আমি ফিরে এসে আবার চেয়ারে বসলাম। হালদার তখন মিটিমিটি হাসছেন—যেন এরকম ছেলেমানুষি উত্তেজনা দেখে-দেখে তিনি ক্লান্ত।
‘আপনাকে তো আগেই বলেছি, মিস্টার দত্ত। আমরা কাজের লোক—শুধু কাজ বুঝি। আমরা শুধু রেজাল্ট চাই, রেজাল্ট। সিগারেটের নেশা ছাড়ানো যে কী ঝামেলার তা আমরা হাড়ে-হাড়ে জানি। এ-নেশা যাঁরা ছাড়েন তাঁদের শতকরা প্রায় সত্তরভাগ আবার পুরোনো হ্যাবিটে ফিরে যান। অথচ দেখুন, ড্রাগের নেশা যাঁরা একবার ছাড়েন, তাঁদের শতকরা পাঁচজনও ওই ড্রাগের নেশায় আর ফিরে যান না। সেদিক থেকে সিগারেটের নেশাটা বড় অদ্ভুত। এককথায় এক্সট্রর্ডিনারি।’
ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটের দিকে চোখ গেল আমার। প্রায় ইঞ্চিদেড়েক লম্বা একটা সিগারেটের টুকরো দেখা যাচ্ছে। ওটা ধরিয়ে অনায়াসে গোটাকয়েক টান দেওয়া যায়। কিন্তু তারক হালদার আমাকে লক্ষ করছিলেন। একটু হেসে টুকরোটা তুলে নিলেন বাজে-কাগজ-ফেলার ঝুড়ি থেকে। দু-আঙুলে রগড়ে ওটাকে চূর্ণবিচূর্ণ করলেন। তারপর আবার স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে শুরু করলেন।
‘ছবির ওই মানুষটাকে দেখুন, মিস্টার দত্ত—’ আঙুল তুলে অয়েল পেন্টিং-এর শীর্ণকায় মানুষটিকে দেখালেন তারক হালদার: ‘সিগারেটের বিষাক্ত ধোঁয়া ওই কর্মঠ মানুষটার জীবন অকালে শেষ করে দিয়েছে। প্রথমে স্মোকার্স লাঙ, তারপর লাঙ ক্যান্সার, আর সবশেষে মৃত্যু—অকালমৃত্যু। লক্ষ-লক্ষ টাকার মালিক ছিলেন ভদ্রলোক। যখন বুঝতে পারলেন, শেষদিন আর বেশি দূরে নেই, তখন তাঁর শেষ ইচ্ছের কথা বলেছিলেন: সিগারেটের কুৎসিত নেশাকে উচ্ছেদ করতে হবে। সিগারেটের ধোঁয়া তাঁর চোখে ছিল অশ্লীল। তাই অঢেল টাকা ঢেলে গড়ে তুলেছিলেন ”মুক্তি” ফাউন্ডেশন। মারা যাওয়ার সময় আমার দু-হাত চেপে ধরে জানিয়েছিলেন তাঁর সাধের কথা। আমি তাঁকে কথা দিয়েছিলাম। তাই আমার চোখের সামনে এই ছবি রেখেছি। ছবির ওই মহৎ মানুষটা সবসময় তাকিয়ে আছে আমার চোখের দিকে, আমাকে শাসনে রেখেছে—যেন আমার শপথের কথা আমি কখনও ভুলে না যাই।’
কথা বলার সময় তারক হালদারের মুখের রেখা নরম হয়েছিল। নিজেকে সামলে নিতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিলেন তিনি। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন ধীরে-ধীরে, ‘মিস্টার দত্ত, সবচেয়ে আশ্চর্য হল, ওই মানুষটি নিজে ডাক্তার ছিলেন—ডক্টর মহেন্দ্রনাথ হালদার। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও তিনি সিগারেটের নেশা ছাড়তে পারেননি। এটাই হচ্ছে ট্র্যাজেডি।’
‘উনি কি আপনার কেউ…’
‘হ্যাঁ। আমার বাবা। আমার নাম উনি রেখেছিলেন তারকনাথ। কিন্তু ওঁর মৃত্যুর পর অকালে যখন অনাথ হলাম নিজের নাম থেকে ওই নাথটুকু আমি ছেঁটে ফেলে দিয়েছি। এখন আমার সামনে শুধু একটাই লক্ষ্য। আমার ক্লিনিকের লাভটা বড় কথা নয়, কাজটাই বড় কথা।’
তারক হালদার হাত বুলিয়ে মুখ মুছলেন, বললেন, ‘আচ্ছা, মিস্টার দত্ত, সিগারেটের ধোঁয়া যখন এঁকেবেঁকে শূন্যে ভেসে যায় তখন মনে হয় না কোনও তরুণীর শরীরের কোমল ভাঁজ-খাঁজ এসব ফুটে উঠছে?’
আমি বিরক্ত হয়ে জবাব দিলাম, ‘না, কখনও ভেবে দেখিনি।’
‘এবার থেকে ভেবে দেখবেন। আসলে পুরো ব্যাপারটার মধ্যেই একটা বিকৃত যৌনকামনা লুকিয়ে আছে। এই যে লম্বা সরু সিগারেট দু-ঠোঁটে চেপে ধরে আপনারা চোষেন—মানে টানেন, সেটাও ওই সেক্সের ব্যাপার। ফ্রয়েড দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। অথচ দেখুন, সিগারেটের নেশাকে আমাদের সমাজ মোটেই অন্যায় বলে মনে করে না—’ একটু চুপ করে থেকে চোয়ালের রেখা শক্ত করে তারক হালদার চিবিয়ে-চিবিয়ে বললেন, ‘কিন্তু আমি অন্যায় বলে মনে করি। সমাজ অসুস্থ বলে আমি তো আর অসুস্থ হতে পারি না—।’
‘এবারে ট্রিটমেন্টের ব্যাপারটা দয়া করে বলবেন?’ আমার ধৈর্য ক্রমশ কমে আসছিল।
‘হ্যাঁ, এবার সে কথাই বলব।’ দাঁত বের করে হালদার হাসলেন: ‘দেখবেন, আমার টেকনিকটা শোনার পর আপনার সমস্ত রাগ গলে জল হয়ে যাবে। আসুন, এদিকে আসুন—।’
তারক হালদার চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন, পেছনের দেওয়ালের সবুজ পরদা ঢাকা ছোট জানলাটার কাছে গেলেন। কী। একটা বোতাম টিপতেই পরদা সরে গেল। ততক্ষণে আমি ওঁর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছি।
গোটা জানলাটা কাচে ঢাকা। কাচের মধ্যে দিয়ে ও-পাশের একটা ছোট ঘর দেখা যাচ্ছে। ঘরের মেঝেটা ইস্পাতের তৈরি। তার ঠিক মাঝখানে একটা প্লেটে কিছু কচি ঘাস আর লেটুস পাতা রয়েছে। গলায় টুকটুকে লাল ফিতে বাঁধা একটা সাদা-কালো খরগোশ প্লেটের ওপরে ঝুঁকে পড়ে আপনমনে ঘাস-পাতা খাচ্ছে। আর মাঝে-মাঝে এদিক-ওদিক মাথা নাড়তেই ওর লম্বা-লম্বা কান দুটো নড়ছে।
প্রাণীটার মখমলের মতো লোম এত লোভনীয় যে, হাত বুলিয়ে আদর করতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু ডক্টর হালদার খরগোশটা আমাকে দেখাচ্ছেন কেন? খরগোশের সঙ্গে সিগারেটের সম্পর্ক কী?
‘খরগোশটার দিকে নজর রাখুন, মিস্টার দত্ত।’ কথাটা বলেই তারক হালদার জানলার তাকে লাগানো একটা লাল বোতাম টিপতে লাগলেন, আর নিরীহ প্রাণীটা খাওয়া থামিয়ে তিড়ি-তিড়িং করে লাফাতে লাগল।
ওটার চোখ গোল-গোল হয়ে গেল। গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল শজারুর কাঁটার মতো। আর লাফাতে লাগল পাগলের মতো।
‘কী করছেন কী! খরগোশটাকে মেরে ফেলবেন না কি!’
