আমি আদিবাসী তিনজনকে লক্ষ্য করে চিৎকার করে বললাম, শিগগির বিজয় সর্দারকে খবর দাও। এক্ষুনি!
ওরা ছুটে বেরিয়ে গেল বিজয় কাহারকে খবর দিতে।
বিজয় সর্দার এসে যখন পৌঁছোল, তখন আকাশ ভোরের ইশারা নিয়ে ধূসর ইস্পাতের ছাউনির মতো হয়ে উঠেছে–শুরু হয়েছে অসংখ্য পাখির মিলিত প্রভাতী গুঞ্জন। বিজয়কে সমস্ত ঘটনা প্রথম থেকে খুলে বললাম। ও গম্ভীরভাবে সব শুনল। তারপর বলল, ঝুমনাকে নিয়ে মন্দিরে যেতে হবে। সুতরাং সবাই মিলে ছুটলাম হাসপাতালে।
তরুণ ডাক্তারটিকে অনেক অনুরোধ করার পর বিজয়ের কথায় সে নিমরাজি হল। অর্থাৎ, ঝুমনাকে স্ট্রেচারে শুইয়ে আমাদের সঙ্গে মন্দিরে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেলাম। জঙ্গলের পথ ধরে আমি, রমেশ ও বিজয় কাহার আগে আগে হেঁটে চলেছি, পেছনে আদিবাসীদের বয়ে আনা স্ট্রেচারে শুয়ে ষোলো বছরের অসুস্থ ছেলেটা। অবশ্য এখন ও আগের চেয়ে অনেকটা সেরে উঠেছে।
মন্দিরের কাছাকাছি এসে পৌঁছোতে জনদুয়েক আদিবাসী ছুটে এগিয়ে গেল মন্দিরের দিকে হয়তো রতন গুনিনকে খবর দিতে। কিন্তু একটু পরেই তারা উধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে ফিরে এল। জানাল, আমরা আসছি খবর পেয়েই রতন গুনিন ভয়ে মন্দির ছেড়ে কোথায় পালিয়েছে–তার কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সেটা শুনে বিজয় বলল, গুনিনের দরকার নেই, ঝুমনা দেখিয়ে দিলেই হবে। তারপরই সে স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা ছেলেটার কাছে গিয়ে জানতে চাইল, হাত দুটোকে কেটে ফেলার পর রতন গুনিন সেগুলো কোন জায়গায় পুঁতেছে। উত্তরে ইশারা করে মাটিতে একটা নরম জায়গা দেখাল ঝুমনা। তখন বিজয় সবাইকে মাটি খোঁড়ার নির্দেশ দিল। প্রায় হাত আড়াই মাটি খোঁড়ার পর অতি পরিচিত পিচ-বোর্ডের বাক্সটার দেখা পাওয়া গেল। কিন্তু সে বাক্স খোলা, কাদায় মাখামাখি। তার ভিতরে কোনও কাটা হাত খুঁজে পাওয়া গেল না!
হাত দুটোর সন্ধানে আমরা সকলে মিলেই খোঁজাখুজি শুরু করলাম, কিন্তু বৃথাই। আমার কেবলই মনে হতে লাগল, হাত দুটো আমার পিছু ছাড়েনি। লাঠির আঘাতের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে ওরা তক্কেতক্কে রয়েছে।
তাঁবুতে ফিরে এসেও হাত দুটোর অদৃশ্য উপস্থিতি আমি টের পেলাম। আমার তাঁবুতে, আদিবাসীদের তাবুতে, গাছ কাটার যন্ত্রপাতির ওপরে, প্রায়ই হামলা হতে লাগল। তখন আমরা চারদিকে ইঁদুর-ধরা জাতিকল এনে পেতে রাখলাম। একদিন সকালে একটা জাতিকল বন্ধ অবস্থায় আবিষ্কার করলাম। কিন্তু তার লোহার দাঁতে সামান্য একটু ছেঁড়া চামড়া ও কালচে রক্ত ছাড়া আর কিছুই পেলাম না। বুঝলাম, একটা হাত ফাঁদে ধরা পড়েছিল। তখন দ্বিতীয় হাতটা এসে তাকে ফঁদ থেকে সহজেই উদ্ধার করেছে।
টোপ হিসেবে আমার হাতঘড়িটাকে বেশ কয়েকদিন খোলা জায়গায় রেখে দিলাম, কিন্তু বৃথাই। তবে যত্রতত্র হাত দুটোকে দেখা যেতে লাগল। গাছের ডালে, আমার মশারির চালে, ঘাসের ওপর, তাঁবুর গায়ে, শুকনো শাল গাছের পাতার ফাঁকে। আদিবাসীরা এত ভয় পেয়ে গেল যে, বিজয় কাহার শত বুঝিয়েও ওদের শান্ত করতে পারল না। ওরা একে-একে কাজ ছেড়ে পালাতে লাগল। তখন বাধ্য হয়ে সাময়িকভাবে গাছ কাটার কাজ বন্ধ রেখে আমরা ক্যাম্প গুটিয়ে ফিরে এলাম। ফেরার সময় আমার প্রতিটি জিনিস বারবার করে নেড়েচেড়ে আমি দেখে নিয়েছি কোনও কিছুর ফাঁকে সেই ধূর্ত হাত দুটো লুকিয়ে আছে কি না। অবশেষে স্থানীয় অফিসে কাজের সমস্ত দায়-দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে আমি কলকাতা রওনা হলাম।
ট্রেনে ফেরার সময় হঠাৎই আমার নজরে পড়ল, শক্তপোক্ত করে বাঁধা বেডিংয়ের ভিতরে কিছু একটা যেন নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে। কারণ বেডিংয়ের কাপড়ের একটা জায়গা অদ্ভুতভাবে কেমন উঁচু ঢিবির মতো হয়ে রয়েছে, এবং সেই ঢিবিটা যেন কষ্টেসৃষ্টে চলে বেড়াতে চেষ্টা করছে। ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি বেডিংটা খুলে ফেলেছি, কিন্তু ট্রেনের কমজোরি আলোয় ভালো করে কিছু দেখতে পাইনি। একটা অজানা আতঙ্ক আমাকে ধীরে-ধীরে ঘিরে ধরেছে। হাত দুটো কি আমাকে ছাড়বে না? ওরা কি প্রতিশোধ চায়? কিন্তু কীভাবে ওরা প্রতিশোধ নেবে? বিজয় কাহার আমাকে বলেছিল, ওই হাত শুধু চুরি করে, কাউকে খুন করার ক্ষমতা ওদের নেই। আর সেরকম ক্ষমতা থাকলে বহু আগেই আমি ওদের শিকার হতাম। সুতরাং দুশ্চিন্তায়-দুশ্চিন্তায় আমি যেন পাগল হয়ে উঠলাম। তারপর–
বিশ্বনাথবাবু হঠাৎই থামিলেন। চোখ হইতে চশমাটি খুলিয়া নিবিষ্ট মনে উহার কাচ দুটি নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। আমরা কৌতূহলে নীরব ও রুদ্ধশ্বাস। মালতী সভয়ে আমার আরও নিকটে ঘেঁষিয়া বসিল। চন্দ্রমোহন ও তাহার বন্ধু অবিনাশ এতক্ষণ নিরবচ্ছিন্ন ধূমপানে ব্যস্ত ছিল, এখন উভয়েই হস্তধৃত সিগারেট অ্যাশট্রেতে গুঁজিয়া নির্বাপিত করিল। বিশ্বনাথবাবু আমাদের দিকে পর্যায়ক্রমে দৃষ্টি রাখিলেন। হ্যাঁজাকের আলো তাঁহার মুখমণ্ডলকে ছায়াময় করিয়া তুলিয়াছে।
অবশেষে চশমা যথাস্থানে ফিরাইয়া তিনি কহিলেন, আজকের ঘটনার বুঝতেই পারছেন, সেই হাত এখনও আমার পেছু ছাড়েনি। সোনার জিনিসের প্রতি ওদের লোভ তো কমেইনি, বরং বেড়েছে। সেইজন্যেই আত্মীয়স্বজন কারও বাড়িতে আমি যাই না। চাকরিবাকরি ছেড়ে শুধু নিজের ব্যাবসা নিয়ে আছি। তিনি এইবার চন্দ্রমোহনের দিকে ইশারা করিয়া কহিলেন, চাদু আমার এই একাচোরা স্বভাবের কথা জানে, এমনকী চুরির ব্যাপারটাও জানে। কিন্তু কোনওদিন ওকে তার কারণ খুলে বলিনি। আজ বললাম, কারণ, এরকম অপমানজনক পরিস্থিতির মধ্যে আগে কখনও পড়িনি। এইজন্যেই সঁদুকে আমি বারবার বলেছি, বরযাত্রী আমি যাব না। তুই বউ নিয়ে আয়, তখন আশীর্বাদ করব, কিন্তু কে শোনে কার কথা! ও বলল, তুমি চলো, আমি তোমাকে নজরে-নজরে রাখব।…আসলে চঁদুরও দোষ নেই। ও কী করে জানবে যে, যখন ওই হাত দুটো চুরি করে, তখন আমি এতটুকুও টের পাই না? কী করে জানবে, কত ভয়ংকর প্রতিশোধ ওই হাত দুটো আমার ওপরে নিয়েছে। কী করে জানবে, কত বিষাক্ত ছোবলে ওরা আমার গোটা জীবন নীল করে দিয়েছে! এই তো সেই হাত! এই তো সেই হাত! এই তো—
