আরও কিছু পরিকল্পনা করা হলো। তবে সবগুলোর মধ্যে ডজের পরামর্শটাই উপযুক্ত মনে হলো। ওমরের মন খুঁতখুঁত করতে লাগলো যদিও। এর চেয়ে ভালো আর কোনো বুদ্ধি বের করতে না পেরে অবশেষে সেটাই মেনে নিলো সে। বিমানটাকে তুলে দেয়া হলো একটা স্টীমারে। রারাটোঙ্গায় নামিয়ে দেবে। ওটার সঙ্গেই যাবে ওমর, কিশোর আর মুসা।
সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে রওনা হয়ে গেল ডজ। মাসখানেক পরে রারাটোঙ্গায় পৌঁছে কিশোররা দেখলো প্ল্যানমাফিক তেল রেখে ভেইটিতে চলে গেছে সে।
তেল-টেল ভরে, বিমানটাকে একবার পরীক্ষামূলক ভাবে উড়িয়ে দেখলো ওমর। ঠিকই আছে। তিন অভিযাত্রীকে নিয়ে রওনা হয়ে গেল ওটা ভেইটির উদ্দেশে। ওখানে পৌঁছে দেখলো একটা অ্যাক্সিডেন্ট করে ফেলেছে ডজ, এতে ওদের পরিকল্পনায় একটা বড় রকম পরিবর্তন হয়ে গেল। সে ঠিকমতোই পৌঁছেছে ওখানে, তেল আর জিনিসপত্রও বহাল তবিয়তেই আছে, কিন্তু তার নিজের হাতটা রয়েছে স্লিঙে ঝোলানো। বেশ লজ্জিত হয়েই সে তার এই দুর্ঘটনার কাহিনী শোনালো।
ভেইটিতে সময়মতোই পৌঁছেছিলো সে। দ্বীপটায় মানুষের বসবাস নেই। পালতোলা ছোট যে জাহাজটায় করে সে ওখানে পৌঁছেছে তার ক্যাপ্টেন স্থানীয় লোক, পলিনেশিয়ান, নাম হাইপো-বললো, একটা কাজে তাহিতিতে ফিরে যাচ্ছে। ফেরার পথে খাবার পানি নেয়ার জন্যে আবার থামবে ভেইটিতে। শুনে ডজের মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। অযথা দ্বীপে বসে থেকে একা একা কি করবে? জিনিসপত্র রেখে চলে যেতে পারে হাইপোর সঙ্গে। জাহাজটা তো ফিরবেই, তখন আবার না হয় ফিরে আসা যাবে। তাহিতিতে গিয়ে বরং গুডু কারনেসের খোঁজখবর নেয়া ভালো। লোকটা কোথায় আছে এখন, কি করছে, জানা থাকলে সুবিধে। ডজ মুক্তোর খেতটা আবিষ্কারের পর অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। হয়তো ইতিমধ্যে ওটা বের করে ফেলেছে কারনেস। ফেলে থাকলে খবরটা চেপে রাখতে পারবে না। সেটাই জানার জন্যে তাহিতিতে চললো আবার ডজ।
বন্দরে পা দিয়েই প্রথম যে লোকটার ওপর চোখ পড়লো তার, সে হলো স্বয়ং কারনেস। তাড়াতাড়ি আবার জাহাজে উঠে পড়তে চেয়েছিলো ডজ, পারলো না, দেখে ফেললে তাকে কারনেসের এক সাগরেদ। একটা গন্ডগোল বাধিয়ে হামলা করে বসলো। হাতে ছুরির খোঁচা খেলো ডজ।
দ্বীপের গভর্নরকে ব্যাপারটা জানাতে পারতো সে। তাতে হয়তো কারনেসকে পাকড়াও করতে পুলিশ। কিন্তু কেন এই শত্রুতা তা জানার চেষ্টা করতেনই গভর্নর। মুক্তোর খেতের কথা ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয় ছিলো তাতে। কাজেই বাড়াবাড়ি না করে সোজা এসে আবার জাহাজে উঠলো ডজ। হাইপোকে অনুরোধ করলো তখনি তাকে ভেইটিতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে।
নিয়ে এসেছে হাইপো। কিশোররা আসার একটু আগে ভেইটিতে পৌঁছেছে ডজ। তখনও নোঙর করা রয়েছে হাইপোর জাহাজ। যায়নি।
জখমটা এক পলক দেখেই বুঝতে পারলো ওমর, ডাইভিঙের ক্ষমতা নেই এখন ডজের। মুক্তো তোলার জন্যে সাগরে ডুব দিতে পারবে বলেও মনে হলো না। অনেকখানি মাংস কেটেছে, চিরে একেবারে হাঁ হয়ে আছে। পচবে কিনা কে জানে! জ্বর এসে গেছে ইতিমধ্যেই। এই অবস্থায় তাকে নিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক। এমনিতেই ওসব গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে ঘা শুকাতে দেরি হয়। তা-ও ঠিকমতো ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করা গেলে। অভিযানে যাওয়া বাদ, ভাবলো ওমর। বরং এখানে থেকে এখন ভালোমতো ওষুধ দিয়ে ডজের জখমের চিকিৎসা করা দরকার।
অযথা বসে থাকতে হবে। তার চেয়ে বরং তাহিতিতে চলে যাওয়া ভালো, ভাবলো সে, হাইপোর জাহাজটা যখন রয়েছে। লোকটার যেতে কোনো আপত্তি নেই, সে ভাড়া পেলেই খুশি। তাহিতিতে বিমান নামাতে চায়নি ডজ, লোকের নজরে পড়ে যাওয়ার ভয়ে। সেটা এড়ানো গেছে। জাহাজে করে এখন ওমর আর আরেকজন যদি যায়-মুসা কিংবা কিশোর, যে কোনো একজন হতে পারে, তাহলে কারো চোখে পড়বে না। কতো নতুন লোকই তো তাহিতিতে যায়, আসে। আরেকটা ভয় ছিলো ডজের, কারনেসের চোখে পড়ার ভয়। সে ভয় করেও আর লাভ নেই। যা ঘটার ঘটে গেছে, চোখে পড়েই গেছে লোকটার। হাইপোর জাহাজে করে গিয়ে এখন আবার ওমররা তাহিতিতে নামলে কারনেস দেখে ফেলবে, আর অনেক কিছু অনুমান করে ফেলবে। করুক। তাতে আর কিছু যায় আসে না। ডজকে দেখেই হয়তো যা করার করে বসে আছে সে। বরং গিয়ে এখন খোঁজ নেয়া দরকার কতোটা বুঝেছে কারনেস, আর কি পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।
কাজেই সেই রাতেই হাইপোর জাহাজে করে তাহিতিতে ফিরে চললো কিশোর আর ওমর। মুসাকে রেখে এসেছে ডজের কাছে। জখম বেশি খারাপ হয়ে গেলে যাতে বিমানে করে উড়িয়ে নিয়ে আসতে পারে তাহিতিতে।
এরকম ছোট জাহাজে বিশাল মহাসাগরে বেরোনো কোনো নতুন অভিজ্ঞতা নয় কিশোরের কাছে। আগেও এসেছে এখানে। শুধু নারকেল গাছের কান্ড সম্বল করে ভেসে পড়েছিলো বিপজ্জনক সাগরে। রেলিঙের কাছে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো জাহাজ ঘিরে হাঙরের ঘোরাফেরা। খাবারের গন্ধ পেয়ে গেছে যেন প্রাণীগুলো, কাছছাড়া হতে চাইছে না আর।
বাতাস চমৎকার। আবহাওয়াও ভালো। নিরাপদেই তিনদিন পরে তাহিতিতে এসে পৌঁছলো জাহাজ। বেশি সময় ওখানে থাকার ইচ্ছে নেই ওমরের। কারনেসের খোঁজ নেয়া হয়ে গেলেই ফিরে যাবে ভেইটিতে।
ডজের পরামর্শ মতো প্রথমেই দুজনে চলে এলো রেস্টুরেন্ট ডু পোর্টে। প্রায় ভরে গেছে জায়গাটা। মানুষ আর তাদের বিচিত্র আচরণ দেখতে ভালো লাগে কিশোরের। কৌতূহল নিয়ে তাকালো। মানুষ দেখার জন্যে এরকম জায়গা খুব কমই আছে। ভালো পোশাক পরা কয়েকজন টুরিস্ট দেখা গেল। তাদের বেশির ভাগই আমেরিকান। জাহাজের ক্যাপ্টেন রয়েছে কয়েকজন, ওরা সব স্থানীয় লোক। শ্বেতাঙ্গ রয়েছে বেশ কিছু, দাঁড়িওয়ালা, নানা দেশ থেকে এসেছে জীবিকা আর রোমাঞ্চের সন্ধানে। পৃথিবীতে যতো রঙের চামড়ার মানুষ আছে, কালো থেকে হলুদ, সব আছে এখানে। রয়েছে চীনা ব্যবসায়ী। পলিনেশিয়ান আছে কয়েকজন, কানের পেছনে আর চুলে রঙিন ফুল গোঁজা। ঢুকতেই ইংরেজি, ফরায়ী, জার্মান, চীনা আর আরও অসংখ্য ভাষার মিলিত কণ্ঠ এসে কানে ধাক্কা মারলো যেন কিশোরের।
