এরপর ও কথাবার্তা শুরু করলে অফিস নিয়ে। সামনের মাসে ও ম্যানেজার হয়ে যাচ্ছে। এখন দিল্লিতে মিটিং-এ যাচ্ছে রইস ক্লায়েন্ট বাগাতে।
ম্যানেজার হওয়ার খবর শুনে আমি ওকে আগাম অভিনন্দন জানালাম। তারপর বললাম আমার অফিসের ঝামেলার কথা, বাড়ির অশান্তির কথা, শরীরের নানা সমস্যার কথা।
অনুপম হেসে চোখ মারল আমাকে: ‘মুক্তি!’
প্লেন ছাড়ার সময় হয়ে গিয়েছিল। আমি ‘পরে আবার দেখা হবে’ বলে স্মোকিং জোনে নিজের সিটে ফিরে গেলাম।
মাসখানেক পর একদিন দুপুরবেলা একটা ফারনেস ডিজাইনের কাজ নিয়ে ওয়েসম্যান ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে গেছি। কাজের শেষে অফিসের গাড়ি নিয়ে লালা লাজপত রাই সরণি, মানে, এলগিন রোড দিয়ে ফিরছিলাম। হঠাৎই সাত নম্বর বাড়িটা চোখে পড়ল।
দু-আঙুলের ফাঁকে যথারীতি সিগারেট জ্বলছিল। কী কারণে জানি না, গলা খুসখুস করে উঠে কাশি হল কয়েকবার। আর ঠিক তখনও কোনও শয়তানি দাবার চালে সাত নম্বর বাড়িটা দেখতে পেলাম। একইসঙ্গে ‘মুক্তি’ লেখা ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে বোর্ডটাও চোখে পড়েছিল আর অনুপমের কথাগুলো মনে পড়ে গিয়েছিল।
অফিসের গাড়ি ছেড়ে দিয়ে আমি নেমে পড়লাম রাস্তায়। কটকটে রোদ্দুরে পা ফেলে এগিয়ে গেলাম ‘মুক্তি’র দিকে। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে অনুপমের দেওয়া ভিজিটিং কার্ডটা একবার দেখে নিলাম।
ঝকঝকে শৌখিন তিনতলা বাড়িটার রং সাদা। বাড়ির ঠিক সামনে ফুটপাথের ওপরে একটা অশ্বত্থ গাছ। গাছতলায় এক টিয়াপাখি-জ্যোতিষী বসে ঝিমোচ্ছে।
বাড়িটার বাইরের দেওয়ালে অন্তত গোটা পাঁচেক কোম্পানির সাইনবোর্ড। দরজায় উর্দিপরা দারোয়ান। তাকে জিগ্যেস করে জেনে নিলাম, ‘মুক্তি’ দোতলায়। কিন্তু ভিতরে ঢোকার আগে কী ভেবে হাতের সিগারেটটা রাস্তায় ফেলে দিলাম।
লিফট নেই। তবে আধুনিক চওড়া অথচ খাটো উচ্চতার সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে কোনও কষ্ট হল না। সামনেই বড় কাচের দরজা। কাচের ওপরে লাল রং দিয়ে ভিজিটিং কার্ডের কথাগুলোই লেখা। দরজার নবে সোনালি শিকলিতে একটা প্লাস্টিকের বোর্ড ঝুলছে। তাতে লেখা: OPEN।
কাচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলাম। ভিতরটা শীততাপ নিয়ন্ত্রিত, সাজানো-গোছানো, সুন্দর। দেওয়ালে ক্রিম রঙের ডিসটেম্পার। হঠাৎ করে থ্রি স্টার হোটেলের রিসেপশান বলে ভুল হয়। ডানদিকে দেওয়াল ঘেঁষে বাদামি ভেলভেটে মোড়া সোফা সেট। তার সামনে পালিশ করা মেহগনি কাঠের টেবিলে কারুকাজ করা পিতলের ফুলদানি আর ম্যাগাজিন। দুজন মাঝবয়েসি ভদ্রলোক ব্যাজার মুখে সোফায় বসে আছে। কে জানে, আমারই মতো বৈরাগী হতে এসেছে কি না!
নীল রঙের ল্যামিনেটেড প্লাস্টিকে মোড়া রিসেপশান কাউন্টারে সালোয়ার কামিজ পরা একটি সুন্দরী মেয়ে বসে ছিল। সামনে রাখা পারসোনাল কম্পিউটারের কিবোর্ডে ওর নেলপালিশ রাঙানো সরু আঙুল দ্রুত নড়াচড়া করছে।
আমাকে দেখে আঙুল থামাল মেয়েটি। কম্পিউটারের পরদা থেকে চোখ সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে অল্প হাসল। ওর গভীর দৃষ্টিতে প্রশ্ন।
আমি একটু ইতস্তত করে ওর কাছে এগিয়ে গেলাম। গোলাপি আর কালোয় ছাপা সালোয়ার-কামিজে বেশ মানিয়েছে ওকে।
পকেট হাতড়ে মানিব্যাগ বের করে তার ভেতর থেকে ভিজিটিং কার্ডটা বের করলাম। সেটা তরুণীর সামনে এগিয়ে দিয়ে বললাম, ‘এটা এক বন্ধু আমাকে দিয়েছিল। ও এখান থেকে ট্রিটমেন্ট করিয়েছে…।’
মেয়েটি হাসল, বলল ‘আমাদের ক্লায়েন্টরা আমাদের কখনও ভোলে না। আপনার নাম?’
‘রাজীব দত্ত।’
কম্পিউটারের কিবোর্ডের ওপরে মেয়েটির হাত চলতে শুরু করল আবার।
‘ঠিকানা?’
‘থ্রি বাই ফোর গৌরীবাড়ি লেন, ক্যালকাটা ফোর।’
‘আপনি কি ম্যারেড, মিস্টার দত্ত?’
‘হ্যাঁ—’ কিন্তু বিয়ের সঙ্গে সিগারেটের সম্পর্ক কী!
‘ওয়াইফের নাম?’
‘মৌসুমী দত্ত।’
‘ছেলেমেয়ে?’
‘একটি ছেলে—’
‘নাম?’
একটু বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘তাপস দত্ত।’
‘আমাদের কোম্পানির কথা আপনাকে কে বলেছে, মিস্টার দত্ত?’
‘আমার এক পুরোনো বন্ধু—অনুপম মুখার্জি।’
কিবোর্ডের ওপরে মেয়েটির আঙুল পেশাদারি ভঙ্গিতে চলতেই লাগল। একটু পরে ও কী একটা বোতাম টিপতেই পাশে রাখা ডট ম্যাট্রিক্স প্রিন্টারে একটা ফ্যানফোল্ড পেপার ছাপা হয়ে বেরিয়ে এল। সেটা হাতে নিয়ে মেয়েটি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সোফার দিকে আঙুল দেখিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল, ‘একটু ওয়েট করুন, মিস্টার দত্ত। আমি দেখছি যাতে আপনাকে বেশিক্ষণ বসতে না হয়।’
মেয়েটি স্বচ্ছন্দ পা ফেলে একটা কাচের দরজা ঠেলে মসৃণ করিডর ধরে চলে গেল ভেতরে। আর আমি দোনামনা পায়ে এগিয়ে লম্বা সোফায় একপ্রান্তে গা এলিয়ে বসে পড়লাম। পকেট থেকে সিগারেট বের করতে গিয়ে লক্ষ করলাম, টেবিলে কোনও অ্যাশট্রে নেই। এটাই কি ডক্টর হালদারের ট্রিটমেন্টের প্রথম ধাপ? সুতরাং সিগারেটের মায়া ছেড়ে টেবিল থেকে একটা ‘সানডে’ ম্যাগাজিন তুলে নিয়ে চোখ বোলাতে লাগলাম। আড়চোখে দেখলাম, সোফায় বসা অন্য দুজন ভদ্রলোক বেশ উসখুস করছে।
ঠিক তখনই মিষ্টি গলা কানে এল ‘মিস্টার দত্ত, আপনি ভিতরে যান—।’
রিসেপশানের সুন্দরী ফিরে এসেছে।
ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমি ভেতরে যাওয়ার দরজা ঠেলে করিডরে পা রাখলাম।
এবার কোনদিকে যাব? এ-কথা ভাবামাত্রই কোথা থেকে একজন স্বাস্থ্যবান লোক এসে হাজির হল আমার পাশে। তার পরনে জিনস, আর নীল টি-শার্ট। টি-শার্টে লেখা: ‘CIGARETTE SMOKING IS INJURIOUS TO HEALTH’। লেখাটার ঠিক নীচেই একটা নরকরোটির ছবি। সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে।
