সংবিৎ ফিরে পেয়ে যখন উঠে দাঁড়িয়েছি, ততক্ষণে হাত দুটো তাঁবুর বাইরে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে আমি এক ভয়ংকর অবাস্তব দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে পড়েছি। এ যে আমি বিশ্বাসও করতে পারছি না!
দ্বিতীয় একটা হ্যারিকেন তাঁবুতে ছিল। অন্ধকারে হাতড়ে সেটাকে খুঁজে বের করে জ্বেলে দিলাম। দেখলাম, আমার হাত থেকে পড়ে যাওয়া কাচের চিমনির ভাঙা টুকরোগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আরও নজরে পড়ল, গামলা থেকে তাবুর দরজা পর্যন্ত একটা ভিজে দাগ। গামলার কাছে গিয়ে দেখি, সেটা জল কাদায় নোংরা ঘোলাটে হয়ে গেছে, এবং জলে তখনও ঢেউ খেলছে। যেন এইমাত্র কেউ জলে আলোড়ন তুলে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
যেসব আদিবাসী গাছ কাটত, তাদের কয়েকজন–জনা-চার-পাঁচ হবে কাজের শেষে আর ঝোঁপড়িতে ফিরে যেত না। আমার তাঁবুর লাগোয়া একটা তাঁবু তৈরি করে সেখানেই রান্নাবান্না করে, খাওয়াদাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়ত। হ্যারিকেনের চিমনি ভাঙার শব্দে ও আমার চলাফেরার আওয়াজে ওদের ঘুম হয়তো ভেঙে গিয়ে থাকবে। কারণ, একটু পরেই দুজন আদিবাসী আমার তাঁবুতে এসে হাজির হল। চিমনির ভাঙা কাচগুলো নজরে পড়তেই সেগুলো বঁট দিয়ে বাইরে ফেলে দিল। কিন্তু মেঝেতে ভিজে দাগের ও গামলার ঘোলাটে জলের কোনও সহজ-সরল ব্যাখ্যা ওরা দিতে পারল না। ওদের বললাম যে, প্রাণীটাকে আমি ভালো করে দেখতে পাইনি, কারণ সত্যি কথাটা আমি নিজে তখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছি না। অন্য কেউ ওরকম গল্প আমাকে শোনালে আমি নিশ্চয়ই তার মুখের ওপর হো-হো করে হেসে উঠতাম।
তা যাই হোক, ওদের বললাম চোখ-কান খোলা রেখে সজাগ হয়ে শুতে। কারণ সেই রাতের আগন্তুক চোরও হতে পারে, কিংবা শেয়াল অথবা হায়েনাও হতে পারে।
পরদিন সকালে আবিষ্কার করলাম, আদিবাসীদের তাঁবুতে আমাদের গাছকাটার যন্ত্রপাতি যে-জায়গাটায় থাকত, সে-জায়গাটা একেবারে লন্ডভন্ড হয়ে রয়েছে। রমেশ অনেক খোঁজাখুঁজির পর বলল, দু-একটা জিনিস চুরি গেছে। অথচ আশ্চর্য, কেউ কোনও শব্দ পায়নি, এক মুহূর্তের জন্যে কারও ঘুমও ভাঙেনি। আমি ব্যাপারস্যাপার কিছুটা অনুমান করতে পারলেও চুপচাপ রইলাম।
বেলা একটু বাড়তেই হাসপাতালে ঝুমনাকে দেখতে গেলাম। ডাক্তারের কাছে শুনলাম, ওর সামান্য জ্বর হয়েছে। তা ছাড়া শরীর খুব দুর্বল। ওকে শুধু দুধ-বার্লি আর ভিটামিন ট্যাবলেট খেতে দেওয়া হচ্ছে। আমাকে দেখেই ও ব্যান্ডেজ বাঁধা দুহাত তুলে নমস্কারের ভঙ্গি করল। ডাক্তারবাবু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই আমি ঝুমনাকে প্রশ্ন করলাম, তোকে কয়েকটা কথা জিগ্যেস করলে কি জবাব দিতে খুব কষ্ট হবে?
ও বলল, না বাবু, যা প্রাণ চায় জিগ্যেস কর। এখন আমার তো কোন দুখ লাই।
ওকে বললাম, হাত দুটো কেটে ফেলে তুই কী করেছিস?
তোর দেওয়া বাক্সটায় রতন গুনিন ওগুলো রেখেছিল।
তারপর?
তারপর বাক্সটা সমেত মাটিতে পুঁতে ফেলেছে। আমি নিজের চোখে দেখেছি।
ওইটুকুই আমার জানার দরকার ছিল। হাসপাতাল থেকে ফিরে এলাম।
সে-রাতে আর দু-চোখের পাতা এক করিনি। শেয়াল কিংবা হায়না তাড়ানোর লাঠিটা হাতের কাছে নিয়ে অপেক্ষায় রইলাম। কিন্তু কিছুই হল না। তার পরের রাত, এমনকী তৃতীয় রাতেও কিছু হল না। আমি ভাবলাম, হয়তো হ্যারিকেনের আলোতে ওই মহাচোর হাত দুটো দেখা দিতে লজ্জা পাচ্ছে। সুতরাং পরের রাতে আলো নিভিয়েই শুয়ে পড়লাম।
এক অদ্ভুত শব্দে ঘুমটা ভাঙল। আমার কানের ঠিক নীচেই আমার হাতঘড়িটার অ্যালার্ম বাজছে। বালিশ ভেদ করেও চাপা শব্দটা আমার কানে আসছে। পাথরের মূর্তির মতো নিঃসাড়ে শুয়ে রইলাম। ধীরে-ধীরে হয়তো মিনিট পনেরো কেটে গেল। কারণ, তারপরই আমার কানে এল দ্বিতীয় অ্যালার্মের শব্দ। রাত এখন কটা বাজে কে জানে! কিন্তু অ্যালার্মটা নিজে থেকে বাজছে কেমন করে? আমি তো অ্যালার্মের চাবিতে দম দিইনি!
ধীরে-ধীরে একটা হাত বালিশের তলায় ঢুকিয়ে দিলাম। পরমুহূর্তেই এক অমানুষিক বিকৃত চিৎকার বেরিয়ে এল আমার ঠোঁট চিরে। বালিশের তলাতেই ওরা রয়েছে। সেই হাত দুটো! আর আমার হাতঘড়িটা সেই হাতের মুঠোর মধ্যে।
ঘড়ির চামড়ার ব্যান্ডের একটা প্রান্ত সামান্য বেরিয়ে ছিল। আমি সেটা ধরেই প্রাণপণে এক হ্যাঁচকা মারলাম। কিন্তু ওই হাতের আঙুলগুলো ভীষণ শক্ত, এবং আমার আঙুলগুলো ওরা সাঁড়াশির মতো তীব্রতায় আঁকড়ে ধরল। আমি আবার চিৎকার করে উঠলাম।
আমার চিৎকারে আদিবাসীদের তাবু থেকে অন্তত তিনজন ছুটে এসে হাজির হল। তাদের একজনের হাতে জ্বলন্ত হ্যারিকেন। কীসের সঙ্গে যে আমার আপ্রাণ ধস্তাধস্তি চলছে সেটা ওরা প্রথমটা ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারল না। কিন্তু আলোয় ইশারা পেয়ে হাত দুটো বোধহয় ভয় পেল এবং ঘড়িটা হঠাৎই ছেড়ে দিল। আমি চেষ্টা করেও ওদের আঁকড়ে ধরে রাখতে পারলাম না। কালচে বাদামি হাত দুটো বিছানার সাদা চাদরের ওপর দিয়ে বিদ্যুৎগতি কঁকড়ার মতো ছুটে গেল, মশারি ফাঁক করে ধপ শব্দে ছিটকে পড়ল মেঝেতে, তারপর ছুটে চলে গেল তাঁবুর দরজা লক্ষ করে।
ততক্ষণে আমি নিজেকে সামলে নিয়ে খাটের তলা থেকে লাঠিটা তুলে নিয়েছি এবং দুটো হাতের মধ্যে যেটা একটু পিছিয়ে পড়েছিল, সেটাকে লক্ষ্য করে সজোরে আঘাত করেছি। আঘাতের সঙ্গে সঙ্গেই হাতটা শূন্যে প্রায় হাতখানেক লাফিয়ে উঠল, তারপর চিত হয়ে পড়ল মেঝেতে। মুহূর্তের জন্যে হাতটা হতচকিত হয়ে থমকে রইল। যেন চিন্তা করল, সেই আকস্মিক আঘাতের প্রতিবাদে কী করা উচিত। তারপর হঠাৎই আমাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে এল…অনেকটা তেড়ে আসার মতো। কিন্তু কী ভেবে এক ঝটকায় দিক পালটে করে আবার ছুটে চলল দরজার দিকে। তারপর একসময় অদৃশ্য হয়ে গেল বাইরের জঙ্গলের আড়ালে, অন্ধকার রাতের পরদার গোপন ভঁজে।
