না, আগে আমার এমনটা মনে হত না। সবকিছুর মূলে ওই তারক হালদার—এক অদ্ভুত বিচিত্র মানুষ। তিনি আমাকে স্পষ্ট করে এটাও বুঝিয়ে দিয়েছেন, সিগারেট খাওয়া কেন স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে লেখা ওই বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণের আসল অর্থই-বা কী।
তারক হালদারের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল অনুপম। না, সরাসরি ঠিক পরিচয় করিয়ে দেয়নি। তারক হালদারের একটা ভিজিটিং কার্ড ও আমাকে দিয়েছিল। বলেছিল, ‘ট্রাই করে দেখ, এই মানুষটা তোর জীবন একেবারে বদলে দেবে। প্রমিস—।’
অনুপমের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে গিয়েছিল এয়ারপোর্টে। অফিসের মিটিং-এ দিল্লি যাব বলে ডিপারচার লাউঞ্জে বসে আছি। কাচের দেওয়ালের বাইরে ভোরের সকাল। রানওয়ের ওপরে কুয়াশা জমে আছে। তারই মাঝে দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে এয়ারবাস। আমাদের দিল্লি নিয়ে যাবে। আমি আনমনাভাবে বসে মৌসুমীর কথা ভাবছিলাম। আর ভাবছিলাম ছেলে তাপসের কথা।
অফিসের কাজে মাসের মধ্যে ছ-সাতবার কলকাতা-দিল্লি করা নিয়ে কাল রাতেও একটু-আধটু ঝগড়া হয়েছে মৌসুমীর সঙ্গে। এমনিতে যে-কোনও ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া করাটা মৌসুমীর বেশ পছন্দের। তার ওপর গতকালের বিষয় ছিল ‘তাপসের পড়াশোনার ক্ষতি ও পিতার নির্লিপ্ত অবহেলা।’ যথেষ্ট গুরুতর বিষয়। সুতরাং আলোচনা বেশ ভালোরকম তাপমাত্রায় পৌঁছেছিল। আমি সাধারণত যাকে ‘ঝগড়া’ বলি, মৌসুমী তাকেই বলে ‘আলোচনা’।
মোল্ডেড প্লাস্টিকের চেয়ারে আরাম করে বসে সেই ‘আলোচনা’র অ্যাকশান রিপ্লে করছিলাম মনের পরদায়, অঅর ডানহাতের দু-আঙুলের ফাঁকে সিগারেট পুড়ছিল। এমন সময় আমার পাশে এসে কেউ বসল। আলতো চাপড় মারল কাঁধে: ‘কীরে, কেমন আছিস?’
তাকিয়ে দেখি অনুপম। ফিটফাট ঝকঝকে চেহারা। এই পঞ্চাশ ছুঁই-ছুঁই বয়েসেও স্বাস্থ্য রেখেছে দারুণ। গত বছরেও ওর চোখে চশমা ছিল। এখন বোধহয় কনট্যাক্ট লেন্স নিয়েছে। ওর মধ্যে আমি ছাত্রজীবনের অনুপম মুখার্জিকে দেখতে পাচ্ছিলাম। ও ‘ফর্টি প্লাস’ নামে কোনও ট্যাবলেট খাচ্ছে নাকি?
অনুপম ছাত্রজীবনে আমার পাড়ার কাছাকাছি থাকত। দুজন দু-কলেজে পড়লেও ফাইনাল পরীক্ষার আগে আমরা একসঙ্গে পড়াশোনাও করেছি। পরে পাশটাশ করে ও ‘সেঞ্চুরি পাবলিসিটি’ নামের একটা অ্যাড এজেন্সিতে চাকরি নেয়। এখন ‘অ্যাডফোকস’ অ্যাড এজেন্সিতে ডেপুটি ম্যানেজার। আর আমি আছি ‘ফোর স্কোয়্যার কনসালট্যান্টস’-এ।
চাকরি পাওয়ার কিছুদিন পরেই অনুপম বিয়ে করে বেলেঘাটার দিকে কোথায় যেন ফ্ল্যাট কিনে চলে যায়। তারপর থেকে ওর সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ প্রায় হতই না। হঠাৎ করে বছরদশেক ধরে ওর সঙ্গে আমার এয়ারপোর্টেই বলতে গেলে দেখা হয়। কোম্পানির কাজে ও দিল্লি-বম্বে-মাদ্রাজ করে বেড়ায়। আর আমিও তাই। সুতরাং এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে অথবা প্লেনে বসেই আমাদের সুখ-দুঃখের গল্প হয়। তা ছাড়া দিল্লি-বম্বে-মাদ্রাজে মিটিং-এর পর হাতে সময় থাকলে আমরা আড্ডা মারতে বসি হোটেলে-রেস্তরাঁয় বা কোম্পানির গেস্ট হাউসে।
অনুপমের সঙ্গে একবছর আগে আমার দেখা হয়েছিল দিল্লি এয়ারপোর্টে। দুজনে একসঙ্গে কলকাতা ফিরেছিলাম।
আমি ওর দিকে সিগারেট এগিয়ে দিয়ে বললাম, ‘তুই তো দেখছি বিশবছর বয়েস কমিয়ে ফেলেছিস!’
ও হাত নেড়ে বলল, ‘আমি সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি—।’
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
ছাত্রজীবন থেকে যে অনুপম মুখার্জি চেইন স্মোকার, যে চেইন রিঅ্যাকশন ঘটিয়ে আরও অন্তত একশোজন চেইন স্মোকারের জন্ম দিয়েছে, গত বছর দিল্লিতেও যে চেইন স্মোকার ছিল, সেই অনুপম মুখার্জি সিগারেট ছেড়ে দিয়েছে!
আমিও চেইন স্মোকার হয়েছি অনুপমের হাতে পড়ে। সুতরাং হেসে বললাম, ‘শোন, যারা তোর-আমার মতো চেইন স্মোকার তারা যদি মাঝে-মাঝে প্রতিজ্ঞা করে পাঁচ-সাতদিনের জন্যে সিগারেট না-ছাড়ল তবে আবার চেইন স্মোকার কীসের!’ ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে চাপা গলায় বললাম, ‘রোহিণীকে ছুয়ে দিব্যি করেছিস না কি?’
রোহিণী ওর বউয়ের নাম। মৌসুমীকে ছুঁয়ে দিব্যি কেটে আমিও সাত-আটবার সিগারেট ছেড়েছি। তবে প্রত্যেকবারই ওই দিব্যির এফেক্ট সাত-আটদিনের বেশি স্থায়ী হয়নি।
আমার ঠাট্টায় অনুপম হাসল না। বরং বেশ সিরিয়াস মুখ করে বলল, ‘নারে, আমি সত্যি-সত্যি সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি।’
আমি একটু হকচকিয়ে গেলেও ঠাট্টার সুরটা বজায় রেখে বললাম, ‘হঠাৎ এরকম সাধু মতলবের কারণটা জানতে পারি?’ হাতের সিগারেট ছোট হয়ে গিয়েছিল। সেটা ফেলে দিয়ে নতুন একটা ধরালাম।
অনুপমের ফরসা মুখে সতেজ ছোঁয়া লাগল। অস্বস্তির ভাবটা ঝেড়ে ফেলে ও বলল, ‘প্রথম-প্রথম বেশ কাশি হত, বুঝলি। তো ডাক্তার দেখলাম। তার তো একটাই প্রেসক্রিপশান: সিগারেট জীবনের মতো ছাড়তে হবে। কিন্তু তুই তো জানিস, আমার যে-রকম চেইন স্মোকিং-এর অভ্যেস—ছাড়ব বললেই কি আর ছাড়া যায়! রোহিণীও সিগারেট ছেড়ে দেওয়ার জন্যে ঘ্যানঘ্যান করত। শেষকালে একেবারে বিরক্ত হয়ে ছেড়েই দিলাম। কিন্তু সিগারেট কি আর অত সহজে আমাকে ছাড়তে চায়! দিনে পাঁচ-ছ’ প্যাকেটের জায়গায় দু-তিনটে করে লুকিয়ে-চুরিয়ে খেতে লাগলাম। তো কাশিটা লেগেই রইল। বেশ বুঝতে পারছিলাম, এভাবে কিছু হবে না, কিন্তু কী করব! তারপর একদিন…।’
