‘তা—তার মানে?’ চোখ থেকে সরু ফ্রেমের চশমাটা নামিয়ে উৎসুকভাবে তাকালেন বিলাস যোশি: ‘না, নামটাতো ঠিক মনে পড়ছে না। সেনবর্মা? উঁহু, এ নামে কাউকে তো চিনি না।’
‘তাই নাকি?’ হাতের লাঠিটা বগলে পাচার করে পকেটে হাত ঢোকালাম। একটা মুখ ছেঁড়া সাদা খাম বের করে তার ভেতর থেকে একটা কাগজ বের করলাম। কাগজটা একপলক দেখে ছুড়ে দিলাম টেবিলের ওপরে।
‘দেখুন—এবার হয়তো মনে পড়বে।’
বিলাস যোশি চশমাটা নাকে লাগিয়ে তড়িঘড়ি আবার চেয়ারে বসলেন। হাতে নিলেন কাগজটা। কঠিন দৃষ্টিতে একবার আমার দিকে তাকিয়ে সশব্দে নাক টানলেন।
‘হুম—’ কাগজটা গভীরভাবে দেখতে লাগলেন তিনি: ‘এটা দেখছি একটা বিল।…আপনি হয়তো জানেন না, মিস্টার সেনবর্মা, আমি সাধারণত পোস্টেই খদ্দেরদের বইপত্তর পাঠিয়ে থাকি। তাদের অনেকের সঙ্গে আমার সামনাসামনি কোনও আলাপ নেই। তাই—’ বিলের ওপর লেখা নামটা তিনি বিড়বিড় করে পড়লেন, ‘প্রফেসর সুরপতি সেনবর্মা। ছয়ের তিন, গোলক মিত্র রোড। কলকাতা বারো। হ্যাঁ, এবার মনে পড়েছে—।’
‘তা পড়বারই কথা। স্বর্গীয় ডক্টর সুরপতি সেনবর্মা আমার বড় ভাই ছিলেন। তিনি—মারা গেছেন।’
‘ডক্টর সেনবর্মা মারা গেছেন?’ ভীষণ অবাক হওয়ার ভান করল বিলাস যোশি ‘সেইজন্যেই বোধহয় শেষ কয়েকটা চিঠির জবাব পাইনি। কিন্তু আপনারা তো আমাকে তাঁর মারা যাওয়ার খবরটা অন্তত জানাতে পারতেন…।’
‘পারতাম, কিন্তু ইচ্ছে করেই জানাইনি।’ রূঢ় স্বরে জবাব দিলাম, ‘কারণ আপনি হয়তো ভুল করে এই বিলটা পাঠিয়েছেন। আমার দাদা কোনওদিন এ ধরনের বইয়ের জন্যে অর্ডার পাঠাননি, আর কেনেনওনি। তা ছাড়া তাঁর লাইব্রেরি ঘেঁটেও আমরা এসব বইয়ের একটা কপিও খুঁজে পাইনি।’
বিলে লেখা বইয়ের লম্বা লিস্টটার ওপরে চোখ চালিয়ে বিলাস যোশি ‘হুম’ করে একটা শব্দ করলেন। তারপর অস্বস্তিতে কাশলেন বারকয়েক: ‘মিস্টার সেনবর্মা, বইগুলো আমি সত্যিই পাঠিয়েছি। সুরপতিবাবু বইগুলো পেয়েছেন জানিয়ে আমাকে চিঠিও দেন। কিন্তু দামটা পেতে দেরি হওয়ায় আমি বেশ কয়েকটা রিমাইন্ডার তাঁকে দিই। অথচ কোনও রিপ্লাই পাইনি। তাই এই লাস্ট চিঠিটায় আমি রিমাইন্ডার বলে ভয় দেখিয়ে বিলটা পাঠিয়েছি—মাত্র সাতশো টাকার।’
এবার ‘হুম’ শব্দটা বলার পালা আমার।
আমাকে বিলাস যোশি বলতে লাগলেন, ‘দাঁড়ান, আমি খাতা-পত্র দেখে আপনাকে কারেন্ট পজিশানটা জানাচ্ছি।’ পাশের শেলফ থেকে একটা মোটা বিধ্বস্ত ফাইল বের করলেন তিনি:’সেনবর্মা—কিউ, আর, এস—এই তো!’
‘অতসব ফাইল ঘাঁটাঘাঁটির কোনও দরকার নেই।’ ঠান্ডা গলায় বিলাস যোশির উৎসাহে ঠান্ডা জল ঢেলে দিলাম, বললাম, ‘আপনার কোথাও একটা ভুল হয়েছে। আর ভুলটা একটু পিকিউলিয়ারও বটে। সুতরাং, ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ভুল আর না হয়, সে বিষয়ে আমি আপনাকে ওয়ার্নিং দিচ্ছি। যদি আপনি এই ছবির বইয়ের নোংরা ব্যাবসা চালিয়ে যেতে চান, চালিয়ে যান—আমি বাধা দেব না। কিন্তু তাই বলে—।’
বিলাস যোশি বারকয়েক মাথা নাড়লেন, হেলান দিয়ে বসলেন চেয়ারে: ‘মিস্টার সেনবর্মা, আপনার কথার ওপরে কথা বলা ঠিক নয়। তা ছাড়া খদ্দের হল গিয়ে লক্ষ্মী। কোনও খদ্দেরের পছন্দ নিয়ে সমালোচনা করা আমার কাজ নয়। তা হলে আমাকে বইয়ের দোকান তুলে দিয়ে তেলেভাজার দোকান দিতে হয়। সে যাক, আমি শুধু এটুকু জানি, এই ঠিকানা থেকে…’ আঙুল দিয়ে বিলটার ওপর ঠোকর মারলেন বিলাস যোশি: ‘…এই বইগুলো চেয়ে মিস্টার সেনবর্মা নামে একজন আমাকে অর্ডার পাঠান। এবং গত পনেরোই ডিসেম্বর বইগুলো আমি ওই ঠিকানায় পাঠিয়ে দিই। তারপর বইগুলোর কী হয়েছে না হয়েছে তা আমার জানার কথা নয়, আর জানতেও চাই না। তবে এটা তো বুঝতেই পারছেন যে, এসব বই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে খোলা জায়গায় ফেলে রাখার বই নয়। সাধারণত লুকিয়ে দেখা এবং রাখার জন্যেই এ বইয়ের জন্ম।’ নিজের রসিকতায় নিজেই হাসলেন বিলাস যোশি: ‘তবে আমি জানতাম না আপনার দাদা মারা গেছেন—জানলে এ-চিঠি আর বিল এভাবে পাঠাতাম না। আই অ্যাম সরি, মিস্টার সেনবর্মা।’
‘আপনার ভবিষ্যৎ ভেবে আমিও কম দুঃখিত নই।’ আমার কণ্ঠস্বরে দুঃখের লেশমাত্র নেই। কর্কশ গলায় খেঁকিয়ে উঠলাম, ‘আপনি এখনও বলছেন প্রফেসর সেনবর্মা নিজে এসব বাজে বইয়ের অর্ডার দিয়েছিলেন? আপনার সাহস তো কম নয়! আপনি জানেন, আমার দাদা…?’
‘উত্তেজিত হবেন না, স্যার।’ দু-হাত তুলে মোলায়েম স্বরে আমাকে বাধা দিলেন বিলাস যোশি: ‘আমাকেও কথা বলার একটু সুযোগ দিন। আপনি কী করে এত শিওর হচ্ছেন যে, আপনার দাদা এসব বইয়ের অর্ডার দিতে পারেন না? পৃথিবীতে কত বিচিত্র মানুষই না রয়েছে। ফ্রয়েড বলে গেছেন…।’
‘থামুন!’ গর্জে উঠলাম আমি, ‘ঢের ন্যাকামো হয়েছে, স্কাউড্রেল কোথাকার!’
‘আপনিও স্যার ন্যাকামো কিছু কম করছেন না।’ সরল মুখে মন্তব্য করলেন বিলাস যোশি, ‘আপনার দাদার চরিত্র জানতে আমার বিন্দুমাত্রও উৎসাহ নেই। আমি শুধু জানি, মাল যখন পাঠিয়েছি তখন তার দাম আমার পাওনা। আমি গরিব মানুষ। এই দোকান থেকেই আমার সংসার চলে। সুতরাং যদি কোনও খদ্দের আমাকে ফাঁকি দেয়, তা হলে—।’
‘ফাঁকি? কীসের ফাঁকি? আপনাকে কতবার বলব এসব বই একটাও আমার দাদা কেনেননি।’
