প্যান্টের জিপার খুলতে গিয়ে ঝুমুরের হাত থেমে গেল। ও আদুরে গলায় বলল, ‘কী বললে গো? আর-একবার বলো। প্লিজ…।’
‘আমি তোমাকে ভালোবাসি। আরও ভালোবাসতে চাই…। আমার বাঁধনগুলো খুলে দাও, প্লিজ…।’ কথা বলতে গিয়ে সুপ্রতিমের দম আটকে যাচ্ছিল।
ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো চট করে উঠে পড়ল ঝুমুর। হাঁপাতে-হাঁপাতে সুপ্রতিমের বাঁধন খুলতে শুরু করল। উত্তেজনায় ওর শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল।
বাঁধন খোলা হতেই সুপ্রতিমের কপালে হাত বুলিয়ে নরম সুরে ঝুমুর বলল, ‘নাও, এবার ওঠো।’
ক্লান্ত শরীর নিয়ে উঠে বসল সুপ্রতিম। কাটা জায়গাগুলো ভীষণ জ্বালা করছে।
ঝুমুরের আর তর সইছিল না। ও সুপ্রতিমের কাছে ঘনিষ্ঠ হয়ে এল। ওর কোলে উঠে বসল একেবারে।
সুপ্রতিমের মনে হল একটা কোলাব্যাঙ ওর কোলে বসে আছে। কিন্তু বাঁচার তাগিদে ও ঝুমুরকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে-গালে চুমু খেল। বিড়বিড় করে বলল, ‘আই লাভ য়ু, ঝুমুর…।’
শরীরের ভেতর থেকে উঠে আসা বমির দমক রুখে দিয়ে সুপ্রতিম ভাবল, নয়না এখনও আসছে না কেন।
আর ঠিক তখনই ঝুমুরের নগ্ন কাঁধের ওপর দিয়ে সোফার ওপরে পড়ে থাকা ক্ষুরটা ও দেখতে পেল। হাতের প্রায় নাগালে রয়েছে ওটা।
ঝুমুরকে জড়িয়ে ধরে কোনওরকমে হাঁটুগেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সুপ্রতিম। পলকা ছেলেটা সুপ্রতিমের আশ্লেষে আনন্দে টইটম্বুর হয়ে ভালোবাসার প্রলাপ বকছে শুধু। আর সুপ্রতিম নিজের প্রাণ বাঁচাতে একের-পর-এক চুমু খেয়ে চলেছে ওর স্নো-পাউডার মাখা মুখে।
ক্ষুরটা এখন পুরোপুরি সুপ্রতিমের হাতের নাগালে।
ও মুঠো করে অস্ত্রটা ধরল। তারপর ঝুমুরকে আদর করতে-করতে ক্ষুরটা দিয়ে এল ওর গলার খাঁজের কাছে।
কতক্ষণ আর সুপ্রতিমের শক্তি থাকবে কে জানে! মাথা ঝিমঝিম করছে। রক্তে চটচট করছে হাত-পা-বুক।
চুলোয় যাক ভদ্রতা, সভ্যতা, নীতি, দয়া ইত্যাদি।
আত্মরক্ষা মানুষের একটা আদিম ধর্ম।
বাঁহাতে ঝুমুরের মাথাটা পিছনে ঠেলে দিয়েই ডান-হাতে ক্ষুর টেনে দিল সুপ্রতিম।
ঝুমুরের ভালোবাসার প্রলাপ মাঝপথেই থেমে গেল। তার বদলে ঘরঘর শব্দ বেরোতে লাগল মুখ আর গলা দিয়ে।
রক্তে মুখ-গলা-বুক ভেসে গেল সুপ্রতিমের। ওর মুখ দিয়ে একটা বিচিত্র শব্দ বেরিয়ে এল। আর সঙ্গে-সঙ্গেই ও জ্ঞান হারিয়ে কাত হয়ে পড়ল মেঝেতে। ঝুমুরের মৃতদেহ তখনও ওকে আঁকড়ে ধরে ছিল।
একটি অচেতন দেহ ও একটি মৃতদেহ অসাড় হয়ে নয়না অথবা আর কারও জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
রক্তের ধারা তখন মেঝেতে গড়িয়ে-গড়িয়ে সময়ের হিসেব রাখছিল।
অশ্লীল-বিলাস
বড় রাস্তার ওপরেই দোকানটা। ফুটপাথ থেকে তিনটে ধাপ উঠে গেছে দোকানের কার্পেট পাতা মেঝে পর্যন্ত। বিশাল দরজা। দু-পাশের দ্রষ্টব্য শো-কোসে সাজানো রঙিন প্রচ্ছদের দেশি-বিদেশি বই। দরজার ওপরে মস্ত সাইনবোর্ডে। এবং তাতে মস্ত-মস্ত অক্ষরে লেখা, ‘যোশি বুক শপ।’ সাইনবোর্ডের চটকদার রং যে-কোনও কালার-ব্লাইন্ড লোককেও দোকানের কাছে টেনে আনবে।
মালিক মিস্টার যোশির নামটা কোন অক্ষর দিয়ে শুরু হবে ভাবতে-ভাবতে দোকানে ঢুকলাম। দোকানের ভেতরে আলো রেস্তোরাঁগোছের—বিশাল কিন্তু প্রায় টিমটিমে কয়েকটি ঘষা কাচের গ্লোব সিলিং থেকে ঝুলছে। দোকানের র্যাকগুলো বিভিন্ন ধরনের বইয়ে (‘ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট’ থেকে শুরু করে ‘ফ্রয়েড’ পর্যন্ত) ঠাসা। ভেতরে কোনও খদ্দের নজরে পড়ল না। তা ছাড়া বেলা বারোটায় এই ঠা-ঠা রোদ্দুরে কে-ই বা বই কিনতে বেরুবে! অবশ্য বই কিনতে আমিও বেরোইনি—।
যথেষ্ট খোঁজাখুঁজির পর একটা বইয়ের র্যাকের পেছনে ‘লুকিয়ে’ বসে থাকা জনৈক প্রৌঢ়কে আবিষ্কার করলাম। তার সামনে একটা টেবিলে বিভিন্ন কাগজপত্র—এমন কি খবরের কাগজ পর্যন্ত—ছড়ানো। টেবিলের কাছাকাছি আর কোনও চেয়ার নেই। সুতরাং আমি দাঁড়িয়েই রইলাম।
তিনি তখন ফোনে কথা বলছেন।
‘হ্যাঁ—কবে মারা গেছেন খোঁজটা নাও। আর ঠিকানাটা আমাকে বলো—লিখে নিই।’
উত্তরে সম্ভবত ঠিকানাটাই শোনা গেল, কারণ উনি খসখস করে একটা সাদা কাগজে কী যেন লিখে নিলেন। তারপর বারকয়েক ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে’ বলে রিসিভার নামিয়ে রাখলেন। তাকালেন আমার দিকে।
প্রথমে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করল আমার সাদা গোঁফ, পেটানো শরীর। তারপর চোখ নেমে এল আমার হাতে ধরা রুপোবাঁধানো লাঠিটার দিকে।
আমিও তাঁর চশমা, টাক, ঈগল-নাক, থ্যাবড়া থুতনি, চঞ্চল কণ্ঠা ইত্যাদি জরিপ করে তাকালাম অস্থির, ধুরন্ধর চোখজোড়ার দিকে।
আমার সাহেবি পোশাক দেখেই তিনি বোধহয় কিছুটা আশান্বিত হলেন। বিগলিত স্বরে বললেন, ‘বলুন স্যার, কী চাই?’
সামনের ছড়ানো কাগজগুলো একপাশে ঠেলে দিয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তুষার-মানব দেখার মতো বিস্ময়ভরা দৃষ্টি নিয়ে আমার গোঁফজোড়া দেখতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ একচোখে তার দিকে চেয়ে রইলাম। তারপর প্রশ্ন করলাম, ‘মিস্টার যোশি?’
‘হ্যাঁ, আমিই যোশি—বিলাস যোশি।’
‘ও।’ সত্যি কথা বলতে কী, এই বিলাস যোশিকে পার্ক স্ট্রিটের একটা বড় বইয়ের দোকানের মালিক বলে কল্পনা করতে আমার বেশ কষ্ট হল: ‘আমার নাম সেনবর্মা—প্রকাশ সেনবর্মা।’
‘বলুন মিস্টার সেনবর্মা, কী বই চাই আপনার?’
‘ও, আপনি দেখছি ”সেনবর্মা” পদবিটা বেমালুম ভুলেই গেছেন!’
