নিশীথের মৃতদেহের নৃশংস স্মৃতি আমাকে একটি রাতের জন্যেও মুক্তি দেয়নি। তখন আমার বয়স ছিল বছর বারো-চোদ্দো। আরও বছর পনেরো পর যখন অরুণাকে বিয়ে করলাম, তখন সে স্মৃতি বেশ ধূসর হয়ে এসেছে। তারপর এই পাঁচ বছরে নিশীথকে একেবারে ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু শ্রীকান্তর বলা গল্পটা, আর এই সামান্য কালো সুতোটা, আমাকে নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে সেই ভুলে যাওয়া বিষণ্ণ ধূসর সন্ধ্যার কথা। নিশীথের লাটাইয়ের কথা। কালো সুতোর কথা।
তা হলে কি এই সুতোই সেই সুতো? যে-সুতো আর সরস্বতী নদী সাক্ষী ছিল সেই বিয়োগান্ত নাটকের চরম পরিণতির?
১৩ মে, দুপুর দুটো
আমার টেবিলে একটা ছোট কাঠের মূর্তি আছে। হানিমুনের সময় কাশ্মীর থেকে অরুণাই ওটা পছন্দ করে কিনেছিল। মূর্তিটা একজন পুরুষের। কালো মিশমিশে তার সুগঠিত দেহের রং। দুটো হাত জয়ের ভঙ্গিতে মাথার ওপরে তোলা।
প্রথমটা আমি ঠিক খেয়াল করিনি। রাত তখন এগারোটা সাড়ে এগারোটা হবে। শনিবার বলে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে অরুণাকে নিয়ে একটা বাংলা ছবি দেখতে গিয়েছিলাম। সুতোটাকে তখনও ড্রয়ারেই দেখে গেছি। কিন্তু ফিরে এসে খাওয়ার পাট সেরে টেবিলে গিয়ে বসতেই লক্ষ করলাম ড্রয়ারটা হাট করে খোলা। অরুণাও সেটা লক্ষ করে বলে উঠল চোর-টোর এসেছিল কি না। কিন্তু আমি জানি, আসেনি। অরুণাকে শুতে যেতে বলে আমি ড্রয়ারটা পুরোটা খুললাম। ঠিক যা ভেবেছিলাম, তাই। সুতোগাছাটা ড্রয়ারে আর নেই।
ড্রয়ার বন্ধ করে টেবিলের ওপরে রাখা কালো মুর্তিটার দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম। টেবিল ল্যাম্পের আলো সরাসরি গিয়ে পড়েছে মূর্তিটার ওপরে। তারই আলোর স্পষ্ট দেখলাম, মূর্তির যে-হাত দুটো জয়ের ভঙ্গিতে ওপরে তোলা ছিল, তাদের অর্থ কেমন যেন পালটে গেছে। হাতের ভঙ্গিতে কোনও রদবদল না হলেও এখন মনে হচ্ছে, মূর্তিটা যেন নিদারুণ আতঙ্কে ঊর্ধ্ববাহু হয়ে নিঃশব্দ চিৎকারে ঘর ভরিয়ে ফেলছে। ঠিক তখনই আমার চোখে পড়ল কালো সুতোটা। মূর্তিটার গলায় সাপের মতো পাকে-পাকে জড়িয়ে রয়েছে সেই কালান্তক সুতো।
ভয়ে-ভয়ে হাত বাড়িয়ে সুতোটা খুলে নিতে চেষ্টা করলাম।
আশ্চর্য! অনায়াসেই ওটা খুলে চলে এল আমার হাতে। আরও আশ্চর্য, একইসঙ্গে যেন ফিরে এল মূর্তিটার আগের জয়োল্লাস। আতঙ্কের জমাট পরদাটা তার মুখ থেকে একেবারে নিঃশেষে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
ভয়ে আমার সারা শরীর কাঁপতে লাগল। এ কীসের ইঙ্গিত? শ্রীকান্তর বলা গল্পটা আরও একবার মনে পড়ল।
অনেক চিন্তা-ভাবনার পর ঠিক করলাম, অরুণাকে সব জানানো দরকার। তাই রাতে শোওয়ার সময় ওকে বললাম, তোমার সঙ্গে কথা আছে।
কী কথা?–ঘুমজড়ানো স্বরে অরুণা জানতে চাইল।
আবছা অন্ধকারে শূন্য দৃষ্টি মেলে ওকে শ্রীকান্তর বলা গল্পটা জানালাম।
ও প্রচণ্ড হাসিতে ভেঙে পড়ল, বলল, সুনু, তুমি ঠাট্টাও করতে পারো।
নিজেকে কেমন যেন অসহায় মনে হতে লাগল। তা হলে এই বিপদের মুহূর্তে আমার পাশে কেউ নেই। অরুণার হাসির কোনও জবাব না দিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লাম। সুতোটাকে কালো মূর্তিটার গলা থেকে খুলে কোথায় যে রেখেছি, আর মনে করতে পারছি না।
একটা সামান্য সুতো আমার জীবনকে যেন অদৃশ্য ফঁসে বেঁধে ফেলতে চাইছে।
১৪ মে, সন্ধ্যা সাতটা
ক্লাবে আজ আর যাইনি। একটু আগেই চেহারা খারাপ হয়ে গেছে বলে ঠিকমতো খাওয়াদাওয়ার জন্যে শাসন করছিল অরুণা। তারপর পাশেই যেন কোন প্রতিবেশিনীর বাড়িতে গেছে সান্ধ্য পরনিন্দাচক্রে যোগ দিতে। ওকে নিশীথ বা কালো সুতোটা সম্পর্কে আর কোনও কথাই বলিনি। এও বলিনি যে, অফিস থেকে ফিরে একটু আগেই আমি কালো সুতোটাকে আবার খুঁজে পেয়েছি। খুঁজে পেয়েছি ভারি অদ্ভুত জায়গায়, ভারি অদ্ভুতভাবে।
অরুণার ড্রেসিং টেবিলে আমাদের বিয়ের (গলায় মালা দেওয়া অবস্থায়) একটা ফ্রেমে বাঁধানো বড় ফটো আছে। অফিস থেকে ফিরে চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াতে গিয়ে দেখি কালো সুতোটা অরুণা আর আমার ফটোর মাঝখানে পাঁচিল হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টায় অলসভাবে ঝুলছে। হাত বাড়িয়ে সুতোটাকে খুলে নিতে গিয়ে টের পেলাম, আমার কেমন যেন শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। এমনকী ফটোতে আমার মুখের হাসিখুশি ভাবটা পর্যন্ত মিলিয়ে গেছে। সেখানে ফুটে উঠেছে অনিশ্চয়তায় ভরা এক হতবুদ্ধি যুবকের আতঙ্কিত মুখ। হঠাৎ কী হয়ে গেল, পাগল করা রাগে সুতোটাকে দু-হাতের মুঠোয় ধরে আমি টুকরো-টুকরো করে ছিঁড়তে লাগলাম। পাঁচ মিনিট পর যখন সংবিৎ ফিরে পেলাম, দেখি সুতোটা পাঁচ টুকরো হয়ে আমার পায়ের কাছে পড়ে আছে। মনে হল, সুতোর টুকরোগুলো যেন কেঁচোর মতো নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে। তাড়াতাড়ি ঘরের আলো নিভিয়ে দিলাম। হাজারো চিন্তায় আমার যুদ্ধক্লান্ত মস্তিষ্ক যেন অবশ হয়ে পড়েছে। বাইরের ঠান্ডা হাওয়ায় নদীর জলের বাষ্প অনুভব করলাম। শুনলাম, কিছু একটা জলে আছড়ে পড়ার ঝপাং শব্দ। আমি কি ধীরে ধীরে কারও সুপ্ত অপূর্ণ ইচ্ছের শিকার হতে চলেছি।
১৪ মে, রাত একটা
শোওয়ার পর আজ কিছুতেই ঘুম এল না। সুতোটার অশরীরী উপস্থিতি আমাকে চঞ্চল করে তুলেছে। নিশীথের জলে ভেজা ফুলে ওঠা মুখটা এই মুহূর্তে যেন আরও বেশি করে মনে পড়ছে। ওর হাতের লাটাইয়ের কালো সুতো তো এত সহজে শেষ হওয়ার কথা নয়! সরস্বতী নদীর ঘোলাটে জলে সাঁকোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আমার প্রতিবিম্ব নিশীথের জল-তল স্পর্শের আলোড়নে একই ছন্দে কাঁপছে। নিঃসঙ্গ আমি ধানখেতের আল ধরে আনমনাভাবে হেঁটে চলেছি। সন্ধের অন্ধকার চেপে বসেছে মাথার ওপরে। চোখের সামনে ভাসছে নিশীথের কালো সুতোয় ভরা লাটাইটা। আমি যেন…।
