কথাটা বলে বেশ মজা করে হেসে উঠলেন তারক হালদার। টেবিলে ছোট্ট একটা চাপড় মেরে বললেন, ‘কী বিচিত্র চিকিৎসা! এতে সিগারেট খাওয়ার ব্যাপারটা এতটুকু কমেছে বলে আপনার মনে হয়?’
আমি প্রশ্নটা পাশ কাটিয়ে গিয়ে বললাম, ‘শুনেছি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিলে মাথা ঘোরে, মাথা টনটন করে, পেট ফেঁপে যায়…।’
তারক হালদার মাথা নাড়লেন, বললেন, ‘এর বেশিরভাগটাই মনের অসুখ। তবে সিগারেট হঠাৎ ছেড়ে দিলে কিছু-কিছু অসুবিধে হয় বইকি। এ-জন্যে বিদেশে নিকোটিনওলা চুয়িংগাম পাওয়া যায়। সিগারেটের বদলে পেশেন্টরা ওটা খায়—অবশ্য ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে তবেই খায়।’
আমি আর থাকতে না পেরে বললাম, ‘ডক্টর হালদার, আপনি এখনও আমার ট্রিটমেন্টের কথা কিছুই বলেননি—।’
তারক হালদার মিষ্টি করে হাসলেন। কম্পিউটারের কিবোর্ডে একটা চাটি মারলেন। সঙ্গে-সঙ্গে মনিটরের সব লেখা মুছে গেল। কালো পরদায় শুধু একটা ডস প্রম্পট আর সাদা কারসর দপদপ করতে লাগল।
চোখের চশমাটা খুলে টেবিলে নামিয়ে রাখলেন হালদার। মাথা ঝুঁকিয়ে দু-আঙুলে নাকের গোড়া টিপলেন কয়েকবার। তারপর এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়লেন। তাঁর লম্বা চুল-ঝাঁকুনি খেল। হঠাৎই আবার মুখ তুলে তাকালেন। তাঁর চোখের কনীনিকা সামান্য কটা বলে মনে হল এখন।
‘মিস্টার দত্ত, আমার ট্রিটমেন্টের কায়দা কোনও বইতে লেখা নেই। এটা খুব সহজ, কিন্তু দারুণ কাজ দেয়। কে কী বলল-না-বলল তা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। আমরা স্রেফ রেজাল্ট চাই—পজিটিভ রেজাল্ট।’
ডক্টর হালদার উঠে দাঁড়ালেন চেয়ার ছেড়ে। হাত নেড়ে হেসে বললেন, ‘আমরা কোনও ওষুধ দিই না, নিকোটিনওলা কোনও চুয়িংগামও দিই না। মহাপুরুষদের বাণী শুনিয়ে জ্ঞান দিই না। পেশেন্টকে কোনওরকম ডায়েটিং করতে বলি না। আর—’ চওড়া করে হাসলেন হালদার। তাঁর সুন্দর দাঁতের সারি দেখা গেল। বললেন, ‘পেশেন্ট সিগারেট ছেড়ে যদি টানা একবছর থাকতে পারে তবেই আমরা টাকা নিই। আর তাও খুব সামান্য—পেশেন্টের পাঁচবছরের সিগারেটের নেশার খরচ।’
‘সে কী!’ আমার মুখ দিয়ে শব্দ দুটো যান্ত্রিকভাবে বেরিয়ে এল। ডক্টর হালদার বলছেন কী! এত সস্তা!
‘কেন, অনুপমবাবু আপনাকে এ-কথা বলেননি?’
‘না—।’
‘আচ্ছা, ভালো কথা, মিস্টার মুখার্জি কেমন আছেন? ভালো আছেন তো?’
‘হ্যাঁ, ভালো আছে।’
‘বাঃ, ফাইন। এবারে কয়েকটা প্রশ্ন করব, মিস্টার দত্ত। প্রশ্নগুলো একটু…ব্যক্তিগত, তবে কথা দিচ্ছি এর উত্তরগুলো আর কেউ জানবে না।’
‘বলুন?’ আমার গলাটা শুকিয়ে যেন সাহারা হয়ে গেছে।
‘আপনার স্ত্রীকে আপনি ভালোবাসেন?’
আমি বিরক্ত চোখে তারক হালদারের দিকে তাকালাম, কিন্তু তিনি অবিচলিতভাবে তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে।
সুতরাং অস্পষ্ট গলায় বিড়বিড় করে বললাম, ‘হ্যাঁ, ভালোবাসি—’
‘বাঃ, বেশ, বেশ।’ টেবিলের পাশ দিয়ে আমার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এলেন ডক্টর হালদার। তারপর আবার প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘আপনার ছেলে তাপসকে আপনি ভালোবাসেন?’
আমি বেশ রেগে গিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। অনেকটা চেঁচিয়ে বললাম, ‘সিগারেট ছাড়ার সঙ্গে এসব প্রশ্নের কী সম্পর্ক?’
অবুঝ ছেলের রাগ দেখে বুদ্ধিমান পিতা যেমনভাবে ক্ষমার হাসি হাসেন, ঠিক সেইভাবে হাসলেন তারক হালদার। তারপর বললেন, ‘সম্পর্ক আছে, মিস্টার দত্ত। বসুন। উত্তেজিত না-হয়ে আপনি দয়া করে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন—’
‘হ্যাঁ, ওকে আমি ভীষণ ভালোবাসি,’ বলে আবার বসে পড়লাম চেয়ারে।
‘বাঃ, চমৎকার! কোন স্কুলে পড়ে তাপস?’
‘সে জেনে আপনি কী করবেন?’ একটা সিগারেট! ওঃ, একটা সিগারেট কেউ দয়া করে আমাকে দিক!
তারক হালদার হাসলেন। থুতনিতে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে, বলতে হবে না। আমরা জেনে নেব। কাল বিকেল তিনটে থেকে আপনার ট্রিটমেন্ট শুরু হবে। যদি আপনার কোনও প্রশ্ন থাকে তা হলে কাল তার উত্তর পাবেন।’
‘আজ তা হলে আসি—’ আমি উঠে পড়লাম। বাইরে বেরিয়েই সিগারেট ধরাতে হবে।
ডক্টর হালদার আবার ফিরে গেছেন নিজের চেয়ারের কাছে।
‘শেষ একটা প্রশ্ন, মিস্টার দত্ত। প্রায় ঘণ্টাখানেক আপনি কোনও সিগারেট খাননি। কেমন লাগছে বলুন—।’
‘ভালোই লাগছে,’ মিথ্যে কথা বললাম। এই বুজরুকটাকে আমি নাস্তানাবুদ করে ছাড়ব। তবে ওর ট্রিটমেন্টের টেকনিকটা জানার জন্যে খুব কৌতূহল হচ্ছে।
‘ভালো, খুব ভালো,’ স্মিত হেসে বললেন হালদার। চশমাটা টেবিল থেকে তুলে আবার বসালেন নাকের ওপর: ‘আজ যত পারেন সিগারেট খান। কাল ট্রিটমেন্ট শুরু হওয়ার পর থেকে আর কখনও আপনি সিগারেট খাবেন না। সিগারেটে আপনার অ্যালার্জি হয়ে যাবে।’
‘তাই?’
‘হ্যাঁ, মিস্টার দত্ত। এটা আমার গ্যারান্টি।’ দেওয়ালের ছবির মানুষটার দিকে একপলক তাকিয়ে আমি ডক্টর হালদারের চেম্বার ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।
প্রতাপ কোথা থেকে যেন এসে হাজির হল আমার পাশে। চুপচাপ আমাকে এগিয়ে দিল রিসেপশান পর্যন্ত।
পরদিন ‘মুক্তি’-র রিসেপশানে যখন হাজির হলাম তখন কাঁটায়-কাঁটায় তিনটে।
গতকাল সারাটা সন্ধে আর আজ সকালটা শুধু দোটানায় ভুগেছি: তারক হালদারের সঙ্গে আর দেখা করব কি করব না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুটো কারণে দেখা করতে এসেছি। প্রথমত, অনুপমের একটা কথা আমার কানে বাজছিল: ‘ট্রাই করে দেখ, এই মানুষটা তোর জীবন একেবারে বদলে দেবে। প্রমিস—।’ আর দ্বিতীয়ত, আমার কৌতূহল।
