এক কোণে দুটো চেয়ার দেখে এগিয়ে গেল ওমর। কিশোরকে নিয়ে বসে খাবারের অর্ডার দিলো। গলা নামিয়ে কিশোরকে বললো, কোথেকে তদন্ত শুরু করবো বুঝতে পারছি না। হাইপো তো বললো কাজ সেরে আসবে। তাকে দিয়ে যদি কোনো সুবিধে হয়। কি বলো?
কারনেসের কথা তাকে বলেছেন? জিজ্ঞেস করলো কিশোর। জাহাজে তো দেখলাম আপনাদের দুজনের খুব ভাব।
না। তবে ও আন্দাজ করে ফেলেছে, কারনেসের সঙ্গে মন কষাকষি চলছে আমাদের কোনো কারণে। ডজকে মারতে দেখেছে ও। শত্রুতা যে আছে বুঝে গেছে। মুক্তোর কথা জেনেছে কিনা কে জানে। ভেইটিতে আমরা অনেক কথা বলছি। আড়ি পেতে কিছু শুনে থাকতে পারে।
যদি আড়ি পাতে। বিশালদেহী, স্বাস্থ্যবান পলিনেশিয়ান লোকটাকে খারাপ মনে হয় না কিশোরের। আমার মনে হয় ওকে বিশ্বাস করতে পারি আমরা। তার সাহায্য পাবো। এখানকার লোক সে। তার ওপর নাবিক। এখানকার অনেক গুজবই তার কানে যাবে। তার কাছে…ওই তো, এসে গেছে।
কিশোর লক্ষ্য করলো, শুধু ওরা দুজনেই নয়, হাইপো ঢোকার পর অনেক জোড়া চোখই তার দিকে ঘুরে গেছে। সে চোখগুলোতে কৌতূহল। সোজা কিশোরদের টেবিলের দিকে এগিয়ে এলো সে। একটা চেয়ার টেনে বসলো। আপনারা ক্যাপ্টেন কারনেসের খোঁজ করছেন তো? ইংরেজি আর ফরাসী ভাষার একটা অদ্ভুত মিশ্রণে কথা বলে সে। ফিসফিস করে বললো।
চিন্তিত ভঙ্গিতে একটা মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইলো ওমর। মাথা ঝাঁকালো। হ্যাঁ, খুঁজছি।
খারাপ লোক।
আমারও তাই বিশ্বাস।
সাবধানে থাকবেন।
কেন? আমাদের সঙ্গে কেন লাগতে আসবে সে? চিনিই তো না।
ওই লোক সবার সঙ্গেই ঝগড়া বাধায়। কালও গন্ডগোল করেছিলো।
তার মানে এখানেই আছে?
হ্যাঁ। তার স্কুনার হোয়াইট শার্ক পাপিতি বন্দরে নোঙর করা রয়েছে। রাটুনা থেকে এসেছে আজ সকালে। কাল ভোরেই আবার জাহাজ নিয়ে বেরোবে। মালপত্র বোঝাই করছে জাহাজে, অনেক জিনিস।
গন্ডগোলটা কি করেছে?
রাটুনা থেকে জোর করে একটা ছেলেকে ধরে নিয়ে এসেছে কাজ করানোর জন্যে। কাল বন্দরে নেমেই পালানোর চেষ্টা করেছিলো ছেলেটা। ধরে ফেলে তাকে প্রচন্ড মার মেরেছে কারনেস। সে বলছে, জাহাজে কাজ করার জন্য চুক্তি করেছে ছেলেটা, আগাম টাকাও নিয়েছে, এখন পালারে কেন? জোর করে ধরে আবার জাহাজে তুলেছে।
কাল ভোরে চলে যাচ্ছে, না?
হ্যাঁ। গভর্নর তাকে বেরিয়ে যাওয়ার হুকুম দিয়েছেন।
কোথায় যাচ্ছে?
বলেনি। কারনেস আর তার সাগরেদরা ছাড়া আর কেউ কিছু জানে না। কেউ জিজ্ঞেস করতে গেলে শুধু চোখ টেপে ওরা, আর মিটমিট করে হাসে।
আপনি জানলেন কি করে?
আমার লোকেরা শুনে এসেছে। বন্দরে নেমেছিলো, সেখান থেকে।
ছেলেটার কি অবস্থা? রাটুনা থেকে যাকে ধরে এনেছে?
কি জানি! হাত ওল্টালো হাইপো। তবে খারাপই হবে। কারনেসের হাতে কেউ পড়লে তার আর ভালো হওয়ার উপায় নেই। সবাই ভয় পায় লোকটাকে।
গভর্নরও?
মনে তো হয়। নইলে ধরে কিছু করেন না কেন? শুধু বেরিয়ে যেতে বলেছেন।
এতোই খারাপ, বিড়বিড় করলো কিশোর। তো, ছেলেটা পালিয়েছিলো কিভাবে? ওরকম একজন লোকের হাত ফসকে?
জাহাজের রেলিঙ টপকে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। পানিকে ওরা ভয় পায় না।
কি যেন ভাবছে কিশোর। আনমনেই বিড়বিড় করলো, রাটুনা থেকে ধরে আনলো…পানিকে ভয় পায় না…হাইপোর চোখের দিকে তাকালো। ছেলেটার নাম বলতে পারেন?
পারবো না কেন? সবাই জানে। ঝিনুক।
ঝট করে কিশোরের দিকে তাকালো একবার ওমর। হাইপোর দিকে ফিরলো। কি বললেন!
ঝিনুক।
হুঁ, যা ভেবেছিলাম! নিচু গলায় বললো কিশোর।
কি ভেবেছিলে? জানতে চাইলো হাইপো। অবাক হয়েছে।
না, কিছু না, আরেক দিকে মুখ ফেরালো কিশোর। সে কি ভাবছে বুঝতে পারলো ওমর। হাইপোকে জিজ্ঞেস করল, রাটুনা থেকেই এনেছে তো?
নিশ্চয়।
আর কোনো সন্দেহ রইলো না কিশোর কিংবা ওমরের। রাটুনাতে গিয়েছিলো কারনেস। কোনো ভাবে জেনেছে, ঝিনুকই উদ্ধার করে এনেছে ডজকে। তার মানে যে দ্বীপ থেকে এনেছে সেটার অবস্থান বলতে পারবে এবং তার অর্থ ওই দ্বীপের কাছাকাছিই কোথাও রয়েছে মুক্তোর খেত। ছেলেটাকে ধরে এনেছে সেই জায়গা চিনিয়ে দেয়ার জন্যে।
এখানে এসে ভালোই করেছি, বুঝলে? কিশোরের দিকে তাকিয়ে বললো ওমর। একটা জরুরী খবর জানা গেল। এখুনি ভেইটিতে ফেরা দরকার। দেরি করা… দরজার কাছে একটা হৈ চৈ শুনে ফিরে তাকালো সে। হঠাৎ করেই নীরব হয়ে গেল সবাই। সব কটা চোখ ঘুরে গেছে সেদিকে। মোটা, গাট্টাগোট্টা একজন ইটালিয়ান লোক ঢুকেছে। ধীরে ধীরে এগোতে লাগলো। মুখের মসৃণ চামড়া কালো দেখাচ্ছে রক্ত জমায়। আধবোজা চোখ। আস্তে করে মোচড় দিচ্ছে গোঁফে। তাকে দেখে সবাই যে এমন চমকে গেছে, এটা যেন উপভোগ করছে খুব।
চেয়ার থেকে অর্ধেক উঠে পড়েছিলো হাইপো, বসে পড়লো আবার। হাত রাখলো ওমরের বাহুতে। কারনেস! তার কণ্ঠে অস্বস্তি।
তাতে কি হয়েছে? আপনি তো আর কিছু করেননি। এতো ভয় পাওয়ার কি হলো?
বুঝতে পারছেন না আপনি। আমার ওপর ওর কুনজর পড়লে বিপদে পড়ে যাবো। আমি কিছুই করতে পারবো না।
কেন পারবেন না?
কারনেস শাদা মানুষ। শাদা মানুষের গায়ে হাত তুললে মুশকিল হবে।
অবাক হয়ে গেল ওমর। ঔপনিবেশিক শাসনের ছোঁয়া এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি এই অঞ্চল থেকে। এখনও এখানকার মানুষের মনে রয়ে গেছে শাদা মানুষের ভয়। নিশ্চয় এখনও ওদেরকে অত্যাচার করে শ্বেতাঙ্গরা। মাথা ঝাঁকালো সে, বুঝেছি। পকেট থেকে টাকা বের করলো বিল দেয়ার জন্যে। চোখের কোণ দিয়ে একটা নড়াচড়া দেখতে পেয়ে মুখ তুলে তাকালো। ওদের টেবিলের কাছাকাছি এসে থেমেছে করসিকান লোকটা। ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রয়েছে হাইপোর দিকে।
