্যের দরকার পড়লে জানাবেন, খুশি হয়েই করবো।
থ্যাংকস, স্যানটোজ, ওমর বললো। মনে থাকবে আপনার কথা। আর বসলো না। কিশোর আর হাইপোর দিকে ফিরে বললো, চলো।
দরজার দিকে এগোলো সে। প্রশংসার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলো ঘরের সব কটা চোখ। বাইরে বেরিয়েই হাইপোকে জিজ্ঞেস করলো, আপনার কাজ শেষ হয়েছে?
হয়েছে, বস। শেষ।
জাহাজ ছাড়া যাবে?
যক্ষুণি বলবেন।
গুড। আমি গভর্নরের সঙ্গে দেখা করবো। ঝিনুক ছেলেটার ব্যাপারটা তদন্ত করতে অনুরোধ করবো। কারনেসের হাত থেকে ওকে ছাড়িয়ে আনা দরকার।
জ্যোৎস্নায় আলোকিত বন্দরের দিকে তাকিয়ে বললো হাইপো, দেরি হয়ে গেছে, বস।
মানে? কি বলতে চান?
কারনেসের জাহাজ ছেড়ে দিয়েছে। হাত তুলে দেখালো হাইপো, ওই যে তার স্কুনার, চলে যাচ্ছে।
ওমর আর কিশোরও দেখলো। ধীরে ধীরে বন্দরের মুখের দিকে এগিয়ে চলেছে একটা জাহাজ নোঙর থেকে পানি ঝরছে এখনও।
এইমাত্র ছাড়লো, তিক্ত কণ্ঠে বললো ওমর। আর কিছুই করার নেই। তবে আমার বিশ্বাস, কারনেসের সঙ্গে আবার দেখা হবে আমাদের। চলুন, ভেইটিতে ফিরে যাই।
