কাশ্মীরি আলোয়ান সরাইয়া বিশ্বনাথবাবু তাঁহার হাত দুইখানি প্রকাশিত করিলেন। গায়ের রঙের তুলনায় তাহার হাতের রং অনেক বেশি কৃষ্ণকায়। বলা যাইতে পারে, গাঢ় বাদামি। হত দুইখানির চামড়া অত্যন্ত কর্কশ। প্রতিটি শিরা-উপশিরা স্থূলভাবে প্রকট। কুৎসিত কদাকার আঙুলের গ্রন্থিগুলি অদ্ভুতরকম বেমানান। নখগুলি অত্যন্ত পুরু, গাঢ় কৃষ্ণবর্ণ ছাপে কলঙ্কিত, এবং কোনও মাংসাশী জন্তুর নখের ন্যায় বক্র।
হাত দুইখানি হ্যাজাক লণ্ঠনের আলোয় ভয়ংকর দেখাইতেছিল। বাহিরে কোথাও হইতে কর্কশ স্বরে কোনও পাচা ডাকিয়া উঠিল। ঠান্ডা বাতাসের ঝড় উন্মুক্ত জানলা দিয়া প্রবেশ করিয়া হু হু করিয়া ঘর তোলপাড় করিল। বিশ্বনাথবাবু উন্মাদের ন্যায় হাত দুইখানি দিয়া মেঝেতে আঘাত করিতে লাগিলেন। হাত ক্ষত-বিক্ষত হইয়া রক্তের ধারা বহিতে শুরু করিল। তিনি চিৎকার করিয়া কহিলেন, এ-হাত নিয়ে আমি কী করি! একে আমি না পারি রাখতে, না পারি ফেলতে! ওই ষোলো বছরের ছেলেটার মতো অত সাহস যে আমার নেই! ওঃ ভগবান, আমি এখন কী করি! আমার এ-শাস্তির কি শেষ নেই। বিশ্বনাথবাবু হাত দুইখানি ওইরূপে আঘাত করিতে করিতেই কান্নায় ভাঙিয়া পড়িলেন। কান্নার দমকে তাহার শরীর ফুলিয়া উঠিতে লাগিল।
মালতী অস্ফুটে এক ভয়ার্ত চিৎকার করিয়া আমাকে জড়াইয়া ধরিল। চন্দ্রমোহন ও তাহার বন্ধুরা বিশ্বনাথবাবুকে সংযত করিতে মনোযোগী হইল। বিবাহোৎসবের আনন্দ মুহূর্তে মৃত্যুর বিষাদে পর্যবসিত হইয়া গেল। আমার বাকশক্তি যেন কোনও অদৃশ্য ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে রোধ করিয়া দিয়াছে…।
.
চার মাস পরে চন্দ্রমোহনের নিকট হইতে সংবাদ পাইলাম, বিশ্বনাথবাবু নিজ বাড়ির ছাদ হইতে লাফাইয়া পড়িয়া আত্মহত্যা করিয়াছেন।
অয়স্কান্তের অন্তিম ইতিহাস
(অয়স্কান্ত রুদ্রের কুয়াশাচ্ছন্ন অপমৃত্যুর সম্ভাব্য সমাধান কেউই করতে পারেননি। কিন্তু সেই অবিশ্বাস্য মৃত্যুকে সর্বক্ষণের সঙ্গী করে দিনের পর দিন মানসিক কুরুক্ষেত্রের অংশীদার হয়েছে তার স্ত্রী অরুণা রুদ্র। অবশেষে কতকগুলো সাদা কাগজের পৃষ্ঠায় খুঁজে পাওয়া গেছে অয়স্কান্তের জীবনের অন্তিম দিনগুলোর কালো সাদা সাক্ষ্য। যেমন বিক্ষিপ্তভাবে তার শুরু, তেমনি বিক্ষিপ্তভাবে তার শেষ। তবু কি ফুটে ওঠে না এক অবিশ্বাস্য অশুভ ইঙ্গিত? ঘটনা ও ফলাফলকে আঙ্কিক নিয়মে যোগ করে অরুণার অন্তত তাই মনে হয়েছে।)
৫ মে, রাত দশটা
ক্লাব থেকে ফিরতে আজ অনেক রাত হয়ে গেল। অরুণা মনে হয় বেশ কিছুটা অসন্তুষ্ট হয়েছে। কারণ সংক্ষিপ্তভাবে বহু প্রচলিত এবং বহু ব্যবহৃত শব্দগুলো (খাবার ঢাকা আছে) বলে ও শোওয়ার ঘরে চলে গেল। ভেবেছিলাম খাওয়াদাওয়ার পর মানভঞ্জনে আজকের রাতটা খরচ করব, কিন্তু শ্রীকান্তর কথাগুলো মনে পড়ায় তা আর হয়ে উঠল না। টেবিলে বসে খালি ওর কাছে শোনা কথাগুলোই ভেবেছি। জানি, ক্লাবের আর সকলে ওর কথায় তেমন আমল দেয়নি, হেসেই উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি তা পারছি কই? সত্যিই কি সামান্য এক টুকরো সুতোর মধ্যে অত শক্তি আছে? ওই এক টুকরো সুতোর চাপে কেউ কখনও শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়? কে জানে! শ্রীকান্ত বলছিল, স্ত্রী-হত্যার অপরাধে সেই ভদ্রলোকের কোনও শাস্তি হয়নি। কারণ সামান্য একগাছা সুতো দিয়ে যে কাউকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা যায়, আদালত সে কথা একেবারেই বিশ্বাস করেনি। ওই অবিশ্বাস্য ঘটনার পর ভদ্রলোক পাগল হয়ে যান। তিনি তো সত্যিই স্ত্রীকে খুন করতে চাননি। নিছক একগাছা সুতো গলায় জড়িয়ে ভয় পাইয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কী থেকে কী হয়ে গেল!
না, এই সুতোর ঘটনাটা অরুণাকে বলা ঠিক হবে না। ও হয়তো ভয় পেয়ে যাবে। কিন্তু আশ্চর্য, এই অবাস্তব ব্যাপারটা শুধু আমাকেই কেন এরকমভাবে ভাবিয়ে তুলেছে?
৬ মে, রাত দশটা
আজ সকালে অফিসে যাওয়ার সময় একটা ভারী অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছে। ধুতিটা আলমারি থেকে নিয়ে পরতে যাব, দেখি, একগাছা সরু কালো সুতো সাদা ধবধবে ধুতির ওপর সাপের মতো এঁকেবেঁকে পড়ে রয়েছে। জিনিসটাকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, ঘর আঁট দেওয়ার সময় আপদ দূর হবে। কিন্তু তা হয়নি। কারণ, অফিস থেকে ফিরে এসে টেবিলের ওপর আবিষ্কার করলাম ওই কালো সুতোটাকে। আমার ফাউন্টেন পেনটার পাশে পরম নিশ্চিন্তে শুয়ে রয়েছে। জানি না কেন, ওটাকে দেখে মুহূর্তের জন্যে শিউরে উঠেছিলাম। তা হলে কি আমার হঠাৎই মনে পড়ে গিয়েছিল বিশ বছর আগেকার স্মৃতির কথা? আমার ছোটবেলার কথা? নিশীথের কথা?
৮ মে, রাত বারোটা
বলব না বলব না করেও অরুণাকে আমার অস্বস্তির কথাটা জানিয়ে ফেলেছি। ও ব্যাপারটাকে যথারীতি আমার উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা বলে হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। তা তো দেবেই। ও তো আর জানে না বিশ বছর আগেকার ছোট্ট ঘটনাটা। জানে না নিশীথের আকস্মিক অপমৃত্যুর কথা! তা ছাড়া শ্রীকান্তর বলা গল্পটাও তো ওকে আর বলিনি!
১০ মে, রাত একটা
রাত দশটায় খাওয়াদাওয়া করে শুয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু ঘুম আসেনি। কারণ, কালো সুতোটা এখনও আমার সঙ্গ ছাড়েনি। আজ সকালে অফিসে যাওয়ার পথে ওটাকে রাস্তায় ফেলে দিয়েছিলাম, কিন্তু ফিরে এসে দেখি সেই আগের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। সুতোটা আমার ড্রয়ারের ভিতরে নিরীহভাবে পড়ে রয়েছে। তা হলে নিশীথ কি এতদিন পরে ওর প্রতি অবিচারের ন্যায়বিচার চাইতে এসেছে? আজও আমি ভুলিনি বিশ বছর আগের সরস্বতী নদীর কথা, তার ওপরের তালগাছের গুঁড়ি কেটে তৈরি সাঁকোটার কথা। আর ভুলিনি এক লাটাই কালো সুতোর কথা। ওই সামান্য সুতো নিয়েই এক ধূসর সন্ধ্যায় নিশীথের সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়, তারপর অনিবার্যভাবে হাতাহাতির শুরু। ওই ধস্তাধস্তির মধ্যে নিশীথ কীভাবে যে জলে পড়ে গেল, আমার মনে নেই। শুধু এটুকু মনে আছে, ডান হাতের শক্ত মুঠোয় লাটাইটা আঁকড়ে ও ছিটকে পড়েছিল সাঁকোর ওপর থেকে। সাঁতার জানত না নিশীথ। তাই অসহায়ভাবে হাবুডুবু খেয়ে তলিয়ে গেছে ঘোলা জলের নীচে। সন্ধের ঝাপসা অন্ধকারে নিঃসঙ্গ আমি শ্রান্ত পায়ে ফিরে এসেছি ঘরে। নিশীথের সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার ঘটনা একেবারেই চেপে গেছি। কিন্তু দিন তিনেক বাদে মাইল দুয়েক দুরে ভেসে উঠল নিশীথের মৃতদেহ। সাত গাঁয়ের লোক ছুটল ওকে দেখতে। আমিও গেলাম। নিশীথের সারা শরীর গ্যাসবেলুনের মতো ফুলে উঠেছে। চোখের জায়গায় দুটো বীভৎস কোটর। দেহের জায়গায় জায়গায় মাংস খোবলানো। কিন্তু ওর ডান হাতের শক্ত মুঠোয় লাটাইটা তখনও ধরা ছিল।
