মাঝরাতে রবিনের জায়গায় এসে বসল কিশোর।
বারান্দায় টেবিলেই পড়ে আছে প্যাকেটগুলো। কোনও নড়াচড়া নেই কোথাও। কোনও শব্দ নেই। শুধু বাইরের রাস্তায় মাঝেসাঝে হুস হুস করে চলে যাচ্ছে দুএকটা গাড়ি।
রাত দুটোয় মুসার পাহারা দেয়ার পালা পড়ল। রান্নাঘরে ঢুকেই হাই তুলল। কয়েকবার। মেরিচাচীর ফ্রিজটায় হামলা চালাবে কিনা ভাবল একবার। বাতিল করে দিল ভাবনাটা। তাতে পাহারার অসুবিধে হতে পারে। ভোর চারটেয় আবার এসে তার জায়গা দখল করল রবিন।
কিশোর মনে হয় ভুল করেছে, ফিসফিস করে বলল মুসা। কিংবা অন্য কোথাও চলে গেছে পিটার। এই রাস্তায় এটাই একমাত্র বাড়ি নয়। আরও আছে। ওগুলোতে লুকানোর জায়গা আছে, খাবারের ব্যবস্থা আছে।
ভোর সাড়ে পাঁচটা। পুবের আকাশে ধূসর আলোর আভাস। তবে ইয়ার্ডের জঞ্জালে অন্ধকার আগের মতই শেকড় গেড়ে রয়েছে যেন, নড়তে চাইছে না। ঠিক এই সময় বাড়ির পেছনের বারান্দার কাছে কি যেন নড়তে দেখল রবিন।
তন্দ্রা এসেছিল। ঝট করে সোজা হলো সে। চোখ মিটমিট করে দৃষ্টি স্বচ্ছ করার চেষ্টা করল। ভাল করে তাকাল বারান্দার দিকে। আবছা একটা ছায়ামূর্তি এসে উঠেছে বারান্দায়। ইমারজেন্সি সিগন্যাল চালু করে দিল রবিন।
এত জোরে লাফিয়ে বিছানা থেকে নামতে গেল কিশোর, পড়েই যাচ্ছিল আরেকটু হলে। মুসার কাধ ধরে নাড়া দিল, এই ওঠ ওঠ, জলদি! বলেই দিল দরজার দিকে দৌড়। টিইপ টিইপ করছে তার পকেটে ইমারজেন্সি সিগন্যাল।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমেই দুজন দুদিকে চলে গেল। লুকিয়ে পড়ল দুটো ঝোপের ভেতরে।
রান্নাঘরে বসে ঘড়ি দেখল রবিন। আবার তাকাল বারান্দার দিকে। বারান্দাটা একেবারে খোলা নয়। অর্ধেকটা বেড়া দেয়া। টেবিলটা রয়েছে সেই ঘেরা অংশের ভেতরে। সেখানে ঢোকার মুখের কাছে চলে গেছে ছায়ামূর্তিটা। একটা ছেলে, কোনও সন্দেহ নেই। আবছা অন্ধকারেও কিশোর পাশার অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠল যেন। অবিকল একই রকম শরীর দুজনের। টেবিলের কাছে এগিয়ে গেল ছেলেটা। খাবারের প্যাকেটের দিকে হাত বাড়াল।
এই, থামো! চিৎকার করে বলল রবিন। তোমাকেই বলছি, পিটার মনটেরো!
যেন কারেন্টের শক খেয়েছে ছেলেটা, এমন করে ঝটকা দিয়ে পিছিয়ে এল। ঘুরেই দিল দৌড়। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আছাড় খেয়ে পড়েই যাচ্ছিল প্রায়। পেছন ফিরে তাকাল একবার। রবিনের দিকে চোখ পড়ল। ঘরের কোণ ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল ওপাশে।
বেরিয়ে পড়েছে কিশোর। শিকারী বেড়ালের মতই এসে লাফ দিয়ে পড়ল যেন ছেলেটার ঘাড়ে।
ঝাড়া দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল ছেলেটা। পালাতে পারল না। ততক্ষণে হাজির হয়ে গেছে মুসা আর রবিন। চেপে ধরল পিটারকে। ছাড়া পাওয়ার জন্যে। ধস্তাধস্তি শুরু করল ছেলেটা।
ভয় নেই, আমরা বন্ধু! বোঝানোর চেষ্টা করল গোয়েন্দারা। স্যার মনটেলোর হয়ে কাজ করছি। তোমাকে সাহায্য করতে চাইছি! কিং আর হ্যারি…!
কিন্তু কোনও কথাই যেন ঢুকছে না ছেলেটার কানে। ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করেই চলেছে। শক্ত করে তাকে চেপে ধরে রাখল রবিন আর মুসা। কিশোর বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগল।
হার্বার্ট কিং? অবশেষে যেন কথা কানে ঢুকল ছেলেটার। হ্যারি ম্যাকঅ্যাডাম? ওরা এখানে?
হ্যাঁ, এখানে, কিশোর বলল। তুমি এখন পুরোপুরি নিরাপদ। কোনও ভয় নেই আর। চল, আমাদের হেডকোয়ার্টারে।
প্রায় টেনেহিঁচড়ে পিটারকে নিয়ে এসে ট্রেলারে ঢোকাল তিন গোয়েন্দা।
এটা…এটা কি? জানতে চাইল পিটার।
একটা ট্রেলার, জবাব দিল কিশোর। জঞ্জালের তলায় লুকানো একটা মোবাইল হোম। আমাদের হেডকোয়ার্টার। তোমার জন্যে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। কারণ, যারা তোমাকে কিডন্যাপ করতে চায়, এ মুহূর্তে তারা হয়ত এই ইয়ার্ডের চারপাশেই ঘুরঘুর করছে।
সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিল রবিন।
কিশোরের দিকে তাকিয়ে থ হয়ে গেল পিটার। বড় বড় হয়ে গেল চোখ। মুখ। হাঁ। অনেক কষ্টে যেন কথা খুঁজে পেল, তুমি…তুমি দেখতে একেবারে আমার মত! অবিকল এক! কেন?
.
১৪.
হেসে বলল কিশোর, একই প্রশ্ন তো আমিও করতে পারি।
পিটারও হাসল। হ্যাঁ, তোমাদের দেশে যখন আমি প্রশ্ন করার অধিকারটা তোমারই বেশি।
তার ওপর আবার কিশোরের পোশাক পরেছ, মুসা বলল।
কিশোরের একটা পুরনো প্যান্ট পিটারের পরনে। গায়ে শাদা শার্ট, কয়েক মাস আগেই ওটা ফেলে দিয়েছিল সে। আর এক জোড়া ছেঁড়া স্যাণ্ডাল।
পালানোর সময় কাপড় ছিঁড়ে শেষ হয়ে গেছে আমার, পিটার বলল। একেবারে পরার অনুপযুক্ত। কি আর করব। জঞ্জালের নিচে হামাগুড়ি দেয়ার সময়। একটা বাক্সের ভেতরে পেয়ে গেলাম এগুলো।
খাইছে! গুঙিয়ে উঠল মুসা। কথাবার্তার ভঙ্গিও দেখি এক। একজন কিশোর পাশার যন্ত্রণায়ই অস্থির, দুজনকে সইব কি করে?
হাসতে লাগল সবাই।
তোমাদের বেকায়দায় ফেলে দিলাম। সরি, পিটার বলল। তবে আমাকে যে, খুঁজে বের করেছ এজন্যে আমি কৃতজ্ঞ। আমি তো ঘাবড়েই যাচ্ছিলাম আদৌ কেউ বের করতে পারবে কিনা ভেবে।
তোমাকে পেয়ে আমিও খুব খুশি, দাঁত বের করে হাসল কিশোর। যমজ তো।
একা থাকার যন্ত্রণা আর সহ্য করতে পারছিলাম না, পিটার বলল। কিন্তু তোমরা কে? পরিচয়ই কিন্তু হয়নি এখনও।
তোমার যমজ ভাইয়ের নাম তো শুনলেই-কিশোর পাশা, গোয়েন্দাপ্রধান, পরিচয় করিয়ে দিল রবিন। আমার নাম রবিন মিলফোর্ড। রেকর্ড রাখা আর রিসার্চের কাজগুলো আমি করি। আর ও হলো মুসা আমান, সহকারী গোয়েন্দা।
