আমার মুখের চেহারা দেখে হালদার বোধহয় কিছু একটা অনুমান করলেন। একটু তড়িঘড়ি বলে উঠলেন, ‘জানি, আমি একটু টেকনিক্যাল কথাবার্তা বলছি, কিন্তু তবু এসব আপনার জানা উচিত। আজকেই যা আমাদের একটু বেশি সময় লাগবে। এরপর থেকে সবই খুব ছোটখাটো ব্যাপার।’
কম্পিউটারের মনিটরের দিকে একবার তাকিয়ে থুতনিতে আলতো করে হাত বুলিয়ে তিনি বললেন, ‘সাধারণত তামাকপাতায় কার্বোহাইড্রেট, ননফ্যাটি অরগ্যনিক অ্যাসিড, নাইট্রোজেন কম্পাউন্ড আর রেজিন থাকে। সিগারেট ধরালে ঠোঁটের দিকটায় টেম্পারেচার হয় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর আগুনের দিকে প্রায় ৯০০ ডিগ্রি। এই হিটে পাইরোলিসিস রিঅ্যাকশান হয়ে নানারকম রাসায়নিক তৈরি হয়। তার মধ্যে শতকরা ৮৫ ভাগই হল নাটট্রোজেন, অক্সিজেন আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড। বাকি ১০ ভাগে গ্যাস, বাষ্প বা সূক্ষ্ম কণার অবস্থায় থাকে কার্বন মনোক্সাইড, টার, নিকোটিন, ফিনল, বেনজোপাইরিন এইসব। ধোঁয়ার এক মিলিলিটারে ০.৩ থেকে ৩.৩ বিলিয়ন পার্টিকল থাকে। এদের মাপ হল, ০.২ থেকে ০.৫ মাইক্রোমিটার। সুতরাং খুব সহজেই শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে চলে যায় এসব তথ্য আপনাকে জানানো আমার ডিউটি।’
তারক হালদার হাসলেন মিটিমিটি। হাতে হাত ঘষে বললেন, ‘মিস্টার দত্ত, ব্যাপারটা অনেকটা চণ্ডীপাঠের মতো শোনাচ্ছে, তাই না? আপনার হয়তো ঘুম পাচ্ছে—।’
আমি তাড়াতাড়ি একটু নড়েচড়ে বসে জবাব দিলাম, ‘না, না খারাপ লাগছে না—আপনি বলুন। এরকম করে আমাকে কখনও কেউ বুঝিয়ে বলেনি।’
শালা অনুপম! দাঁড়া, আবার কখনও তোর সঙ্গে আমার এয়ারপোর্টে দেখা হোক! তোর ইয়েতে আমি চারমিনারের ছ্যাঁকা দেব।
এখন এই ঠগটা কত টাকা চাইবে কে জানে! একটা সিগারেট পেলে ভালো হত।
‘মিস্টার দত্ত, আমরা চণ্ডীপাঠ দিয়ে শুরু করি বটে, তবে জুতো সেলাই দিয়ে খতম করি। আচ্ছা, বলুন তো, দিনে মাত্র এক প্যাকেট সিগারেট খাওয়া মানে বছরে সিগারেটে মোট টান দেওয়া?’
আমি মাথা নাড়লাম। আন্দাজে বোকার মতো উত্তর দেওয়ার কোনও মানে হয় না।
সবজান্তার ঢঙে মাথা দোলালেন তারক হালদার ‘সত্তর হাজারেরও বেশি। এতে কী হয় জানেন? মুখ, নাক, ফ্যারিংস আর ট্রাকিওব্রংকিয়াল ট্রি-র মেমব্রেগুলোতে তামাকের ধোঁয়া লাগে। ধোঁয়ার কতকগুলো কম্পাউন্ড সরাসরি মেমব্রেনের সঙ্গে রিঅ্যাক্ট করে, আর বাকিগুলোর কিছু রক্তে মিশে যায়, নয়তো মুখের লালার সঙ্গে পেটে চলে যায়। যারা রেগুলার স্মোক করে তাদের দেখবেন মাঝে-মাঝে শ্বাসকষ্ট হয়, কাশি হয়। তা ছাড়া কার্ডিয়াক প্রবলেম, পেপটিক আলসার হওয়া ছাড়াও লাংস, ল্যারিংস বা ফুড পাইপেও ক্যান্সার হতে পারে।’
আমি আপত্তি করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু বাঁ-হাতটা বরাভয় ভঙ্গিতে তুলে স্মিত হাসলেন হালদার, বললেন, ‘জানি, এ নিয়ে বিতর্ক আছে—তবে এসব রোগের ভয়টা নিছক অহেতুক নয়।’
ডক্টর হালদার আবার কম্পিউটারের দিকে মনোযোগ দিলেন, কিবোর্ডের বোতাম টিপলেন পটাপট। তারপর আমার দিকে না-তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কোন ব্রান্ডের সিগারেট খান, মিস্টার দত্ত?’
‘উইলস ফিল্টার—।’
‘হুঁ। একটা সিগারেটের লেংথ ৭৪ মিলিমিটার, ফিল্টারের লেংথ ২২ মিলিমিটার, ডায়ামিটার সাড়ে সাত মিলিমিটার। আর একটা সিগারেটের ওজন ৯৪০ মিলিগ্রাম। নিকোটিনের পরিমাণ তেমন মারাত্মক নয়। বরং চারমিনারের ওজন ৮৬৫ মিলিগ্রাম আর লেংথ ৬৮ মিলিমিটার হলেও নিকোটিনের সমস্যাটা একটু বেশি। আসলে নিকোটিন নিয়েই যত সমস্যা আমাদের।’
‘হ্যাঁ, দেখেছি—রুমালে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়লে হলদে ছাপ পড়ে।’
‘না, না।’ মাথা নাড়লেন ডক্টর হালদার ‘পিওর নিকোটিনের কোনও রং নেই। দশটা কার্বন পরমাণু, চোদ্দোটা হাইড্রোজেন পরমাণু, আর দুটো নাইট্রোজেন পরমাণু দিয়ে এই ভয়ঙ্কর বিষ তৈরি। প্রকৃতির এমনই লীলা, তামাক পাতার মধ্যে এই বিষ রয়েছে—অবশ্য খুব সামান্য পরিমাণে। আসলে কী জানেন? নিকোটিনের মধ্যেই একটা নেশার টান থাকে। যার জন্যে অনেকেই সহজে সিগারেট ছাড়তে পারে না। আমার কাছে এলে অবশ্য আর কোনও প্রবলেম থাকে না—।’
এই লোকটার কথা যতই শুনছি ততই সিগারেটের তেষ্টা পাচ্ছে আমার।
‘আমরা কীভাবে সিগারেটের নেশা ছাড়াই সেটা বলার আগে ক্লিনিক কী করে সেটা একটু বলি। ডাক্তাররা প্রায় সকলেই একমত যে, সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। কিন্তু আশ্চর্য, সিগারেটের নেশা ছাড়ানোর ব্যাপারে ডাক্তারদের তেমন উৎসাহ দেখা যায় না। যেসব ডাক্তাররা সিরিয়াসলি ট্রিটমেন্ট করতে চান, তাঁরা কেতাবি ঢঙে পেশেন্টদের সাহায্য করেন। যেমন, পেশেন্টের স্মোক করার হিস্ট্রি জানতে চান। বন্ধুর মতো তাকে বোঝাতে চেষ্টা করেন, সিগারেট খাওয়া কী-কী কারণে স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। সিগারেটের নেশা ছেড়ে দিলে আখেরে কী-কী লাভ হতে পারে সেগুলোর ওপরে জোর দেন। সিগারেট ছাড়ার ব্যাপারে পেশেন্টকে পরামর্শ দেন, তাকে অ্যাসিস্ট করেন। পেশেন্টের সেলফ-হেলপ-এর জন্যে বইপত্তর পড়তে দেন। দরকার হলে ফরমাল ট্রিটমেন্ট প্রোগ্র্যামে পেশেন্টকে ভর্তি করে নেন। সিগারেট ছেড়ে দেবার পর পেশেন্ট যাতে আবার সিগারেট না ধরে তার জন্যে পেশেন্টকে সাহায্য করেন, উৎসাহ দেন। মোট এই সাতটি কেতাবি ধাপ। আমি এর নাম দিয়েছি ”সপ্তপদী”।’
