বিকেল হতে না হতেই হাসপাতালে রওনা হলাম ওকে দেখতে। ওর কাটা হাত দুটোয় এখন নতুন করে পরিষ্কার ব্যান্ডেজ বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তরুণ ডাক্তারটি আমাকে আশ্বাস দিল, রক্তপাত প্রচুর হয়েছে, তবে বিশেষ ভয় নেই। ও সেরে উঠবে। আমাকে দেখেই ঝুমনা ব্যান্ডেজ করা হাত দুটো উঁচিয়ে ধরল আমার মুখের সামনে। যেন হাত দুটো কেটে ফেলায় ও ভীষণ খুশি হয়েছে এবং একই সঙ্গে স্বস্তি পেয়েছে। কিন্তু কে কাটল ওর হাত দুটো? কেমন করেই বা কাটল? একটু পরেই সে-প্রশ্নের উত্তর পেলাম।
ওকে জিগ্যেস করলাম, এসব কেমন করে হল রে, ঝুমনা? কে এ কাজ করল?
ও জবাব দিল, এ আজ নয় কাল আমাকে করতেই হত, বাবু। তোকে কথা দিয়েছি, আর আমি চুরি করব না। সে কথা রাখতে গেলে হাত দুটো কেটে ফেলা ছাড়া আর পথ কোথায়? এ-হাত যে আমার নয়! এদের আমি বিশ্বাস করি কেমন করে?
বুঝলাম, যা হয়েছে, ওর সম্মতিতেই হয়েছে। ওকে বললাম, এ তোর ভুল ধারণা। তোর শরীরের সবই তো তোর, অন্য কারও কি হতে পারে? কিন্তু এ কাজ করল কে?
উত্তরে ও জানাল, জঙ্গলের শেষে যে বোঙার মন্দির আছে, তার গুনিন রতন মাণ্ডি এ কাজ করেছে। কারণ সে হাত দুটোকে আগে থেকেই চিনত।
কী করে চিনল?–আমি জানতে চাইলাম।
আগেও এই হাত দুটো সে দেখেছে, ঝুমনা উত্তর দিল, অনেক বছর আগে…সে আমার বাপকে চিনত…।
এরপর কথা চালিয়ে যাওয়া অর্থহীন। অশিক্ষা ও কুসংস্কারের কোনও ওষুধ নেই। সুতরাং ডাক্তারবাবুকে ওর দিকে নজর রাখার অনুরোধ করে আমি চলে এলাম। চলে আসার সময়েও শুনলাম ঝুমনা বলছে, আর আমার কোনও দুঃখ নেই রে, বাবু। আমার চোখে আর জল আসবে না।…কিন্তু দেখলাম, একথা বলার সময় ওর চোখ জলে ভেজা। হয়তো এর কারণ ওর শরীরের অসহ্য যন্ত্রণা। ডাক্তারবাবুর মতে ওর এখন প্রচুর বিশ্রামের প্রয়োজন। কারণ, যে-পরিমাণ রক্তক্ষরণ ওর হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। অন্তত মাসখানেক সময় তো লাগবেই।
সে-রাতে একরকম বিষণ্ণ মনেই শুতে গেলাম। মশারির ভিতরে শুয়ে উথালপাতাল দুশ্চিন্তা করতে করতে শুনতে লাগলাম বাইরের উড়ন্ত মশার মিহি গুঞ্জন। এবং একসময় ঘুমিয়েও পড়লাম।
ঘুম ভাঙল অদ্ভুত এক খসখস শব্দে। মনে হল, তাঁবুর গায়ে বাইরে থেকে কেউ যেন আঁচড় কেটে চলেছে। আর মাঝে-মাঝে টোকা মারার ভেঁতা শব্দ। হয়তো কোনও পাচা কিংবা বাদুড় পথ ভুলে তাঁবুর গায়ে এসে বারবার ধাক্কা খাচ্ছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তাই বা কী করে সম্ভব? মশারি ভেদ করে তাঁবুর খোলা দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাইরের খোলা আকাশ ও সেখানে মেঘের আস্তরণে ঢাকা ঘোলাটে পূর্ণিমার চাঁদ। আর তার কিছুটা নীচেই শুরু হয়েছে আঁকড়া-মাথা শালগাছগুলোর অন্ধকার ছায়াপ্রাচীর।
শত চেষ্টাতেও চোখে আর ঘুম নামল না। বেচারা ঝুমনার কথা বারেবারেই মনে পড়তে লাগল এবং চোখের সামনে থেকে-থেকেই ভেসে উঠতে লাগল ওর কাটা হাত দুটোর ভয়াবহ দৃশ্য। আর একইসঙ্গে কানে আসছে টোকা দেওয়ার হালকা শব্দ, আঁচড় কাটার শব্দ–তাঁবুর চাদরে খসখস শব্দে কেউ যেন ছুটে বেড়াচ্ছে। কোনদিক থেকে যে শব্দটা আসছে, ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারলাম না। বিভিন্ন দিক, বিভিন্ন অনুভূতি, সব যেন মিলেমিশে তালগোল পাকিয়ে যেতে লাগল। এ কীসের শব্দ এমন বিচিত্রভাবে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে?
রহস্যের গভীরতা ক্রমেই যখন আমাকে আচ্ছন্ন করে তুলেছে, তখন শব্দের ধরনটা হঠাৎই পালটাল। সবসময় হাত-মুখ ধোয়ার জন্যে তাবুতে একটা বড় অ্যালুমিনিয়ামের গামলা ছিল। বেশিরভাগ সময়েই তাতে জল ভরা থাকে। তখনও ছিল। জল ফুরিয়ে গেলে ঝুমনাই আবার জল এনে ভরতি করে রাখত। ওর বীভৎস দুর্ঘটনার পর রমেশই অনুগ্রহ করে সে কাজটুকু করে দিচ্ছিল। সুতরাং গামলার জলে ছলাৎ শব্দ শুনেই আমি চমকে উঠেছি। তার কারণ দুটো ও এক, শব্দের চরিত্র এককথায় অভিনব ও চূড়ান্ত রহস্যময়। দুই, এই প্রথম বুঝলাম, শব্দটা তাবুর বাইরে নয়, হচ্ছে তাঁবুর ভিতরে। সোজা কথায়, গামলার জলে কিছু একটা পড়ে গিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। আপ্রাণ চেষ্টা করছে গামলা বেয়ে তাড়াহুড়ো করে বাইরে বেরিয়ে আসতে। শোনা যাচ্ছে অ্যালুমিনিয়ামের ওপর খরখর আঁচড়ের অতিব্যস্ত শব্দ।
বালিশের তলায় হাত ঢুকিয়ে ঘড়িটা বের করে নিলাম। রেডিয়াম ডায়ালে চোখ রেখে দেখলাম, রাত তিনটে বাজে। সুতরাং ঘুমোনোর চেষ্টা এখন বৃথা। মশারির বাইরে বেরিয়ে নীচু হয়ে ক্যাম্পখাটের কাছে রাখা হ্যারিকেনটা তুলে নিলাম। সলতে নামিয়ে আলোটা প্রায় নিবুনিবু করা ছিল। চাবি ঘুরিয়ে সেটাকে বাড়িয়ে দিলাম। সেই মুহূর্তেই হ্যারিকেন-শিখার আবছা আলোয় একটা জিনিস দেখতে পেলাম…এবং হ্যারিকেন আমার হাত থেকে খসে পড়ল মেঝেতে। ঝনঝন শব্দে চুরমার হয়ে গেল কাচের চিমনি। আলোয় শিখাও পলকে নিভে গেল।
আলো জ্বালিয়ে ওই অল্প সময়েই আমি দেখেছি, গামলার ভিতর থেকে পড়িমরি করে পাগলের মতো ছুটে বেরিয়ে এসেছে কালো কঁকড়ার মতো অদ্ভুত দুটো প্রাণী। ছিটকে লাফিয়ে পড়েছে মেঝেতে, তারপর বিদ্যুৎগতিতে রওনা হয়েছে তাঁবুর দরজা লক্ষ্য করে। প্রাণী দুটোর রং গাঢ় বাদামি, পিঠ দুটো মাকড়সার মতো উঁচু হয়ে রয়েছে, এবং তার ওপরে পার্চমেন্ট কাগজের মতো চামড়ার আস্তরণ। প্রত্যেকটা প্রাণীর পাঁচটা করে পা, এবং তাদের ছুঁচোলো ডগায় কালচে ছোপ ধরা মোটা বাঁকানো নখ। না, দেখতে আমার ভুল হয়নি। এ ঝুমনার কেটে ফেলা সেই দুটো হাত! গামলার জলে ভিজে গিয়ে সেগুলোকে কেমন অদ্ভুত চকচকে উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল।
