দুজনের মুখের দিকে তাকাচ্ছে দুই কিডন্যাপার। হাসি হাসি ভাবটা দূর হয়ে গেছে চেহারা থেকে। হঠাৎই আবিষ্কার করেছে, দুটো ছেলের মাঝে কোনজন কিশোর আর কোনজন পিটার, জানে না। কিশোরের চোখ কেন জ্বলজ্বল করছিল। এতক্ষণে বুঝল রবিন। দুজনের পরনে এক ধরনের পোশাক, এক চেহারা, কথাও বলছে একই রকম ভাবে।
শাসানির ভঙ্গিতে পিস্তল নাড়ল ডেভ, অনেক হয়েছে। যথেষ্ট। আসল পিটার কে, জলদি বলো!
প্লীজ, কিশোর, অনুরোধ করল পিটার। আমি চলে যাই ওদের সঙ্গে!
থামো! ধমক দিয়ে বলল, কিশোর, ওরা জানে আমি পিটার। খামোকা আমাকে বাঁচাতে চাইছ কেন? চলুন, আমি যাচ্ছি।
ভয়ংকর হয়ে উঠেছে দুই কিডন্যাপারের চেহারা।
প্রিন্টের শার্ট পরা ছেলেটা পিটার, ডেভ বলল। ও-ই বেশি করে যেতে চাইছে। বেশি ইচ্ছুক। তার মানে নতুন বন্ধুকে বাঁচাতে চাইছে।
আমার তা মনে হয় না, জন বলল। শাদা সার্ট পরা ছেলেটা পিটার। অহেতুক কিশোরকে বিপদে ফেলতে চাইছে না।
পিস্তল হাতে আগে বাড়ল জন।
কাপড় দেখ ওদের, ডেভ বলল পেছন থেকে। ধোপার দোকানের চিহ্ন থাকবেই। বোঝা যাবে।
কিশোরের শার্টের কলারের ভেতরটা উল্টে দেখল জন। ও-ই কিশোর পাশা, ডেভ। এই তো। পাশা : তেরশো বত্রিশ!
শ্রাগ করল কিশোর। আমি কিশোর নই। পালানোর সময় কাপড় ছিঁড়ে গিয়েছিল। আমারগুলো ফেলে তখন কিশোরের কাপড় নিয়ে পরেছি। বিশ্বাস না হলে ওর কলারের ভেতর দেখুন।
পিটারের শার্টের কলারও দেখল জন। তাতেও লেখা রয়েছে পাশা : আঠারোশো তেইশ। গাল দিয়ে উঠল সে।
মাথা ঝাঁকাল পিটার। কিশোর ঠিকই বলেছে। আমি কাপড় ছিঁড়ে ফেলেছিলাম। তখন তার এক সেট কাপড় নিয়ে পরেছি।
তারমানে দুজন পিটার হয়ে গেলাম আমরা, কিংবা দুজন কিশোর, হেসে বলল কিশোর। তাহলে আসল কিশোর কে? আমি? বুড়ো আঙুল নাড়ল সে। মোটেও না।
হাঁ হয়ে গেছে মুসা আর রবিন। কাপড়ের ব্যাপারটা জানা না থাকলে এখন ওরাও দ্বিধায় পড়ে যেত কে কিশোর আর কে পিটার ভেবে।
শুনুন, কিশোর বলল। কিশোরের পকেট দেখুন। একটা জিনিস পাবেন। যেটা প্রমাণ করবে সে কিশোর পাশা।
দ্রুত পিটারের পকেটে হাত ঢোকাল জন। ছোট একটা যন্ত্র বের করল। ঘুরে তাকাল সঙ্গীর দিকে। এ তো আমাদেরই বাগ! এটা পাশাদের ওয়ার্কশপ। নিশ্চয় পাশাই কুড়িয়ে নিয়ে পকেটে রেখেছে। সেটাই স্বাভাবিক।
ইডিয়েট! ধমকে উঠল ডেভ। ওটা পিটার পেয়েছে, শুনলাম না তখন? তারপর হাতে হাতে ঘুরেছে। কার কাছ থেকে কার কাছে গেছে কি করে বুঝব?
ওদের কথার কোনও বিশ্বাস নেই।
রাগে লাল হয়ে গেল জনের মুখ। কিশোরের কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে শুরু করল। লোকটার জ্যাকেট খামচে ধরল কিশোর, যেন পতন ঠেকানোর জন্যে। গাল দিয়ে উঠল কিডন্যাপার, এই ছাড়, ছাড়, আমার জ্যাকেট ছাড়!
ছেড়ে দিল কিশোর। তার পকেট ভালমত খুঁজে দেখল জন। তারপর পিটারের সব পকেট দেখল। কিছু নেই! সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে নিরাশ কণ্ঠে বলল সে।
হাসতে আরম্ভ করল কিশোর। দেখাদেখি পিটারও হাসতে লাগল।
এটা বন্ধ করা দরকার! চেঁচিয়ে উঠল ডেভ। পিটারের বাবার একজন। শোফার আছে। আর্মির লোক। তার নাম আর র্যাংক বলতে হবে তোমাদেরকে। যে বলতে পারবে না, ধরে নেব সে-ই কিশোর পাশা। হ্যাঁ, বলে ফেল এখন।
বরফের মত জমে গেল যেন রবিন আর মুসা। এইবার ফাঁদে পড়েছে কিশোর। কি করবে? প্রশ্নের জবাব জানা নেই তার। তাকে বাঁচানোর জন্যে সঠিক জবাবটা দিয়ে দেবে এবার পিটার।
বেশ, হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গি করল পিটার। এবার আটকে ফেলেছেন। বলতে পারলাম না। আমিই কিশোর পাশা।
ভাবান্তর ঘটল না মুসা আর রবিনের চেহারায়। তবে মনে মনে উৎফুল্ল হয়ে উঠল ওরা। কিশোরের খেলাটা ধরে ফেলেছে পিটার। পাকা খেলোয়াড়ের মত খেলতে আরম্ভ করেছে।
হ্যাঁ, আমি স্বীকার করছি, কিশোর বলল। আমি কিশোর পাশা। শোফারের নাম বলতে পারব না।
প্রচণ্ড রাগে জ্বলে উঠল দুই কিডন্যাপার, বিশেষ করে ডেভ। ঝটকা দিয়ে ঘুরল রবিন আর মুসার দিকে। আশা করি তোমরা ওদের মত বোকা নও! মরার ইচ্ছে নেই! বলে ফেল কে কিশোর আর কে পিটার?
ও! পিটারকে দেখাল মুসা।
ও! কিশোরকে দেখাল রবিন।
আস্তে মাথা নাড়ল ডেভ। হুঁ। একটাই উপায় আছে এখন আমাদের। এছাড়া আর কিছু করার নেই। দুই কিশোরের দিকে এগিয়ে এল সে, কিংবা দুই পিটার। কোনটা যে বের করবে এবার।
১৬.
রেড লায়ন থেকে কিংকে তুলে নিয়ে ইয়ার্ডে চলে এল হ্যারি। উজ্জ্বল রোদ। ভেতরে ঢুকল বিশাল চকচকে ক্যাডিলাকটা। ওদেরকে স্বাগত জানাতে ছুটে গেল না কোনও কিশোর। নীরব চত্বরের চারপাশে চোখ বোলাল ওঁরা।
পিটার! চিৎকার করে ডাকল কিং। কিশোর!
রবিন বলেছে, হ্যারি জানাল। ওদের গোপন হেডকোয়ার্টারে রেখেছে পিটারকে। জঞ্জালের ভেতরে লুকানো। গলা চড়িয়ে ডাকল, কিশোর! কিশোর পাশা!
পিটার! কিশোর! কিংও ডাকল।
এত চেঁচামেচি কিসের! এই সক্কাল বেলা! বাড়ির কোণ ঘুরে বেরিয়ে এলেন মেরিচাচী। ফুলগাছে পানি দিচ্ছিলেন বোধহয়। এখন কটা বাজে? এত সকালে এসে চেঁচামেচি জুড়েছেন!
সরি, ম্যাম, মোলায়েম গলায় বলল কিং। ছেলেগুলোকে খুঁজছি আমরা। কিশোরকে দেখেছেন?
ও, আপনারা, চিনতে পারলেন মেরিচাচী।
কিশোরকে খুঁজছি আমরা, হ্যারি বলল এমন ভঙ্গিতে, যেন মস্ত অপরাধ করে ফেলেছে। ও কোথায়?
