এমনসময় আমাদের ফ্লাইটের অ্যানাউন্সমেন্ট হল। ক্লোজড সার্কিট টিভিতে ভেসে উঠল নির্দেশ। আধ-খাওয়া সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে ফেলে দিলাম। অনুপম ওর ব্রিফকেসটা তুলে নিয়ে বলল, ‘চল, যেতে-যেতে বলছি—।’
রানওয়ের খোলা জায়গায় বেরোতেই বোঝা গেল শীত এখনও পুরোপুরি যায়নি। তার থাবায় আঁচড় কাটার মতো এখনও কয়েকটা নখ রয়ে গেছে। সূর্য বেশ খানিকটা ওপরে উঠে যাওয়ায় কুয়াশা ফিকে হয়ে এসেছে। প্যাসেঞ্জার কারে করে প্লেনের দিকে যাওয়ার সময় হুহু বাতাসে আমার বেশ শীত করে উঠল।
অনুপম সিট নিয়েছে নন-স্মোকিং জোনে। আর আমি যথারীতি ধোঁয়াটে অঞ্চলে। কিন্তু ওর গল্পের টান আমাকে যেন বঁড়শিতে গেঁথে ফেলেছিল। তাই ওর পাশেই একটা ফাঁকা সিট দেখে বসে পড়লাম। গল্পের শেষটুকু শোনা হয়ে গেলে স্মোকিং জোনে ফিরে যাওয়া যাবে।
লুকোনো স্পিকারে আলতোভাবে সেতারের সুর বাজছিল। মাথার ওপরে লাগেজ ক্যাবিনেটে হাতব্যাগ রেখে যাত্রীরা যে-যার সিট খুঁজে নিতে ব্যস্ত। আজকের ফ্লাইটে ভিড় খুব বেশি নেই।
অনুপমের পাশে গুছিয়েবসে বললাম, ‘তারপর কী হল বল—।’
‘হ্যাঁ, যা বলছিলাম। একদিন আমার এক বন্ধু—কোম্পানির মিটিং করতে গিয়ে আলাপ, নাম বললে তুই চিনবি না—সে আমাকে একটা কার্ড দিল। এলগিন রোডের একটা কোম্পানি, তারা নাকি সিগারেট ছাড়ানোর ব্যাপারে স্পেশালিস্ট। তো আমি সেখানে গেলাম। ভাবখানা ছিল, গিয়েই দেখি না কী হয়। বিশ্বাস কর, তারপর থেকে আমি আর সিগারেট ছুঁইনি।’
আমি অবিশ্বাসের গলায় বললাম, ‘কী করে ওরা তোর নেশা ছাড়াল? কোনও ওষুধ-টষুধ দিয়েছিল?’
‘না, না, ও সব কিচ্ছু না—’ পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে তার ভেতরে কী খুঁজতে লাগল অনুপম, আর বিড়বিড় করে বলতে লাগল, ‘দু-চারটে কার্ড আমার কাছে ছিল। ওরা বলেছিল বন্ধুবান্ধবদের দরকার পড়লে দেবেন। কোথায় গেল?…এই তো!’
মানিব্যাগ থেকে একটা সাদামাটা ভিজিটিং কার্ড বের করে আমার হাতে দিল অনুপম।
Dr. Tarak Halder
Anti-smoking specialist
‘Mukti’
7. LALA LAJPAT RAI SARANI
CALCUTTA-700020
Phone 475-2137
‘জানিস তো, এলগিন রোডের নতুন নাম লাল লাজপত রাই সরণি। কার্ডটা ইচ্ছে হলে তুই রাখতে পারিস, রাজীব। ওরা তোর সিগারেটের নেশা একদম ছাড়িয়ে দেবে। পাক্কা গ্যারান্টি। ”মুক্তি” নাম ওদের সার্থক।’
‘কী করে ছাড়াবে বল তো!’ কার্ডটা আমি পকেটে রেখে দিলাম।
‘সেটা বলতে পারব না।’
‘বলতে পারবি না? তার মানে?’
‘ওদের ওখানে একটা এগ্রিমেন্ট আমাকে সই করতে হয়েছে। তাতে লেখা আছে, ওসব কথা কাউকে বলা যাবে না। তবে তোর চিন্তা নেই। প্রথমদিন ইন্টারভিউর সময় ডক্টর হালদার তোকে সব বলে দেবেন।’
‘তোকে এগ্রিমেন্ট সই করতে হয়েছে?’ আমি অবাক হলাম।
‘হ্যাঁ—।’
‘আর সেজন্যে তুই সিগারেট ছেড়ে দিয়েছিস?’
‘তা বলতে পারিস।’ অনুপম একটু হাসল।
আমি একটু জেদ করেই বললাম, ‘বাদ দে তোর এগ্রিমেন্ট! আমাকে ব্যাপারটা একটু খুলে বল দেখি—কে আর জানতে পারবে!’
অনুপম কাচের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল। বোঝা যাচ্ছিল, এ-নিয়ে ও আর বেশি আলোচনা করতে চায় না। আমার কথায় মুখ ফেরাল, বলল, ‘না রে, বলা যাবে না। দেখবি, এগ্রিমেন্ট সই করার পর তুইও ওসব কথা কাউকে বলতে পারবি না।’
‘আচ্ছা ডক্টর হালদার যদি সত্যি করেই সিগারেট ছাড়ানোর স্পেশালিস্ট হন তা হলে এত লুকোচুরি কীসের? তা ছাড়া সিনেমায় বা টিভিতে ”মুক্তি”র বিজ্ঞাপনও তো দেখিনি!’
অনুপম হাসল: ‘ডক্টর হালদারের কোনও বিজ্ঞাপন লাগে না। হুইসপারিং ক্যামপেইনেই ওরা গাদা-গাদা ক্লায়েন্ট পেয়ে যায়। আর পাবে না-ই-বা কেন! ওঁর কোম্পানির সাকসেস রেট নাইনটি এইট পারসেন্ট।’
‘তুই নিজে অ্যাড লাইনের লোক হয়ে এ-কথা বলছিস!’
অনুপম শুধু মুচকি হাসল।
আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে জিগ্যেস করলাম, ‘ওরা কি হাত-পা বেঁধে একটার-পর-একটা সিগারেট খাওয়াতে থাকে, যতক্ষণ না সিগারেট দেখলেই বমি পায়?
অনুপম মাথা নাড়ল ‘না।’
‘এমন কোনও ওষুধ খাওয়ায় যাতে সিগারেট ধরালেই শরীর খারাপ লাগে?’
‘না—।’
‘সিগারেটের মতো দেখতে কোনও হালকা নেশার লজেন্স ধরিয়ে দেয়? পরে সেই লজেন্সের বদলে আরও হালকা কোনও লজেন্স ধরায়, তারপর…’
‘না, তাও নয়।’ এবার মজা পেয়ে চওড়া হাসল অনুপম, বলল, ‘তুই নিজে গিয়েই দেখ না—তোর কি সিগারেট খেতে সত্যি খুব ভালো লাগে, বল?’
না, সিগারেট খেতে সত্যি যে আমার খুব ভালো লাগে তা নয়। কিন্তু এত পুরোনো একটা অভ্যেস—হাতে সিগারেট না থাকলেই মনে হয় কি যেন নেই।
অনুপম বেশ খুঁটিয়ে আমাকে দেখছিল। নরম গলায় বলল, ‘ডক্টর হালদার আমার জীবনটা একেবারে বদলে দিয়েছেন। নিজেই বুঝতে পারি, আমার শরীর-স্বাস্থ্য আগের চেয়ে কত ভালো হয়েছে। রোহিণীর সঙ্গে রিলেশানও বেটার হয়েছে। বেশ আছি রে। ট্রাই করে দেখ, এই মানুষটা তোর জীবন একেবারে বদলে দেবে। প্রমিস—।’
‘কিন্তু তুই তো আমাকে বেশ ঝামেলায় ফেললি। আমার যে ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে, কী করে…।’
‘সরি, রাজীব, আমাকে রিকোয়েস্ট করিস না। এসব ব্যাপারে নিজে সরাসরি জেনে নেওয়াটাই ভালো।’
অনুপমের সিরিয়াস মুখ আমাকে বলে দিল আমি কানাগলি দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করছি।
