লোকটা চাপা গলায় আমাকে বলল, ‘আমার সঙ্গে আসুন—।’
অনেকগুলো বন্ধ দরজা পার হয়ে গেলাম আমরা। তারপর করিডরের শেষে ডানদিকে ঘুরেই একটা দরজা সামনে পেলাম। দরজার গায়ে প্লাস্টিকের হরফে ডক্টর তারক হালদারের নাম লেখা। নামের নীচে গোটা তিনেক ডিগ্রি। তার মধ্যে এম. বি. বি. এস.-টাই শুধু আমার চেনা।
দরজায় টোকা দিয়ে সামান্য অপেক্ষা করল লোকটি। কয়েকসেকেন্ড পরেই বেশ মোলায়েম গলায় কেউ বলে উঠল ‘কাম ইন—’
দরজা ঠেলে আমরা দুজন ভেতরে ঢুকলাম।
ছোট অথচ ছিমছামভাবে সাজানো ঘর। এক অদ্ভুত ঠান্ডা নরম স্নিগ্ধ আলো সমানভাবে ছড়িয়ে রয়েছে ঘরের মধ্যে। বেশ বড় মাপের একটা টেবিলের ও-পাশে বসে আছেন ডক্টর হালদার। দোলানো চেয়ারে অল্প-অল্প দুলছেন। সৌম্য চেহারায় আত্মীয়ের ছাপ। ডানহাতে একটা কাগজ।
আমাকে দেখেই হেসে বললেন, ‘আসুন মিস্টার দত্ত, বসুন। আপনার ডেটা শিটটাই দেখছিলাম।’ হাতের কাগজটা সামান্য নাড়লেন তিনি। তারপর আমার সঙ্গের লোকটিকে বললেন, ‘প্রতাপ, তুমি এখন এসো। আমরা একটু প্রাইভেট কথাবার্তা বলব—।’
সঙ্গে-সঙ্গে প্রতাপ চলে গেল ঘর থেকে।
চেয়ারের দুলুনি থামিয়ে উঠে দাঁড়ালেন ডক্টর হালদার। আমি এবার ওঁকে মনোযোগ দিয়ে দেখলাম।
বয়স বড়জোর চল্লিশ-বিয়াল্লিশ হবে। ফরসা। মাথার সামনেটা টাক, তবে পেছন দিকে ঘাড় পর্যন্ত চুল। কপালে কয়েকটা ভাঁজ। তীব্র চোখে চওড়া ফ্রেমের চশমা। নাকের ডগায় একটা আঁচিল। পরনে সাদা অ্যাপ্রন। আর গলায় স্টেথো ঝুলছে।
ঘরের দুটো জানলাই পরদা ঢাকা। এ ছাড়া ডক্টর হালদারের পেছনের দেওয়ালে ছোট মাপের আয়তাকার লম্বা একটা জানলা—তার ওপরেও সবুজ পরদার আড়াল।
ঘরের বাঁদিকের দেওয়ালে বেশ বড়সড় একটা তেলরঙ ছবি। ছবিতে আপাদমস্তক শীর্ণকায় একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। পরনে দামি পোশাক। চোখে খর দৃষ্টি। গাল ভাঙা। এবং হাতে জ্বলন্ত সিগারেট।
আমার গলা খুসখুস করছিল। পকেটে রাখা সিগারেটের প্যাকেটটার ওপরে একবার হাত বুলিয়ে নিলাম। খাঁচায় বন্দি আমার পোষা পাখি।
পায়চারি করতে-করতেই ডক্টর হালদার মোলায়েম আন্তরিক গলায় বললেন, ‘মিস্টার দত্ত, আপনি কি সত্যি-সত্যি সিগারেট ছাড়তে চান?’
আমি ইততস্ত করে একবার ঢোঁক গিলে জবাব দিলাম, ‘হ্যাঁ…ছাড়তেই তো এসেছি।’
‘ভালো কথা—খুব ভালো কথা।’ আমার চোখে সরাসরি তাকিয়ে হাসলেন তারক হালদার। হাতের কাগজটা টেবিলে রাখলেন। চেয়ারের কাছে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে একটা ড্রয়ার খুললেন। তার একটু পরেই একটা টাইপ করা এগ্রিমেন্ট বের করে এগিয়ে দিলেন আমার দিকে।
‘আমাদের ক্লিনিকের কয়েকটা ফরম্যালিটি আছে। এই এগ্রিমেন্টটা পড়ে নিয়ে সই করে দিন, প্লিজ—।’
আমি চট করে চোখ বুলিয়ে নিলাম কাগজটায়। ‘মুক্তি’-র চিকিৎসাপদ্ধতি আমি গোপন রাখব। কোনওভাবেই ক্লিনিকের স্বার্থবিরোধী কাজ করব না। ইত্যাদি-ইত্যাদি।
সুতরাং টেবিল থেকে একটা বলপয়েন্ট পেন তুলে নিয়ে খসখস করে সই করে দিলাম।
ডক্টর হালদার মুখে তৃপ্তির একটা শব্দ করলেন। আমার কাছে এসে কাঁধের পাশ দিয়ে ঝুঁকে পড়ে এগ্রিমেন্টের কাগজটা তুলে নিয়ে চলে গেলেন টেবিলের ও-পাশে। ড্রয়ারে আবার রেখে দিলেন কাগজটা।
হাতে হাত ঘষে শব্দ করে হাত ঝাড়লেন তারক হালদার। হেসে বললেন, ‘মিস্টার দত্ত, এভাবেই রিলেশান তৈরি হয়। এখন থেকে আপনি আমার ক্লোজ ফ্রেন্ড। আসলে যারা স্মোক করে তাদের সবার সঙ্গেই আমি রিলেশান তৈরি করতে চাই।’
টেবিলের ডানপাশে একটা পারসোনাল কম্পিউটার বসানো ছিল। তার সফট হোয়াইট মনিটরে আয়তাকার কারসর দপদপ করে জ্বলছে। ওটার দিকে এগিয়ে যেতে-যেতে ডক্টর হালদার বললেন, ‘আমার কাছে যতগুলো কেস আছে, তার সবকটাই আমি নিজে হ্যান্ডল করি। নেহাত পেরে না-উঠলে আমার অ্যাসিস্ট্যান্টদের সাহায্য চাই…।’
তারক হালদার চেয়ারে বসে পড়লেন। কম্পিউটারের কিবোর্ডের বোতাম টিপতে-টিপতে হাসিমুখে প্রশ্ন করলেন আমাকে: ‘বলতে পারেন, ভারতে প্রতি সেকেন্ডে কটা সিগারেট বিক্রি হয়?’
আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে আন্দাজে ঢিল ছুড়লাম: ‘দুশো?’
শব্দ করে হাসলেন হালদার। কম্পিউটারের পরদায় তাকিয়ে থাকা অবস্থাতেই বললেন, ‘উঁহু, আড়াই হাজারের ওপর। বছরে বিক্রি হয় প্রায় আশি বিলিয়ন সিগারেট।’
সংখ্যাটা আমাকেও নাড়া দিল। কিন্তু গলাটা ভীষণ শুকনো লাগছে। এখান থেকে বেরিয়েই যদি একটা সিগারেট না-ধরাই তা হলে আমি আর বাঁচব না। কেন যে অনুপমের কাছ থেকে কার্ডটা রাখতে গেলাম!
‘মিস্টার দত্ত, সিগারেট খেলে স্বাস্থ্যের অনেকরকম ক্ষতি হয়।’ কম্পিউটারের দিক থেকে সরে এসে আমার মুখোমুখি তাকিয়ে হালদার বললেন, ‘টোব্যাকোতে নিকোটিন আছে তা তো আপনি নিশ্চয়ই জানেন। প্রায় ৪০০ বছর ধরে তামাকের ব্যবহার চলে আসছে। সেই তুলনায় সিগারেট খাওয়ার শখ মাত্র ৯০ কি ১০০ বছরের পুরোনো। আমরা এটা অভ্যেস করেছি সাহেবদের কাছ থেকে।’ তারক হালদার মাথা নাড়লেন: ‘খুব খারাপ অভ্যেস—।’
হায় ভগবান। এরকম জ্ঞান দিয়েই কি ডক্টর হালদার আমাকে সিগারেট ছাড়াবেন?
‘সিগারেটের ধোঁয়াতে, বুঝলেন, মিস্টার দত্ত—চার হাজারেরও বেশি জিনিস রয়েছে, তার মধ্যে কয়েকটা ফারমাকোলজিক্যালি অ্যাকটিভ: অ্যান্টিজেনিক, সাইটোটক্সিক, মিউটাজেনিক আর কারসিনোজেনিক। এগুলো নানাভাবে শরীরের ক্ষতি করে।’
