ভেরি গুড, ওমর বললো। আর রবিন?
তার বাবাও যে কিছু দেবেন না, তা নয়, কিশোর বললো। তবে রবিন যেতে পারবে কিনা সেটাই কথা। আজকাল ও ভীষণ ব্যস্ত, গানের ব্যবসায়। মিস্টার বার্টলেট লজ ইদানীং তাকে বেতনের টাকা তো দেনই, কমিশনও দিতে আরম্ভ করেছেন। ফলে ইস্কুলের পড়ালেখা আর মিউজিক ছাড়া এখন আর কিছু বোঝে না রবিন।
হুঁ, মাথা ঝাঁকাল মুসা। রবিনটা যে এভাবে বদলে যাবে, কল্পনাই করিনি কোনোদিন। তার কণ্ঠে দুঃখের সুরটা অপ্রকাশিত থাকলো না।
দেখা যাক, বলে। যেতে রাজি হলে ভালো। না হলে আমরা দুজনেই যাবো। এরকম একটা অ্যাডভেঞ্চার মিস করা যায় না। কি বলো?
তা তো বটেই। দক্ষিণ সাগরে গিয়ে আরেকবার শুঁয়োপোকা খেতে হলেও আপত্তি নেই আমার, তবু যাবো।
তার কথায় হাসলো ডজ। না, শুয়োপোকা আর খেতে হবে না, এটুকু গ্যারান্টি দিতে পারি। তবে প্রচুর নারকেল খেতে হতে পারে।
নারকেল তো ভালো জিনিস। আমার মজাই লাগে।
তাহলে, কাজের কথায় এলো ডজ। কবে রওনা হচ্ছি আমরা?
জিনিসপত্র গোছানো হয়ে গেলেই। এখনই একটা চেক নিয়ে যেতে পারো। যা যা লাগবে লিস্ট করে নিয়ে কিনতে শুরু করে দাও। তবে খরচ যতোটা কম করা যায় সেই চেষ্টা করবে। ফ্লাইং বোটের ব্যবস্থা আমি করবো।
দুই ঢোকে গেলাসের বাকি পানীয়টুকু শেষ করে ফেললো ডজ। হাত বাড়ালো, দাও, চেক। এখুনি বেরিয়ে যাই। আর ভাবনা নেই। ওই মুক্তো এখন আমাদের!
একটা ঝুড়ি কিনতে ভুলো না যেন, হেসে মনে করিয়ে দিলো ওমর। তুমি বলেছিলে ঝুড়ি বোঝাই করে মুক্তো আনতে পারবে। তার কম হলে চলবে না আমাদের।
২
যদিও একটা দিনও নষ্ট করেনি ওরা, তারপরেও দক্ষিণ সাগরে ওদের প্রথম সাময়িক ঘাঁটিটাতে পৌঁছতেই এক মাস পার হয়ে গেল। অনেক কাজ করতে হয়েছে। বসে বসে প্ল্যান করেছে ওমর, এ-ব্যাপারে তাকে সাহায্য করেছে কিশোর। কারণ এই বুদ্ধিটুদ্ধিগুলো তার মাথায়ই ভালো খেলে। জিনিসপত্র কিনতে ডজকে সাহায্য করেছে মুসা। ডাইভিঙের ব্যাপারটা কিশোরের চেয়ে ভালো বোঝে সে। রবিন সত্যিই আসতে পারেনি, পারলো না বলে অনেক দুঃখ করেছে। তবে রকি বীচে থাকতে অনেক সাহায্য করেছে সে, জিনিসপত্র জোগাড়ের কাজে। আরও নানারকম সাহায্য করেছে। হঠাৎ করে জরুরী কাজে বার্টলেট লজ ইউরোপে চলে না গেলে সে অবশ্যই বসে থাকতো না মিডজিকের ব্যবসা নিয়ে; আসতোই সঙ্গে।
ওমর আর কিশোরকে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান করতে হয়েছে। যেমন প্রথমেই ভাবতে হয়েছে, দ্বীপে বিমান নামানোর ব্যাপারটা। কি করে নিয়ে যাবে? অনেক জটিলতা আছে। নিয়ে যাওয়ার জন্যে সরকারী অফিস থেকে অনুমতি জোগাড় করতে হয়। তবে সেটা সহজ কাজ। কঠিন কাজটা হলো বিমানটাকে জায়গামতো নিয়ে যাওয়া। আর কোন ধরনের বিমান নিয়ে গেলে সুবিধে হবে সেটাও বুঝতে হবে।
যেরকম জায়গা, বিমান নিয়ে যাওয়ার দুটো উপায় আছে। এক, জাহাজে করে বয়ে নিয়ে যাওয়া। দুই, উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া। সহজে যাওয়া আর খরচ কমাতে চাইলে জাহাজে তুলে নিয়ে যাওয়াটাই ভালো। আরেকটা বড় সমস্যা হলো, এসব কাজের জন্যে বিমান ভাড়া দিতে চায় না কেউ। কিনতে হবে। আধুনিক বিমানের অনেক দাম। কম দামে পুরনো আমলের জিনিস পাওয়া যায়। তবে কাজ চলার মতো মজবুত আর ভালো জিনিস পাওয়াটা সহজ নয়। তবু খুঁজতে শুরু করলো ওমর।
পেয়েও গেল বিমান বাহিনীর পুরনো বিমান ফেলে রাখার গুদামে। অনেক পুরনো আমলের একটা ফ্লাইং বোট, টুইন ইঞ্জিন। বেশি চলেনি। তবে পড়ে থেকে থেকে অনেক জিনিস নষ্ট হয়ে গেছে। তা নিয়ে ভাবে না ওমর। নিজেই সারিয়ে নিতে পারবে। একটু বেশি খাটতে হবে আরকি। লম্বা ডানাওয়ালা মনোপ্লেন ওটা। বড় ট্যাঙ্ক। একবার তেল ভরে নিলে অনেক দূর যাওয়া যায়।
দরাদরি করে বেশ শস্তায়ই জিনিসটা কিনে নিয়ে এলো ওমর। মেরামতের কাজ শুরু করে দিলো। তাকে এ-ব্যাপারেও সাহায্য করতে লাগলো কিশোর আর মুসা, খুশি হয়েই। বিমান সম্পর্কে অনেক কিছু জানা হয়ে যাবে তাতে। কাজও চলতে লাগলো, সেই সঙ্গে আলোচনাও, কোথায় কিভাবে নিয়ে যাবে বিমানটাকে। ডজ পরামর্শ দিলো, জিনিসপত্র সব নিয়ে আগেই রওনা হয়ে যাবে সে। গিয়ে কিছু প্রয়োজনীয় কাজ সেরে রাখবে। এতো পুরনো একটা ফ্লাইং বোট নিয়ে তাহিতিতে গেলে একটা আলোড়ন সৃষ্টি হবেই। একটা হৈ চৈ শুরু হয়ে যাবে। সেটা এড়ানো গেলেই ভালো। গোপন একটা মিশনে চলেছে ওরা, এতো মানুষের নজরে পড়ে যাওয়া ঠিক হবে না। তার চেয়ে অস্ট্রেলিয়ার কোনো এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে যদি রারাটোঙ্গা দ্বীপে পেট্রোল আর তেল পাঠানোর ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে খুব ভালো হয়। দ্বীপটা যেহেতু অস্ট্রেলিয়ার প্রধান জাহাজ-পথটাতেই পড়ে, তেল পাঠানোর অসুবিধে হবে না। তাই সরাসরি রারাটোঙ্গায় চলে যেতে চায় সে। সেখানে বিমানটার জন্যে খানিকটা তেল রেখে দেবে। বাকিটা জলপথে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে ভেইটিতে। কুক দ্বীপপুঞ্জের সব চেয়ে ছোট দ্বীপগুলোর একটা হলো ডেইটি। দ্বীপ ছোট হলে হবে কি, অনেক বড় একটা লেগুন আছে ওখানে। ফ্লাইং বোট নোঙর করিয়ে রাখার চমৎকার ব্যবস্থা হতে পারে ওই লেগুনে। বার বার তেল ভরা যাবে ওখানে রেখে। রারাটোঙ্গা থেকে বিমানটাকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে ওখানে। ভেইটি থেকে ডজকে তুলে নিয়ে সোজা রওনা হয়ে যাবে বিমানটা ভজ আইল্যান্ডের উদ্দেশে। এই ব্যবস্থায় অনেক সুবিধে। অকারণ অনেক ঝুঁকি এড়ানো যাবে।
