মৌসুমীকে ‘মুক্তি’-র কথা কিছু বলিনি। কে জানে, গোটা ব্যাপারটা হয়তো একটা ধাপ্পা। পরে ও উঠতে-বসতে এ নিয়ে আমাকে খোঁটা দেবে। ব্যাপারটা আর একটু এগোক, তারপর না-হয় দেখা যাবে।
‘মুক্তি’-র অফিসে ঢোকার আগে বাড়িটার দরজায় দাঁড়িয়ে প্রাণভরে সিগারেটের টান দিয়েছি। একেবারে ফিল্টার পর্যন্ত খেয়ে তারপর টুকরোটা ফেলেছি। এটাই বোধহয় আমার জীবনের শেষ সিগারেট—অন্তত ডক্টর হালদার গতকাল সে-রকমই বলেছেন। কিন্তু সিগারেটের শেষ টানটা কেমন বিচ্ছিরি লাগল।
রিসেটশানে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। ভেতরে যাওয়ার ডাক পেলাম। প্রতাপ আমাকে পৌঁছে দিল ডক্টর হালদারের ঘরে। তারপর চলে গেল ঘর ছেড়ে।
তারক হালদার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন আমাকে। বললেন, ‘আসুন, আসুন, মিস্টার দত্ত। আপনি এসেছেন—আমি খুব খুশি হয়েছি। আমাদের বেশিরভাগ ক্লায়েন্ট প্রথম ইন্টারভিউর পর আর আসেন না। মনে হয়, তাঁরা সিগারেট ছাড়ার ব্যাপারে তেমন সিরিয়াস নন। আশা করি আপনার সঙ্গে কাজ করে আনন্দ পাওয়া যাবে—।’
হিপনোটাইজ-টিপনোটাইজ করে কিছু করবে না কি? এখন তো হিপনোটিজম ছাড়া আর কিছু আমার মাথায় আসছে না।
‘আমার—ইয়ে, মানে, ট্রিটমেন্ট কখন শুরু হবে?’ ইতস্তত করে জিগ্যেস করলাম।
এবার তারক হালদার একটুও না হেসে বললেন, ‘শুরু হবে নয়, শুরু হয়ে গেছে, মিস্টার দত্ত। আপনি আমার ঘরে ঢোকামাত্রই আপনার ট্রিটমেন্ট শুরু হয়ে গেছে। এখন আপনার সিগারেট না-ছেড়ে আর উপায় নেই। আপনার কাছে সিগারেট আছে?’
আমি একটু অবাক চোখে ডক্টর হালদারকে দেখলাম বললাম, ‘হ্যাঁ, আছে।’
ডক্টর হালদার প্রথমে চোখ থেকে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন। সামান্য কেশে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে সাদা অ্যাপ্রনটা খুলে ফেললেন গা থেকে। সেটা টেবিলের একপাশে রেখে হাত বাড়ালেন আমার দিকে।
‘সিগারেটগুলো আমাকে দিন—।’
আমি প্যাকেটটা পকেট থেকে বের করে হালদারের হাতে দিলাম। প্যাকেটে তিনটে সিগারেট ছিল।
প্যাকেটটা টেবিলে রেখে তারক হালদার আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। বুঝতে পারলাম, মানুষটাকে এখন যেন অন্যরকম লাগছে। চশমা, স্টেথো আর অ্যাপ্রন খুলে ফেলায় হালদারকে মোটেই আর ডাক্তার বলে মনে হচ্ছে না। যদিও তাঁর ফুলহাতা চেক শার্ট আর টেরিকটনের প্যান্ট যথেষ্ট আধুনিক এবং নিখুঁত।
হঠাৎই ডানহাত মুঠো পাকিয়ে সিগারেটের প্যাকেটটার ওপরে এক প্রচণ্ড ঘুষি বসিয়ে দিলেন হালদার। তাঁর কটা চোখ জ্বলজ্বল করছে, সরু ঠোঁটে একচিলতে হাসি।
মুখের ভাব এতটুকু না পালটে প্যাকেটটার ওপরে ঘুষির-পর-ঘুষি মেরে চললেন তিনি। ঘুষির শব্দে বন্ধ ঘরটা যেন কেঁপে-কেঁপে উঠতে লাগল। সিগারেটের প্যাকেটটা দলা পাকিয়ে গেল, থেঁতলে গেল, সিগারেটের টুকরো ছিটকে গেল, তামাক ছড়িয়ে গেল টেবিলে।
শব্দেই বোঝা যাচ্ছিল, তারক হালদারের ঘুষির জোর নেহাত কম নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর মুখের হাসিতে এতটুকু চিড় ধরেনি। আমার কেমন ভয়-ভয় করতে লাগল।
তারক হালদার একসময় থামলেন। তাঁর স্বাস্থ্যবান শরীরটা সামান্য হাঁফাচ্ছিল। টেবিল থেকে তামাকের গুঁড়ো আর থেঁতলানো প্যাকেটটা নিয়ে ফেলে দিলেন বাজে-কাগজ-ফেলার ঝুড়িতে। বললেন, ‘মিস্টার দত্ত, বিশ্বাস করুন, এ-কাজে আমি দারুণ আনন্দ পাই। এত বছর হয়ে গেল এ-ব্যবসায় নেমেছি, কিন্তু এই তৃপ্তিতে একটুও ভাটা পড়েনি।’
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘আপনার কি মনে হয় এতেই আমি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেব? এই বিল্ডিং-এর ঠিক উলটো দিকে একটা পানের দোকান রয়েছে—।’
‘ধীরে, মিস্টার দত্ত, ধীরে।’ হাত তুলে আমাকে বাধা দিলেন তারক হালদার ‘এত অল্পে অধৈর্য হবে না। আমি ছেলেমানুষ নই যে, ভাবব এই সিগারেটের প্যাকেট থেঁতলানো দেখেই আপনি সিগারেটের নেশা ছেড়ে দেবেন। সবাই যদি এতই সুবোধ হত তা হলে আমাদের দেশে এত সমস্যা থাকত না। আর আমাদের মতো ডাক্তারের প্রয়োজন পড়ত না।’
মানুষটাকে আমার কেমন অসহ্য লাগছিল। কিছু একটা বলার জন্যে যেই মুখ খুলতে গেছি অমনি তারক হালদার বাধা দিলেন আমাকে। কম্পিউটারের সামনে বসে পড়ে ফটাফট কিবোর্ডের বোতাম টিপলেন। একগাদা লেখা ফুটে উঠল মনিটরে।
সেদিকে তাকিয়ে হালদার বললেন, ‘আপনার ছেলে হেয়ার স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে। কথায় সামান্য তোতলামি ভাব আছে। বিয়ের আগে আপনার স্ত্রীর পদবি ছিল নন্দী। উনি ইকনমিক্স নিয়ে বি. এ. পাশ করেছেন। আপনারা আগে—।’
আমি রাগে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। উত্তেজিতভাবে বললাম, ‘এসব আপনি কোত্থেকে জানলেন? কোন সাহসে আপনি আমার ফ্যামিলি—।’
তারক হালদার এতটুকু বিচলিত হলেন না। শান্ত গলায় বললেন, ‘আমি তো কালই আপনাকে বলেছি, দরকার পড়লে আমরা সব জেনে নেব। তবে আপনার কোনও চিন্তা নেই, এসব আর কেউ জানতে পারবে না।’
‘অনেক ধন্যবাদ। আমি চললাম।’ সিগারেটের নেশা আমি ছাড়তে চাই না।’ আমি চেয়ারটা ঠেলে সরিয়ে এগোতে গেলাম দরজার দিকে।
‘মিস্টার দত্ত!’
তারক হালদারের ডাকে থমকে দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকালাম। অবাক হয়ে দেখলাম মানুষটার মুখ ভাবলেশহীন। বাঁ-হাতে ঘাড়ের কাছে লম্বা চুলগুলো একটু নেড়ে তিনি বললেন, ‘এখুনি যাবেন না, মিস্টার দত্ত। দয়া করে একটু বসুন, কথা আছে।’
