বিলাস যোশি ক্ষীণ স্বরে প্রতিবাদ করলেন, ‘আপনি যে খুব ভদ্র ব্যবহার করছেন সেটা বলতে পারছি না বলে দুঃখিত, মিস্টার সেনবর্মা। এই বিলের টাকা বহুদিন বাকি থাকা সত্ত্বেও আমি কোনওরকম কেসকামারি করিনি। কারণ, আমি জানি, এ ধরনের বইয়ের ক্যাচাল একবার চাউর হলে আমার খদ্দেরদের সুনাম নিয়ে টানাটানি হবে। তা ছাড়া শুধু আপনার দাদাই নন, এরকম অনেক খদ্দেরই আমার আছে। তাদের নামধাম আমি সবসময় গোপন রাখার চেষ্টা করি—।’
‘তা হলে দাদার লেখা চিঠিগুলো আমাকে দেখান।’
আমার শান্ত স্বরে বিলাস যোশি একটু অবাক হলেন। বললেন, ‘এবার আমাকে হাসালেন। কারণ, এটুকু আপনার বোঝা উচিত, এমন কোনও জিনিস আমি দোকানে রাখি না যাতে আমার খদ্দেরদের মানসম্মান নিয়ে টানাটানি হয়। তা ছাড়া এ-ব্যবসায় সিক্রেসিই হল ক্যাপিটাল। অবশ্য চালানের কার্বন কপিটা আমি আপনাকে দেখাতে পারি। আমার মনে হয়, আমাকে আপনি ভুল বুঝবেন না।’
‘উহুঁ, আপনাকে বুঝতে আমার এতটুকুও ভুল হয়নি।’ আমাকে হাসতে দেখে আবারও অবাক হলেন বিলাস যোশি: ‘এবং ভুল হয়নি বলেই এই মুহূর্তে আপনার কোমল শরীরে কিঞ্চিৎ লাঠ্যেïষধ প্রয়োগ করতে আমি উদগ্রীব।’
আমার বক্তব্যের গূঢ় অর্থ যতটা না কথায় তার চেয়ে বেশি প্রকাশ পেল আমার লাঠি বাগিয়ে ধরার ভঙ্গিতে।
আশ্চর্য ক্ষিপ্রতায় চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন বিলাস যোশি। একহাতে তুলে নিলেন টেলিফোনের রিসিভার এবং তাঁর অন্য হাতে মুহূর্তের মধ্যেই গজিয়ে উঠল একটা ০.৪৫৭ লুগার অটোমেটিক।
দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসলেন বিলাস যোশি: ‘আপনি বোধহয় এটাই চাইছিলেন, তাই না? কিন্তু এখন আপনাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া ছাড়া আর কোনও পথ নেই। এতক্ষণ ধরে ঢের আমড়াগাছি হয়েছে—আর নয়।’
দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই শুনলাম, তিনি পার্ক স্ট্রিট থানা থেকে একজন অফিসারকে জরুরি স্বরে ডেকে পাঠালেন, তারপর বললেন, ‘আমি আপনাকে যেতে দিতে পারি, তবে একটি শর্তে। আপনাকে কথা দিতে হবে যে, আমার পাওনা টাকা আমাকে মিটিয়ে দেবেন। আর ভবিষ্যতে দোকানে এসে এ ধরনের অসভ্যতা করবেন না। আর তা যদি না চান, তবে একজন পুলিশ অফিসারের জন্যেই ওয়েট করুন—।’
শক্ত মুঠোয় লাঠিটা চেপে ধরে জবাব দিলাম, ‘আমার মনে হয় অফিসারের জন্যে ওয়েট করাটাই ঠিক হবে। পুলিশকে আমিও বলব আপনার কাল্পনিক খদ্দেরদের কথা! দেখি, আমাকে বিলটা দিন—।’
বিলাস যোশি টেবিলে রাখা বিলটার দিকে তাকালেন।
ওই একটা মুহূর্ত আমার পক্ষে যথেষ্ট ছিল।
বিদ্যুৎঝলকের মতো আমার হাতের লাঠিটা আছড়ে পড়ল বিলাস যোশির রিভলভার ধরা হাতের কবজির ওপর। লুগারটা সশব্দে ঠিকরে পড়ল মেঝেতে। পলকের মধ্যে ওটাকে বুট দিয়ে চেপে ধরলাম। বললাম, ‘প্ল্যানটা আপনার নেহাত কাঁচা নয়, মিস্টার যোশি। মারা যাওয়া লোকজনের আত্মীয়রা কে-ই বা চায় যে, এসব অশ্লীল বইয়ের ব্যাপারস্যাপার লোকজানাজানি হোক! সুতরাং খবরের কাগজের শোক সংবাদ এবং চ্যালাদের পাঠানো মৃত্যুর খবরগুলো পাওয়ামাত্রই আপনি কতকগুলো কাল্পনিক বইয়ের নাম করে একটা বিল সেই ঠিকানায় পাঠিয়ে দেন। বইগুলো যে ধরনের তাতে এ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে কেউই চায় না। সকলেই চুপচাপ বিনা প্রতিবাদে আপনার টাকা মিটিয়ে দেয়। কিন্তু আপনি ভুল করলেন প্রফেসর সুরপতি সেনবর্মার বেলায়।’
‘তা—তার মানে?’ কবজিতে হাত বোলাতে-বোলাতে বলে উঠলেন বিলাস যোশি, ‘কী—কী বলতে চান আপনি?’
‘বলতে চাই, মিস্টার সেনবর্মা কখনও আপনাকে কোনও বইয়ের অর্ডার পাঠাননি—পাঠাতে পারেন না। সত্যিই তো, আপনি কী করে জানবেন যে, আমি সুরপতি সেনবর্মার ভাই নই। কী করে জানবেন যে—।’
এমন সময় দোকানের খোলা দরজায় এসে উপস্থিত হলেন একজন পুলিশ অফিসার—সঙ্গে দুজন কনস্টেবল। অফিসার আমাকে দেখেই সসম্ভ্রমে স্যালুট দিয়ে দাঁড়ালেন। তা দেখে বিলাস যোশি তাজ্জব হয়ে গেলেন।
আমি বলে চললাম, ‘কী করে জানবেন যে, আপনার ফোনের উত্তরে একজন নয়, দুজন পুলিশ অফিসার এসে হাজির হবেন?’ আমার আইডেনটিটি কার্ডটা বের করে বিলাস যোশির নাকের ওপরে তুলে ধরলাম: ‘আর, কী করেই বা জানবেন যে, প্রফেসর সুরপতি সেনবর্মা পুরো অন্ধ ছিলেন?’
বিলাস যোশি হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন টেবিলের ওপরে—বোধহয় অজ্ঞান হয়েই।
অসুর (নভেলেট)
শীতের দুপুরে কোনও এক শহরতলিতে তিনতলা বাড়িটা ছিল একা-একা দাঁড়িয়ে। সামনে একফালি বাগান, আর দু-পাশে খোলা মাঠের নির্জনতা। পিছন-দিকটায় কিছু জংলা ঝোপ। বাড়ির বাসিন্দা ছ’জন মানুষ। কিন্তু ছ’জনের একজন গরহাজির ছিল সেই নির্জন দুপুরে। এবং ঠিক সেই সময়েই এসে হাজির হল সপ্তম ব্যক্তি…।
পরনে ফুল হাতার কালো জামা, কালো কর্ড-এর প্যান্ট। চোখে-মুখে কেমন একটা উদাসীন দৃষ্টি। চেহারা তার রোগার দিকেই। কিন্তু চোয়ালের কঠিন রেখা ভেতরের শক্তির একটা আভাস দিচ্ছে। পা ফেলায় বিন্দুমাত্র চাঞ্চল্য নেই। অলসভাবে মেঠো পথ ধরে সে এগিয়ে আসছিল। আধা-গ্রাম আধা-শহর মিশিয়ে তৈরি এই শহরতলিতে তার আসা এই প্রথম। এবং বোধহয় এই শেষ।
রাস্তার দু-পাশে ঘাসের ছোঁওয়া এখনও আছে। চোখ তুলে তাকালে দূরে দেখা যায় ওভারহেড লাইন। সেই তারে বসে আছে কয়েকটা ফিঙে। লেজ নাড়িয়ে দোল খাচ্ছে।
