একমিনিট…দু-মিনিট…।
সুকান্ত বুঝল, দেওয়ালের গায়ে মই লাগিয়ে, নিজেকে তৈরি করে, ওপরে উঠতে শুরু করেছে লোকটা। একটু করেই চৌকো কাঠের ফোকরে ভেতরে জেগে উঠল কালো মাথাটা। জ্বলজ্বলে চোখজোড়া নিঃশ্ছিদ্র অন্ধকারের মাঝে ওকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
লোকটা তার জ্বলন্ত লাইটার-ধরা হাতটা তুলে ধরতে গেল। আর সেইমুহূর্তেই এক অমানুষিক শক্তি সুকান্তর শরীরে ভর করল। হামানদিস্তের মোটা লোহার রডটা নিয়ে দু-হাতে সর্বশক্তি দিয়ে ও লোকটার মাথায় আঘাত করল। একবার, দুবার…।
ধীরে-ধীরে মইয়ের গা থেকে ঢলে পড়তে লাগল লোকটা। মইটা কাত হয়ে গিয়ে ঠেকল দেওয়ালের কোণে, আর শানবাঁধানো মেঝেতে সশব্দে আছড়ে পড়ল লোকটার শরীর। জ্বলন্ত লাইটারটা নিভে গিয়ে কোথায় যেন ঠিকরে পড়ল।
কুঠরি-ঘরের ফোকর দিয়ে টর্চের আলোয় সুকান্ত দেখল, ঠিক নীচেই শ্লথ ভঙ্গিতে পড়ে রয়েছে লোকটা।
টর্চটাকে জ্বলন্ত অবস্থায় পাশে নামিয়ে রেখে দু-হাতে গোটা হামানদিস্তেটা তুলে ধরল ও। তারপর, গুলি খেলার সময় যেরকম ‘নাক্কু’ করে, সেরকম ভঙ্গিতে লোকটার মাথা লক্ষ্য করে ছুড়ে দিল হামানদিস্তেটা।
লোকটার মাথার সঙ্গে পাঁচ কেজি ওজনের লোহার সংঘর্ষের শব্দটা তেমন জোরদার হল না। ‘ফট’ করে একটা শব্দ হল শুধু।
জ্বলন্ত টর্চটা হাতে নিয়ে একটা পা আলমারির গায়ে দিয়ে, অন্য পা-টা হেলে যাওয়া মইটার গায়ে রেখে অতিকষ্টে মেঝেতে নেমে এল সুকান্ত। টর্চের আলোয় দেখল, লোকটার কালো পোশাকের সঙ্গে রক্তাক্ত মুখটা নিতান্তই বেমানান লাগছে। হামানদিস্তের দুটো অংশ দু-পাশে পড়ে রয়েছে।
অত্যন্ত গম্ভীরভাবে সুকান্ত লোকটার শরীর ডিঙিয়ে হামানদিস্তের রডটা তুলে নিল। তারপর কী ভেবে নিভিয়ে দিল টর্চটা। এবং লোকটার মাথা আন্দাজ করে রড দিয়ে পাগলের মতো আঘাত করে চলল—একবার, দুবার…।
জ্ঞানশূন্য মিনিটপাঁচেকের পর থামল সুকান্ত। রডটা নামিয়ে রেখে টর্চটা জ্বালাল। তারপর জ্বলন্ত টর্চটা মেঝেতে নামিয়ে রেখে দু-হাতে চেপে ধরল লোকটার পা দুটো। অনেক কসরৎ করে পা দুটোকে টেনে নিয়ে এল ভাঁড়ার ঘরের দরজার বাইরে। এবার শরীরের সমস্ত ক্ষমতা একজোট করে লোকটাকে টেনে নিয়ে এল বসবার ঘরে। সেখানে তাকে শুইয়ে রেখে ও ভাঁড়ার ঘরে আবার ঢুকল। পড়ে থাকা টর্চের আলোয় দেখতে পেল লাইটারটা। লাইটার ও টর্চটা তুলে নিয়ে ফিরে এল বসবার ঘরে। লাইটারটা পকেটে রেখে শোওয়ার ঘরের দরজায় বাঁধা রেশমি দড়িটা খুলতে চেষ্টা করল। কিছুক্ষণের চেষ্টায় নিরাশ হয়ে ও লোকটার শুয়ে থাকা শরীরের পকেট হাতড়ে ছুরিটা বের করল। চাবি টিপতেই ফলাটা লাফ দিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। এরপর শোওয়ার ঘরের দরজা খোলা কয়েকসেকেন্ডের কাজ। সুতরাং…।
বাবার শরীর এবং মাথাকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আবিষ্কার করেও বিচলিত হল না সুকান্ত। কারণ, ইতিমধ্যেই ও সবরকম ভাব এবং আবেগ নিঃশেষে খরচ করে বসে আছে। শুধু শ্লথ পায়ে ও ফিরে এল বসবার ঘরে। আধঘণ্টার চেষ্টায় অনেক শব্দ করে ও সরিয়ে ফেলল সোফাসেটগুলো। তারপর ভাঙা দরজা পেরিয়ে টর্চ জ্বেলে রওনা হল তিনতলার দিকে। এখন ও খুঁজতে চলেছে পিসিকে।
তিনতলা, দোতলা, একতলায় খোঁজ করেও পিসিকে পেল না ও। তাই ফিরে এল বসবার ঘরে। কালো-পোশাকি লোকটার গায়ে টর্চের আলো ফেলে কী চিন্তা করল। তারপর ফিরে চলল খাওয়ার ঘরে দিকে।
বারান্দার বাঁ-কোণে খাওয়ার ঘরের দরজার ঠিক মুখেই থাকে কেরোসিন তেলের টিনটা। সেটাকে একহাতে নিয়ে অন্য হাতে টর্চ জ্বেলে বসবার ঘরে ফিরে এল ও। টর্চটাকে জ্বলন্ত অবস্থায় একটা সোফার ওপরে রেখে কেরোসিন তেলের টিনটা লোকটার গায়ে উপুড় করে দিল।
একটু পরে খালি টিনটা একপাশে ছুড়ে ফেলল। পকেট থেকে লাইটারটা বের করে জ্বালল। আগুন ধরিয়ে দিল কালো পোশাকে। তারপর লাইটার ফেলে দিয়ে বেরিয়ে এল বসবার ঘর থেকে। আগুনের শিখা তখন লোকটার শরীরকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে।
অন্ধকারেই সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করল সুকান্ত।
সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে অন্ধকার অফিস-ঘরের সামনে একমুহূর্ত দাঁড়াল ও। তারপর এগিয়ে চলল সদর দরজার দিকে। অন্ধকার থাকলেও এবারে অবিনাশের মৃতদেহে হোঁচট খেল না ও। পা যথাসম্ভব উঁচু করে দরজার ছিটকিনিটা খুলে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল। তারপর মেঠো পথ ধরে দিগভ্রান্তের মতো হাঁটতে শুরু করল।
অস্থির কলঙ্করেখা
বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর
গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আদমের পাঁজর থেকে ঈশ্বর সৃষ্টি করেছিলেন প্রথম রমণী—ইভ। আর সেইমুহূর্ত থেকেই বোধহয় বক্ররেখার বাঁকা অর্থ জন্ম নিয়েছিল। সুতরাং ধোঁয়ার আঁকাবাঁকা রেখায় যদি আমি নগ্ন তরুণীর লাস্য খুঁজে পাই, তা হলে সে আমার দোষ নয়। তা ছাড়া তারক হালদার সবিস্তারে আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সবকিছু। সেইদিন থেকেই ধোঁয়া দেখলে আমি ভয় পাই। বিশেষ করে সিগারেটের ধোঁয়া।
সিগারেটের অগ্নিবিন্দু থেকে সাদা ধোঁয়ার রেখা যখন সাবলীল ভঙ্গিতে শূন্যে ভেসে যায়, তখন মনে হয় কোনও নর্তকী যেন তার বুক-কোমর-নিতম্ব হেলিয়ে দুলিয়ে বাঁকিয়ে-চুরিয়ে ছলাকলা বিস্তার করছে শূন্যে। অন্যায় কলঙ্কের রেখা এঁকে যাচ্ছে আপনমনে।
