হাঁটুতে দু-হাত রেখে ছেলেটা বসেছিল। আমার নজর পড়ল ওর হাত দুটোর দিকে। হ্যারিকেনের আলোয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করে দেখলাম। হাত দুটোকে দেখে কোনও বৃদ্ধের বলে মনে হয়। কুৎসিত কদাকার বড়-বড় আঙুলের গাঁট। খসখসে ভাঁজ পড়া চামড়া। নখগুলো মোটা বাঁকানো, তাতে আবার কালচে ছোপ। শিরাগুলো ফুলে উঠে পার্চমেন্ট কাগজের মতো চামড়াকে থেকে-থেকে উঁচু-নীচু করে দিয়েছে। অবশ্য সকালের শাস্তির জন্যেও শিরাগুলো ফুলে উঠতে পারে।
জলভরা চোখ নিয়ে ঝুমনা বলল, এ আমার হাত নয় বাবু। এ আমার শরীরের কেউ লয়। কিন্তু আমার আর কুননা পথও লাই। তোকে তো আগেও বলেছি, অথচ তুই বিশ্বাস করিসনি। তোকে দিব্যি করে বলেছি, এসব চুরি এই হাত দুটো নিজে নিজে করে–আমি জানতেও পারি না।
বলাবাহুল্য, ওর কথা আমার এখনও বিশ্বাস হল না। ওকে বললাম, এসব কথা আর চিন্তা না করাই ভালো। কারণ, ও চুরি করেছিল এবং তার শাস্তিও পেয়ে গেছে।
ঝুমনা ওর হাত দুটো আমার কাছে তুলে ধরল : তুই নিজের চোখেই দ্যাখ, বাবু, এ আমার হাত লয়। তবে তুকে কথা দিচ্ছি, এরা আর চুরি করবেক নাই। তোর বিছেহার, বোতাম, সব এরাই চুরি করেছে। আগের বাবুর আংটিও এরা লিয়েছে। সোনার জিনিসে এদের বেশি লোভ। তবে সোনার জিনিস না পেলে হাতের কাছে যা পায়, তাই চুরি করে।
ওকে প্রশ্ন করলাম, তাই নাকি? আর কী চুরি করেছে এরা?
ও বলল, অনেক জিনিস। প্লেট, চামচ, রুমাল, সাবান…।
ওগুলো নিয়ে কী করেছিস?
মাটিতে পুঁতে রেখেছি। বেশিরভাগ সময়েই এই হাত দুটো যা চুরি করে, নিয়ে গিয়ে কোনও পুকুরপাড়ে মাটিতে পুঁতে ফেলে। জঙ্গলের বাইরে যে-বড় দিঘিটা আছে, তারই পাড়ে সমস্ত জিনিস পোঁতা আছে। তোকে আমি জায়গাটা দেখিয়ে আনতে পারি। বিশ্বাস কর, একটা জিনিসও আমি বিক্রি করিনি। ওরা চুরি করে সব মাটিতে পুঁতে রাখে।
বলছিস তা হলে তোর কোনও দোষ নেই?
না! এ আমার হাত নয়!
তবে কার হাত?
নতুন করে কান্নায় ভেঙে পড়ল ঝুমনা। লজ্জায় মাথা নীচু করে অস্ফুট স্বরে বলল, আমার বাবার হাত।
কিন্তু রমেশ যে বলছিল, তোর বাবা মারা গেছে?..আমি ভীষণ অবাক হলাম।
হ্যাঁ, আমার জন্মের আগেই বাবা মারা গেছে।..ঝুমনা উত্তর দিল।
কী করে মারা গেল?
বাবাকে ওরা মেরে ফেলেছে সর্দারের হুকুমে।
হয়তো বিজয় কাহারের আগে যে-সর্দার ছিল তারই আদেশে। কিন্তু কেন? সে-প্রশ্ন ঝুমনাকে করতেই ও মাথা নীচু করল। আস্তে-আস্তে বলল, চুরির জন্যে, বাবু।…তারপর মুখ তুলে সরাসরি তাকাল। আমি আবার চোখ ফেরালাম ওর হাতের দিকে।
হাত দুটোর কদাকার-কুৎসিত চেহারা সত্যিই অতুলনীয় এবং ষোলো বছরের একটা ছেলের পক্ষে হাত দুটোর বয়েস অনেক বেশি। কিন্তু এগুলো যে ওর হাত নয়, ওর কথা না শুনে স্বাধীনভাবে কাজ করে বেড়ায়, একথা বিশ্বাস করা খুবই কঠিন। এ-গল্প কেউ বিশ্বাস করবে না। লক্ষ করে দেখি, ঝুমনা তখনও কাঁদছে।
বিশ্বনাথবাবু ঈষৎ থামিয়া ঘরের পরিবেশ নিরীক্ষণ করিলেন। ছোটরা প্রায় সকলেই তন্দ্রা অথবা নিদ্রায় আংশিক অথবা পূর্ণরূপে আচ্ছন্ন। মাধবীও নিস্তার পায় নাই। কিন্তু আমি ও মালতী যতখানি সজাগ ততোধিক কৌতূহলী। চন্দ্রমোহন ও তাহার বন্ধুরা গম্ভীর হইয়া নিবিষ্ট মনে বিশ্বনাথবাবুর কাহিনি শুনিতেছে। সম্ভবত বর্তমান ঘটনার সহিত ইহার প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ যোগাযোগের সূত্রটি নির্ণয়ের চেষ্টা করিতেছে। আমি বিশ্বনাথবাবুকে লক্ষ্য করিয়া প্রশ্ন করিলাম, তারপর? তারপর কী হল?
তিনি কহিলেন, ছেলেটাকে বললাম, এবার থেকে টুকিটাকি কিছু দরকার হলে যেন। আমার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু সে বারবার করে প্রতিজ্ঞা করল, পুরোনো ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি হবে না। সে একটা হেস্তনেস্ত করবেই করবে। তারপর হঠাৎ বলল, বাবু, আমাকে একটা বাক্স দিবি?
অফিসে কাঠের স্যাম্পেল পাঠানোর জন্যে মাঝারি সাইজের একরকম পিচবোর্ডের বাক্স আমরা ব্যবহার করতাম। তারই কয়েকটা তাবুর এক কোণে স্তূপাকারে পড়ে ছিল। সেদিকে আঙুল দেখিয়েই অনুরোধটা ঝুমনা করেছে। নির্বিবাদে একটা বাক্স ওকে দিয়ে দিলাম। তা দিয়ে ও কী করবে ও-ই জানে! বাক্সটা নিয়ে ও ছুটে বেরিয়ে গেল তাবু থেকে। মিলিয়ে গেল জঙ্গ লের গভীরে।
পরদিন খুব সকালে তাঁবুর বাইরে থেকে একটা হইচই গণ্ডগোলের শব্দ শুনতে পেলাম। বাইরে বেরিয়ে এসেই এক ভয়ংকর দৃশ্যের মুখোমুখি হলাম। ঝুমনা আচ্ছন্নের মতো টলছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। কবজি ও কনুইয়ের মাঝামাঝি জায়গা থেকে ওর হাত দুটো কেউ কেটে নিয়েছে, আর রক্তাক্ত ভোতা প্রান্ত দুটো কাদামাটি মাখা ন্যাকড়া দিয়ে জড়িয়ে দিয়েছে। সেখান থেকে টপটপ করে তখনও ঝরে পড়ছে কাঁচা রক্ত। সে-নৃশংস দৃশ্য সহ্য করা যায় না।
সবাই মিলে ধরাধরি করে ওকে নিয়ে যাওয়া হল স্থানীয় হাসপাতালে। সেখানকার এক তরুণ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে সঙ্গে-সঙ্গে ভরতি করে দেওয়া হল। রমেশ একসময় আমার পাশে এসে বলল, কু-দেবতার অভিশাপেই নাকি এমনটা হয়েছে।…ভারাক্রান্ত মন নিয়ে তাঁবুতে ফিরে এলাম। আদিবাসীরা রোজকার মতো জঙ্গলে কাঠ কাটতে লেগে গেল। কিন্তু ঝুমনাকে নিয়ে ঘনিয়ে ওঠা দুশ্চিন্তাটা এক মুহূর্তের জন্যেও মন থেকে সরাতে পারলাম না।
